মন্ত্রী আসছেন সাতক্ষীরায়: চাই বঞ্চনার অবসান
এম. এম হায়দার আলী
দেশের একবারে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা সাতক্ষীরা, সম্ভাবনার এক বিশাল জনপদ। সুন্দরবনের কোলঘেঁষা এই জেলা দেশের অর্থনীতি, কৃষি, মৎস্য, সীমান্ত বাণিজ্য ও পর্যটনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। অথচ দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নের প্রশ্নে সাতক্ষীরার মানুষ যেন বার-বারই থেকেছেন উপেক্ষিত। প্রতিশ্রুতি এসেছে, আশ্বাস এসেছে, প্রকল্পের কথা শোনা গেছে,কিন্তু কাক্সিক্ষত উন্নয়ন অনেক ক্ষেত্রেই অধরাই থেকে গেছে। এবার সেই বঞ্চনার বৃত্ত ভাঙার প্রত্যাশা জেগেছে সাতক্ষীরাবাসীর মনে।
আগামী ১৩ সেপ্টেম্বর আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী জনাব মোঃ আসাদুজ্জামান মহোদয়ের সাতক্ষীরা সফরকে ঘিরে তাই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। শুধু আনুষ্ঠানিক সফর নয়,সাতক্ষীরার বাস্তব সমস্যা, মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি এবং উন্নয়নের সম্ভাবনাকে সামনে রেখে একটি কার্যকর রোডম্যাপ তৈরি হবে,এমন প্রত্যাশাই এখন জনমনে। এদিন
সকাল ৯টায় সাতক্ষীরা জেলা জজ আদালতের সম্মেলনকক্ষে জেলা পর্যায়ের বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন মন্ত্রী। এরপর সকাল ১০টায় জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে জেলার সংসদ সদস্য, সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসক, বিজিবির সিও, র্যাবের সিও, পুলিশ সুপার, বিভিন্ন দপ্তরের প্রধান, জেলা পরিষদ প্রশাসক, পৌর প্রশাসক, সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ, আইনজীবী সমিতির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক, জিপি-পিপি, প্রেসক্লাবের সভাপতি, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন তিনি। আর বিকেল ৩টায় বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্য, সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য, জেলা ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় যোগ দেবেন মন্ত্রী।
এই তিনটি পর্বের মতবিনিময়কে নিছক সৌজন্য সাক্ষাৎ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। সাতক্ষীরার উন্নয়নের জন্য এসব মতবিনিময় হতে পারে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্ল্যাটফর্ম। কারণ উন্নয়ন শুধু রাস্তা-ঘাট নির্মাণের নাম নয়; উন্নয়ন মানে মানুষের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, যোগাযোগ, বন্দর, নদী-খাল, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং সর্বোপরি মানুষের জীবনমানের পরিবর্তন। প্রশ্ন হলো,সাতক্ষীরা এত সম্ভাবনাময় হয়েও পিছিয়ে থাকবে কেন ?
সীমান্তবর্তী জেলা হিসেবে সাতক্ষীরার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ভোমরা স্থলবন্দর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্র। সুন্দরবনকে ঘিরে রয়েছে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা। কৃষি ও মৎস্য খাতেও সাতক্ষীরার অবদান কম নয়। চিংড়ি ও কাঁকড়া রপ্তানি, সবজি উৎপাদন, কৃষিপণ্য, মৎস্য সম্পদ,সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক ভাবে সাতক্ষীরা একটি সম্ভাবনাময় জেলা। কিন্তু অবকাঠামোগত দুর্বলতা, যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা, জলাবদ্ধতা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি এবং শিল্প-কারখানার অপ্রতুলতা সেই সম্ভাবনার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাতক্ষীরার মানুষ উন্নয়নের গল্প শুনতে, শুনতে ক্লান্ত। তারা এবার বাস্তব উন্নয়ন দেখতে চান। তারা চান, সড়ক হবে, সেতু হবে, নদী-খাল বাঁচবে, জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান হবে, কৃষক ন্যায্য দাম পাবেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নত হবে, হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা বাড়বে, তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। সবচেয়ে বড় কথা, সাতক্ষীরাকে আর ‘অবহেলিত জেলা’ হিসেবে দেখতে চান না এখানকার মানুষ।
