সম্পাদকীয়/ বাল্যবিবাহের অভিশাপ ও আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা
কিশোরী বয়সে যখন হাত বাড়ানোর কথা নতুন বইয়ের পাতার দিকে, যখন শ্রেণিকক্ষে সহপাঠীদের সঙ্গে স্বপ্ন ও চিন্তার বিস্তার ঘটার কথা, ঠিক সেই বয়সে সংসার জীবনের ভারী দায়িত্ব চেপে বসা এক কঠিন ও নির্মম বাস্তবতা। সাতক্ষীরার তালার ইসলামকাটি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের নবম ও দশম শ্রেণির ১৩ জন ছাত্রীর বাল্যবিবাহের সাম্প্রতিক ঘটনাটি আমাদের সমাজের এক গভীর ক্ষতকে আবার উন্মোচিত করেছে। একই প্রতিষ্ঠানের এত বিপুলসংখ্যক অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীর বিয়ে হয়ে যাওয়া কেবল শিক্ষার পথকে রুদ্ধ করে না, বরং দেশের প্রচলিত আইন ও সামাজিক অগ্রগতির সামনে এক বড় প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করে।
একটি মেয়েশিশুর অপরিণত বয়সে বিয়ে তার মানসিক ও শারীরিক বিকাশের পথকে চিরতরে রুদ্ধ করে দেয়। পুষ্টিহীনতা, স্বাস্থ্যঝুঁকি, পারিবারিক সহিংসতা এবং সর্বোপরি অকাল মাতৃত্বের কারণে তাঁদের ভবিষ্যৎ জীবন চরম ঝুঁকির মুখে পড়ে। তাছাড়া এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; আমাদের গ্রামীণ জনপদে বাল্যবিবাহের এই প্রবণতা প্রকাশ করে যে আইন ও সচেতনতা সৃষ্টির প্রচার চালানো সত্ত্বেও সামাজিক মনোভাবের পরিবর্তন পুরোপুরি ঘটেনি। দারিদ্র্য, কুসংস্কার কিংবা সামাজিক নিরাপত্তার অভাবের অজুহাতে অভিভাবকদের এই সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
ঘটনাটি নজরে আসার পর উপজেলা প্রশাসনের প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। স্থানীয় নির্বাহী কর্মকর্তার উদ্যোগে অভিভাবকদের ডেকে সতর্ক করা, বাল্যবিবাহে নিষেধাজ্ঞা জারি করা এবং শিক্ষার্থীদের পুনরায় বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া কেবল সময়োপযোগী নয়, বরং এটি একটি জোরালো প্রশাসনিক বার্তাও বহন করে। তবে প্রশাসনিক কঠোরতা ও নজরদারিই যে এ ব্যাধি নির্মূলে একমাত্র সমাধান নয়, তা-ও স্মরণে রাখা জরুরি।
বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় সুশীল সমাজকে প্রহরীর ভূমিকা পালন করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কোনো শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকলে তার কারণ অনুসন্ধানে নজরদারি বাড়ানো দরকার। একই সঙ্গে অভিভাবকদের মধ্যে সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত সচেতনতা তৈরিতে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। তালার ঘটনাটিকে কেবল একটি সংবাদের শিরোনামে সীমাবদ্ধ না রেখে শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে সচেতনতার প্রদীপ জ্বালানোর তাগিদ হিসেবে দেখতে হবে। তবেই একটি সুস্থ, সচেতন ও বাল্যবিবাহমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।






