বৈশ্বিক জ্বালানি স্বাধীনতা দিবস: আমদানিনির্ভরতা কাটিয়ে টেকসই উন্নয়নের পথে
মোহাম্মদ সাকিবুর রহমান বাবলা
মানবসভ্যতার ইতিহাসে জ্বালানি শুধু উন্নয়নের চালিকাশক্তিই নয়, বরং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, জাতীয় নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি। শিল্পবিপ্লব থেকে শুরু করে আধুনিক ডিজিটাল যুগ পর্যন্ত প্রতিটি অগ্রযাত্রার পেছনে রয়েছে শক্তির অবদান। কিন্তু এই উন্নয়নের প্রধান জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত কয়লা, তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মতো জীবাশ্ম সম্পদের সীমাবদ্ধতা এবং পরিবেশের ওপর এর বিরূপ প্রভাব আজ বিশ্বকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। এই বাস্তবতায় প্রতি বছর ১০ জুলাই পালিত বৈশ্বিক জ্বালানি স্বাধীনতা দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়Ñটেকসই ভবিষ্যতের জন্য পরিচ্ছন্ন ও স্বনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার বিকল্প নেই।
এই দিবসের সূচনা হয় ২০০৬ সালে, যখন লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টি বোর্ড অব সুপারভাইজার্সের সদস্য মাইকেল ডেনিস অ্যান্টোনোভিচ ১০ জুলাইকে বৈশ্বিক জ্বালানি স্বাধীনতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন। দিনটি বেছে নেওয়া হয় ১৮৫৬ সনে জন্ম নেওয়া মহান উদ্ভাবক নিকোলা টেসলা-এর জন্মদিন উপলক্ষে। আধুনিক পরিবর্তী প্রবাহ ভিত্তিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থার বিকাশে তাঁর অবদান আজও বিশ্ব জ্বালানি প্রযুক্তির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
জ্বালানি স্বাধীনতার ধারণা অবশ্য নতুন নয়। ১৯৭০-এর দশকের বৈশ্বিক তেল সংকটের সময় অনেক দেশ উপলব্ধি করে যে, আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। সেই উপলব্ধি থেকেই শক্তির বিকল্প উৎস অনুসন্ধান এবং নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়াস শুরু হয়। বর্তমানে জ্বালানি স্বাধীনতা বলতে শুধু বিদেশি জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা হ্রাস নয়; বরং পরিবেশবান্ধব, নির্ভরযোগ্য ও দীর্ঘস্থায়ী শক্তি ব্যবস্থার মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করাকেও বোঝায়।
বর্তমান বিশ্বে জ্বালানিকে কেন্দ্র করে অর্থনীতি ও ভূরাজনীতির সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি, আঞ্চলিক সংঘাত, সরবরাহব্যবস্থার বিঘœ কিংবা বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতা সরাসরি জাতীয় অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে। জ্বালানি আমদানির জন্য বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয়, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক ভারসাম্যের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। ফলে নিজস্ব ও নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস গড়ে তোলা আজ কেবল পরিবেশগত প্রয়োজন নয়; এটি অর্থনৈতিক কৌশলও বটে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি জ্বালানি স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করেছে। জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের ফলে বিপুল পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস বায়ুম-লে নিঃসৃত হচ্ছে, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে ত্বরান্বিত করছে। এর ফল হিসেবে ঘন ঘন তাপপ্রবাহ, অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত, ঘূর্ণিঝড়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় বিশ্বব্যাপী উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে পরিবেশ সুরক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বর্তমানে সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, জলবিদ্যুৎ, ভূ-তাপীয় শক্তি, বায়োগ্যাস এবং উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থাসম্পন্ন পারমাণবিক শক্তি বিশ্বব্যাপী জ্বালানি রূপান্তরের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ফলে এসব উৎসের উৎপাদন ব্যয় ক্রমশ কমছে এবং দক্ষতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে একসময়ের ব্যয়বহুল বিকল্পগুলো আজ অনেক ক্ষেত্রেই প্রচলিত জীবাশ্ম জ্বালানির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য জ্বালানি স্বাধীনতার প্রশ্নটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ক্রমবর্ধমান শিল্পায়ন, নগরায়ন এবং জনসংখ্যার চাহিদা পূরণে দেশে বিদ্যুতের প্রয়োজনীয়তা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির ওপর উচ্চমাত্রার নির্ভরতা দেশের অর্থনীতিকে বৈদেশিক বাজারের ওঠানামার মুখোমুখি করে। অন্যদিকে সূর্যালোক, উপকূলীয় বায়ুপ্রবাহ এবং অন্যান্য নবায়নযোগ্য সম্পদের সম্ভাবনা বাংলাদেশের জন্য একটি আশাব্যঞ্জক সুযোগ সৃষ্টি করেছে। যথাযথ পরিকল্পনা, গবেষণা, বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে দেশ জ্বালানি নিরাপত্তার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শ্যামনগরসহ উপকূলীয় এলাকাগুলোর মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি কেবল একটি বিকল্প নয়, এটি বেঁচে থাকার লড়াইয়ের অংশ।
জ্বালানি স্বাধীনতা কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্রও সৃষ্টি করছে। বিশ্বজুড়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি শিল্পে লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এর পরিধি আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন, বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প, স্মার্ট গ্রিড, শক্তি দক্ষতা ব্যবস্থাপনা এবং সবুজ প্রযুক্তি খাতে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে জ্বালানি রূপান্তর পরিবেশ সংরক্ষণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিরও নতুন সুযোগ তৈরি করছে।
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য ৭ ও ১৩Ñ‘সাশ্রয়ী ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি’ এবং ‘জলবায়ু কার্যক্রম’ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও জ্বালানি স্বাধীনতা অপরিহার্য। পরিচ্ছন্ন ও সাশ্রয়ী জ্বালানির সহজলভ্যতা নিশ্চিত না হলে টেকসই উন্নয়নের অন্যান্য লক্ষ্য অর্জনও কঠিন হয়ে পড়বে।
তবে জ্বালানি স্বাধীনতা অর্জন শুধু রাষ্ট্রের একক দায়িত্ব নয়। ব্যক্তি, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় সরকারÑসবাইকে এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে হবে। বিদ্যুৎ অপচয় রোধ, শক্তি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন, গণপরিবহন ব্যবহারে উৎসাহ এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনের মাধ্যমে প্রত্যেক নাগরিক এই অভিযাত্রার অংশীদার হতে পারেন।
বৈশ্বিক জ্বালানি স্বাধীনতা দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ কেবল বেশি শক্তি ব্যবহার নয়; বরং সেই শক্তির উৎসকে নিরাপদ, সাশ্রয়ী, পরিবেশসম্মত এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টেকসই করে তোলা। জ্বালানি স্বনির্ভরতা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং আগামী বিশ্বের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং জাতীয় মর্যাদা রক্ষার অন্যতম পূর্বশর্ত। আজকের দূরদর্শী বিনিয়োগ ও সচেতন সিদ্ধান্তই আগামী দিনের সবুজ, নিরাপদ এবং সমৃদ্ধ পৃথিবীর ভিত্তি রচনা করবে। জ্বালানি স্বাধীনতা অর্জনের এই লড়াই কেবল রাষ্ট্রের নয়, এটি আমাদের প্রত্যেকের আগামীর নিশ্চয়তার লড়াই।












