রবীন্দ্রনাথ-নজরুল: সম্প্রীতির উত্তরাধিকার
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
‘হিন্দু না ওরা মুসলিম?’-প্রশ্নটি করেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। কিন্তু তাঁর প্রশ্নের উত্তরও তিনি নিজেই দিয়েছিলেন-‘কা-ারী! বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র!’ প্রায় এক শতাব্দী আগে উচ্চারিত এই পঙ্ক্তি আজও আমাদের সামনে একটি মৌলিক সত্য তুলে ধরেÑমানুষের পরিচয় কোনো সংকীর্ণ ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের দুই মহীরুহ। তাঁদের সাহিত্যিক স্বর আলাদা, জীবনদর্শনের প্রকাশভঙ্গি আলাদা, সময়ের অভিজ্ঞতাও আলাদা। কিন্তু তাঁদের মানবিক বোধের একটি জায়গায় গভীর মিলÑমানুষকে ছোট করে এমন কোনো বিভাজন তাঁরা মেনে নেননি।
নজরুলের সাহিত্য পড়লে বোঝা যায়, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ছিল স্পষ্ট ও সাহসী। তিনি লিখেছেনÑ‘মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম/ হিন্দু-মুসলমান।’ এটি নিছক সম্প্রীতির কবিতা নয়; এটি ছিল বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদ।
‘হিন্দু-মুসলমান’, ‘মন্দির ও মসজিদ’, ‘রুদ্র-মঙ্গল’-এর মতো লেখায় নজরুল ধর্মের নামে বিদ্বেষ, হিংসা ও বিভাজনের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। তাঁর কাছে ধর্ম মানুষের আত্মপরিচয়ের অংশ হতে পারে, কিন্তু মানুষকে মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর অস্ত্র হতে পারে না।
এই জায়গাতেই নজরুলের কবিতার শক্তি আজও প্রাসঙ্গিক। যখন ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে এনে মানুষের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করা হয়, তখন নজরুল আমাদের মনে করিয়ে দেন-প্রথম পরিচয় মানুষ।
রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যজুড়ে মানুষের মুক্তি, মর্যাদা, আত্মপরিচয় ও বিশ্বমানবতার কথা রয়েছে। তাঁর ‘ধর্ম’ মানুষের অন্তর্গত সত্যের অনুসন্ধান; তাঁর চিন্তায় সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সতর্কতা ছিল প্রবল। তাঁর সাহিত্য বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে, যেখানে ধর্মীয় পরিচয়ের সীমা অতিক্রম করে মানুষই হয়ে উঠেছে প্রধান বিষয়। তাই রবীন্দ্রনাথকে এক সম্প্রদায়ের কবি এবং নজরুলকে আরেক সম্প্রদায়ের কবি বানানো-দুজনকেই ছোট করে দেখা।
রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের মধ্যে সাহিত্যিক পার্থক্য ছিল। বয়সের ব্যবধান ছিল প্রায় চার দশক। সাহিত্যিক প্রজন্মও ছিল আলাদা। স্বাভাবিকভাবেই তাঁদের কবিতার ভাষা ও প্রকাশভঙ্গিতে পার্থক্য থাকবে। কিন্তু পার্থক্যকে শত্রুতায় রূপ দেওয়ার কোনো কারণ নেই।
বরং তাঁদের সম্পর্কের নানা ঘটনাই পারস্পরিক শ্রদ্ধার ইঙ্গিত দেয়। নজরুলের ধূমকেতু প্রকাশের সময় রবীন্দ্রনাথের আশীর্বাদ, নজরুলের অনশনের সময়ে তাঁর উদ্বেগ এবং পরে বসন্ত গীতিনাট্য নজরুলকে উৎসর্গÑএসব ঘটনা তাঁদের সম্পর্ককে নতুন করে ভাবার সুযোগ দেয়।
রবীন্দ্রনাথ বসন্ত উৎসর্গ করেছিলেনÑ‘শ্রীমান কবি নজরুল ইসলাম স্নেহভাজনেষু’ লিখে। একজন অগ্রজ কবি যদি একজন নবীন কবির প্রতিভাকে স্বীকৃতি দেন, তাঁকে নিজের সৃষ্টিকর্ম উৎসর্গ করেন, তাঁর জীবন ও সাহিত্যচর্চা নিয়ে উদ্বিগ্ন হনÑতাহলে তাঁদের সম্পর্ককে নিছক প্রতিদ্বন্দ্বিতার গল্পে পরিণত করার যুক্তি কোথায়?
নজরুল ছিলেন প্রবল আত্মবিশ্বাসী, বিদ্রোহী এবং স্বতন্ত্র কণ্ঠের কবি। তিনি রবীন্দ্রনাথের অনুকরণ করতে আসেননি। তাঁর কবিতায় বিদ্রোহ, সাম্য, প্রেম, মানবতা ও ধর্মীয় সম্প্রীতির নিজস্ব ভাষা তৈরি হয়েছিল। নজরুল রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য পড়েছেন, তাঁর গান জানতেন এবং তাঁকে শ্রদ্ধা করতেন। তাঁকে ‘গুরুদেব’ বলে সম্বোধনের ঘটনাও তাঁর শ্রদ্ধাবোধের পরিচয় বহন করে।
অতএব, দুজনের সাহিত্যিক স্বাতন্ত্র্যকে স্বীকার করা যেমন জরুরি, তেমনি তাঁদের মধ্যে কৃত্রিম শত্রুতার গল্প তৈরি না করাও জরুরি।
বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো-অনেকেই মূল সাহিত্য বা ইতিহাসের দলিল পড়ার আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট দেখে মত তৈরি করেন। একটি ছবি, কয়েকটি উদ্ধৃতি কিংবা একটি উত্তেজক ভিডিও দেখে তৈরি হয়ে যায় ইতিহাসের নতুন সংস্করণ।
রবীন্দ্রনাথ আমাদের দিয়েছেন মানবমুক্তির বিস্তৃত দৃষ্টি। নজরুল দিয়েছেন বিদ্রোহ, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িকতার দুর্দমনীয় কণ্ঠ। একজনের ভাষা কখনো শান্ত ও গভীর, অন্যজনের ভাষা কখনো বজ্রের মতো তীব্র। কিন্তু দুজনের সৃষ্টির কেন্দ্রে মানুষ।
কে বড়Ñরবীন্দ্রনাথ না নজরুল? এই প্রশ্নেরও কোনো প্রয়োজন নেই। বাংলা সাহিত্য তাঁদের দুজনকেই ধারণ করেছে। একজনকে বাদ দিয়ে অন্যজনকে বোঝা যেমন কঠিন, তেমনি তাঁদের একজনকে ধর্মীয় পরিচয়ের সংকীর্ণ ঘরে বন্দি করাও অন্যায়।
আজকের সমাজে তাঁদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন এখানেই। বিভাজনের সময়ে রবীন্দ্রনাথ আমাদের মিলনের ভাষা দেন; অন্যায়ের সময়ে নজরুল আমাদের প্রতিবাদের ভাষা দেন। সাম্প্রদায়িকতার অন্ধকারে দুজনেই মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা দেন।
রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে নিয়ে আমাদের নতুন করে কোনো বিরোধ তৈরি করার প্রয়োজন নেই। বরং তাঁদের সাহিত্য থেকে এমন একটি বাংলাদেশ নির্মাণের শিক্ষা নিতে হবে, যেখানে ধর্ম যার যার, কিন্তু মানবিক মর্যাদা সবার।
রবীন্দ্রনাথ শুধু হিন্দুর নন, নজরুল শুধু মুসলমানের নন। তাঁরা কোনো ধর্মীয় শিবিরের সম্পত্তিও নন। তাঁরা বাংলা ভাষা, বাঙালির সংস্কৃতি এবং সর্বোপরি মানবতার সম্পদ।
আজ যখন নানা পরিচয় মানুষকে আলাদা করে দিতে চায়, তখন নজরুলের সেই আহ্বান আবার মনে রাখা দরকারÑ‘ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র।’
এই মানুষকে বাঁচানোই যদি লক্ষ্য হয়, তবে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে মুখোমুখি দাঁড় করানো নয়; পাশাপাশি বসিয়ে পড়ার সময় এখনই।
লেখক: সংবাদকর্মী








