সম্পাদকীয়/ ডেঙ্গু ও সংক্রামক রোগের ব্যাপ্তি
দেশজুড়ে মশার উপদ্রব এবং ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব এখন আর কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই। রাজধানী থেকে শুরু করে তা গ্রাম ও দূরবর্তী প্রান্তিক অঞ্চলেও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। সম্প্রতি পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্য ও আঞ্চলিক প্রতিবেদনের চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সাতক্ষীরা জেলায় ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে সাতজন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং জেলাজুড়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৪৪ জন। অন্যদিকে খুলনার পাইকগাছায় কেবল ডেঙ্গুই নয়, পাশাপাশি হামের মতো মারাত্মক সংক্রামক ব্যাধির প্রাদুর্ভাব একই সাথে দেখা দেওয়ায় সার্বিক জনস্বাস্থ্য নতুন এক সংকটের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। এই চিত্রগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং দেশজুড়ে বিস্তৃত হতে থাকা স্বাস্থ্যঝুঁকির একটি স্পষ্ট পূর্বাভাস।
মৌসুম অনুযায়ী প্রতিবছরই আগস্ট থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। চলতি বছরেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি; বরং আগস্ট মাসে সংক্রমণ ও মৃত্যুহার পূর্বের সব রেকর্ড ভেঙেছে। ডেঙ্গুর ঝুঁকি নিয়ে আগাম সতর্কতা থাকা সত্ত্বেও তা মোকাবিলায় কর্তৃপক্ষের গৃহীত পদক্ষেপ এখনো গতানুগতিক পন্থায় সীমাবদ্ধ। লার্ভিসাইড ছেটানো কিংবা লোকদেখানো রাসায়নিকের ধোঁয়া প্রয়োগের যে পুরোনো চর্চা দেখা যায়, তা দিয়ে উড়ন্ত এডিস মশা ধ্বংস বা সংক্রমণ শৃঙ্খল ভাঙা পুরোপুরি অসম্ভব। ডেঙ্গুর সঙ্গে যখন হামের মতো উচ্চ সংক্রামক রোগ যুক্ত হয়, তখন বিশেষ করে প্রান্তিক ও নি¤œআয়ের পরিবারের শিশু ও রোগীদের জীবন চরম ঝুঁকিতে পড়ে।
সংকট সমাধানে সরকারের প্রথম ও প্রধান কাজ হওয়া উচিত মশা নিধনে কালক্ষেপণ না করে অবিলম্বে একটি উচ্চপর্যায়ের ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ বা ক্র্যাশ অভিযান পরিচালনা করা। পার্শ্ববর্তী দেশ বা অঞ্চলের সফল উদাহরণগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জনস্বাস্থ্যের এই জরুরি অবস্থা মোকাবিলায় সমন্বিত পদক্ষেপই সাফল্য এনে দিয়েছে। শুধু সরকারি স্বাস্থ্য খাত কিংবা স্থানীয় সরকারের কর্মীদের একক প্রচেষ্টায় এই প্রাদুর্ভাব থামানো সম্ভব নয়। প্রতিটি ওয়ার্ড ও প্রশাসনিক এলাকায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সামাজিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষকে যুক্ত করে এডিস মশার প্রজননস্থলÑযেমন জমে থাকা পানি, ডাবের খোসা ও টব নিয়মিত পরিষ্কারের সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ ও সহজলভ্যতা। জটিলতা বাড়ার পর রোগীকে শহরের বড় হাসপাতালে স্থানান্তরের প্রবণতা বন্ধ করতে হলে একদম প্রাথমিক পর্যায় অর্থাৎ ইউনিয়ন ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে বিনামূল্যে দ্রুত ডেঙ্গু ও হাম শনাক্তকরণের ব্যবস্থা করতে হবে। অনেকেই পরীক্ষার খরচের ভয়ে কিংবা অজ্ঞতার কারণে সময়মতো চিকিৎসা নিতে আসেন না, যার ফলে শেষ মুহূর্তে জটিলতা নিয়ে এসে জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ে। প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ ল্যাবরেটরি সার্ভিস বা বাড়ি বাড়ি সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে প্রাথমিক টেস্ট নিশ্চিত করা দরকার।
সর্বোপরি, এই স্বাস্থ্যসংকট সাধারণ ও নি¤œআয়ের মানুষের ওপর যে মারাত্মক অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করছে, সেদিকে রাষ্ট্রকে মানবিক নজর দিতে হবে। সম্প্রতি প্রকাশিত বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, সংক্রামক রোগ বা আইসিইউভিত্তিক চিকিৎসার খরচ চালাতে গিয়ে বহু পরিবার সঞ্চয় হারিয়ে চূড়ান্ত ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রে সংক্রামক রোগ ও মহামারিজনিত স্বাস্থ্য জরুরি পরিস্থিতিতে নাগরিকদের চিকিৎসার দায়ভার সরকারের এড়ানো উচিত নয়।
উপজেলা ও জেলা হাসপাতালগুলোতে থাকা সমাজকল্যাণ দপ্তরের তহবিল থেকে দরিদ্র রোগীদের তাৎক্ষণিক পথ্য ও ওষুধ সরবরাহের আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত ব্যবস্থা করতে হবে।
সেপ্টেম্বর পার হয়ে অক্টোবর-নভেম্বরে ডেঙ্গুর এই বিস্তার যাতে কোনোভাবেই আর ভয়াবহ ট্র্যাজেডিতে রূপ না নেয়, সে জন্য এখনই জরুরি ভিত্তিতে সমন্বিত মশক নিধন অভিযান এবং দোরগোড়ায় সহজলভ্য চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার জোরালো তাগিদ দিচ্ছি। সময়মতো সচেতনতার বর্ম পরতে না পারলে দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীকে আরও বড় মূল্যে এই গাফিলতির মাশুল দিতে হবে।