মন্ত্রী যদি সত্যিই সাতক্ষীরার মানুষের কথা শুনতে চান, তাহলে মতবিনিময় সভাগুলোতে শুধু বক্তব্যের ফুলঝুরি নয়,মানুষের বাস্তব অভিযোগ ও দীর্ঘদিনের দাবিগুলোও শুনতে হবে। কোন প্রকল্প আটকে আছে, কোথায় বরাদ্দের অভাবে কাজ থেমে আছে, কোন সড়ক বছরের পর বছর সংস্কার হয়নি, কোন নদী দখল-দূষণে মৃতপ্রায়, কোন এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা ভেঙে পড়েছে, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।
রাজনীতিরও একটি বড় দায়িত্ব আছে। দল-মত নির্বিশেষে সাতক্ষীরার উন্নয়নের প্রশ্নে সবাইকে এক টেবিলে বসতে হবে। উন্নয়ন কোনো একক দলের সম্পত্তি নয়। আজ যে রাস্তা নির্মিত হবে, সেটি শুধু একটি দলের মানুষ ব্যবহার করবেন না, হাসপাতাল, সেতু, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা কর্মসংস্থানের সুযোগও দল দেখে মানুষের কাছে পৌঁছাবে না। তাই সাতক্ষীরার স্বার্থে রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে একটি অভিন্ন উন্নয়ন দাবি তৈরি করা সময়ের প্রয়োজন।
বর্তমান বিএনপি সরকারের মন্ত্রী মহোদয়কে সাতক্ষীরাবাসীর পক্ষ থেকে প্রাণঢালা অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি একটি কথাই বলা দরকার, আমরা প্রতিশ্রুতি নয়, দৃশ্যমান পরিবর্তন চাই। মতবিনিময় সভা শেষে যেন ফাইলের স্তূপে মানুষের দাবিগুলো চাপা পড়ে না যায়। সভায় উত্থাপিত দাবিগুলোর অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে সময়সীমাবদ্ধ বাস্তবায়ন পরিকল্পনা প্রয়োজন। কোন কাজ কখন শুরু হবে, কোন কাজ কতদিনে শেষ হবে,তার একটি সুস্পষ্ট কর্ম-পরিকল্পনা থাকা দরকার।
সাতক্ষীরার মানুষ উন্নয়ন চায়, কিন্তু সেই উন্নয়ন হতে হবে টেকসই। এমন উন্নয়ন নয়, বর্ষা এলেই যে রাস্তা ভেঙে যাবে; এমন বাঁধ নয়, সামান্য জলোচ্ছ্বাসেই যে মানুষকে সর্বস্বান্ত করবে; এমন প্রকল্প নয়, যার সুফল জনগণের বদলে কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে। সাতক্ষীরা দীর্ঘকাল ধরে পিছিয়ে আছে, এ কথা শুধু অভিযোগ হিসেবে উচ্চারণ করলেই হবে না। কেন পিছিয়ে আছে, কারা দায়ী, কোথায় প্রশাসনিক দুর্বলতা, কোথায় পরিকল্পনার ঘাটতি এবং কোথায় বাস্তবায়নের ব্যর্থতা, সেসবও খুঁজে বের করতে হবে। ১৩ সেপ্টেম্বরের সফর তাই সাতক্ষীরার জন্য একটি সুযোগ। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে পারলে জেলার উন্নয়ন-ভাবনায় নতুন গতি আসতে পারে।
তাইতো সাতক্ষীরাবাসী এখন তাকিয়ে আছেন মন্ত্রীর দিকে। তারা আশা করছেন,আইন ও বিচার অঙ্গনের দায়িত্বের পাশাপাশি সাতক্ষীরার উন্নয়ন-সম্ভাবনাকেও তিনি গুরুত্বের সঙ্গে দেখবেন। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে অবহেলিত এই জনপদকে উন্নয়নের মূল গ্রোতে ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন। সাতক্ষীরা আর পেছনে পড়ে থাকতে চায় না।
ভোমরা বন্দর থেকে সুন্দরবন, কৃষকের মাঠ থেকে মৎস্যঘের, শহরের সড়ক থেকে প্রত্যন্ত গ্রামের জনপদ, সবখানেই উন্নয়নের ছোঁয়া পৌঁছাতে হবে। মানুষের চোখে-মুখে ফুটিয়ে তুলতে হবে পরিবর্তনের স্বপ্ন। সময় এসেছে সাতক্ষীরার বঞ্চনার হিসাব চুকিয়ে দেওয়ার। এবার চাই উন্নয়নের জোয়ার, থায় নয়, কাজে।
সাতক্ষীরাবাসীর প্রত্যাশা, মন্ত্রীর ১৩ সেপ্টেম্বরের সফর যেন সেই নতুন যাত্রার সূচনা করে। একই সাথে অবহেলা, বৈষম্য ও উন্নয়ন-ঘাটতির পুরোনো অধ্যায় পেছনে ফেলে সাতক্ষীরা এগিয়ে যাক সমৃদ্ধি, নিরাপত্তা ও সম্ভাবনার পথে,এই হোক আমাদের এবারের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট









