রাষ্ট্র কি জাগবে, নাকি সংকটই জাগিয়ে দেবে জাতিকে?
গাজী মুহাম্মদ আসাদুল্লাহ
একটি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা বোঝার জন্য সব সময় বড় বড় পরিসংখ্যানের প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো একটি সাধারণ পরিবারের বাজারের তালিকা দেখলেই অনেক কিছু বোঝা যায়। মাসের শুরুতে যে পরিবার পাঁচ কেজি চাল, ডাল, তেল, মাছ ও সবজি কিনত, মাসের শেষে তাদের সেই তালিকা ছোট হয়ে যায়। একজন দিনমজুরের আয় একই থাকে, কিন্তু বাজারের খরচ বাড়তে থাকে। কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়ে, অথচ ফসলের ন্যায্য দাম পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকে যায়। এ বাস্তবতাই আজকের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চাপের একটি বড় চিত্র।
দ্রব্যমূল্যের চাপের সঙ্গে এখন বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের সংকটও মানুষের জীবন ও অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়ে; আর পরিবহন খরচ বাড়লে কৃষিপণ্যসহ প্রায় সব পণ্যের দাম বাড়ে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট হলে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং উৎপাদন খরচ বাড়ে। শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি খরচের বোঝা গিয়ে পড়ে ভোক্তার ওপর। অর্থাৎ সমস্যাগুলো আলাদা নয়; একটি সংকট অন্য সংকটকে আরও বড় করে তুলছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট, বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা ও সরবরাহব্যবস্থার সমস্যার প্রভাব পড়েছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। তবে এখানেই রাষ্ট্রের দায়িত্বের প্রশ্নটি সামনে আসে। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণে না থাকলেও সংকট মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়া আমাদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই আছে। আমাদের সমস্যা হলো, অনেক সময় সংকট দেখা দেওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়। বাজারে দাম বেড়ে গেলে অভিযান চালানো, জ্বালানি সংকট হলে জরুরি ভিত্তিতে আমদানি করা কিংবা খাদ্যঘাটতি হলে বাজার থেকে সংগ্রহ করাÑএভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সংকট তৈরির আগেই কি আমরা হিসাব করি না যে আগামী কয়েক মাসে কী হতে পারে?
রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু সংকটের সময় ব্যবস্থা নেওয়া নয়; বরং সংকটের আগেই সম্ভাব্য ঝুঁকি চিহ্নিত করা। কোন খাদ্যপণ্যের মজুত কত আছে, কোন কৃষি উপকরণের ঘাটতি হতে পারে, জ্বালানির সরবরাহ কতটা নিরাপদ, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের চাহিদা কত বাড়তে পারেÑএসব বিষয়ে আগাম পরিকল্পনা থাকা দরকার।
দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির কারণে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একজন সচ্ছল মানুষ কোনো পণ্যের দাম বাড়লে অন্য খাতে খরচ কমাতে পারেন। কিন্তু একজন নি¤œআয়ের মানুষ কী কমাবেন? চাল, ডাল, তেল, সবজি কিংবা বাসাভাড়াÑএসব তো তাঁর জীবনের অপরিহার্য অংশ। তাই মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় বোঝা পড়ে দরিদ্র ও নি¤œমধ্যবিত্ত মানুষের ওপর। এ কারণে বাজারে শুধু অভিযান চালালেই হবে না। কোনো পণ্যের দাম কেন বাড়ছে, কোথায় সরবরাহের সমস্যা, কোথায় অস্বাভাবিক মুনাফা করা হচ্ছে আর কোথায় মজুত হচ্ছেÑরাষ্ট্রকে সঠিক তথ্য নিয়ে এসব বের করতে হবে। ব্যবসায়ী মাত্রই অসাধুÑএমন ধারণাও ঠিক নয়। আবার বাজারে কারসাজি হলে তা উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই। এর জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছ বাজারব্যবস্থা এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ।
কৃষকের অবস্থার দিকেও আমাদের নজর দিতে হবে। সার, বীজ, সেচ, বিদ্যুৎ, ডিজেল ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়ে। কিন্তু ফসল ওঠার পর অনেক সময় তিনি প্রত্যাশিত দাম পান না। অথচ একই পণ্য শহরের বাজারে গিয়ে কয়েক গুণ দামে বিক্রি হয়। এই ব্যবধানের কারণ খুঁজে বের করা জরুরি। কৃষককে শুধু উৎপাদনের সময় সহায়তা করলেই হবে না; বরং উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে।
খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রেও আমাদের দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা দরকার। প্রয়োজন হলে খাদ্য আমদানি করতে হবেÑএটি স্বাভাবিক। তবে সব সংকটের সমাধান আমদানির মাধ্যমে করার প্রবণতা বিপজ্জনক। আন্তর্জাতিক বাজারে সংকট তৈরি হলে তখন আমদানিও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে। তাই কৃষি উৎপাদন, খাদ্য সংরক্ষণ ও কৌশলগত মজুতের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
জ্বালানি খাতের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি উৎসের বহুমুখীকরণ এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের স্থিতিশীল সরবরাহ শুধু শিল্পের জন্যই নয়, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।
তবে এসব পদক্ষেপ নিতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় করা যাবে না। বড় প্রকল্পের প্রয়োজন আছে, উন্নয়নও প্রয়োজন। কিন্তু সংকটের সময়ে কোন ব্যয়টি জরুরি আর কোন ব্যয় কিছুটা পিছিয়ে দেওয়া যায়Ñসেটি নতুন করে বিবেচনা করা দরকার। জনগণের কষ্টের সময়ে রাষ্ট্রীয় তহবিলের প্রতিটি টাকার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব।
নি¤œআয়ের মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষার আওতাও বাড়াতে হবে। তবে সেই সহায়তা যেন প্রকৃত দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু তালিকায় নাম থাকলেই সহায়তা দেওয়া নয়; বাস্তবে কে সবচেয়ে বেশি সংকটে আছে, তা চিহ্নিত করতে হবে।
সরকারের সমালোচনা করা মানে রাষ্ট্রের বিরোধিতা করা নয়। বরং রাষ্ট্র কোথায় দুর্বল, কোথায় ভুল করছে এবং কোথায় সংশোধনের প্রয়োজনÑএসব বলা জনগণের স্বার্থেই প্রয়োজন। কোনো নীতি ভালো হলে তার প্রশংসা যেমন দরকার, তেমনি কোনো নীতি মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করলে প্রশ্ন তোলাও জরুরি।
(এটা লেখকের নিজস্ব মতামত)। লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা ও উদ্যোক্তা








