রসু খাঁ থেকে রামিসা হত্যাকান্ড: বিচারের দীর্ঘসূত্রতা ও বিপন্ন মানবতা
শেখ সিদ্দিকুর রহমান
একটি সভ্য সমাজের মূল ভিত্তি হলো তার নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচার। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে যখন আমরা প্রতিদিনের সংবাদপত্রের পাতায় চোখ বুলাই, তখন এক বুক আতঙ্ক আর দীর্ঘশ্বাস ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। সমাজ ও পরিবারে আজ মানুষের, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের ন্যূনতম নিরাপত্তা যেন হারিয়ে যেতে বসেছে। যে ঘর বা যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একটি শিশুর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হওয়ার কথা ছিল, আজ সেখানেই ওত পেতে আছে পৈশাচিক হিংগ্রতা।
সম্প্রতি সাত বছরের নিষ্পাপ শিশু রামিসার নির্মম হত্যাকা- আমাদের বিবেককে আরও একবার বড় ধরনের ঝাঁকুনি দিয়ে গেল। প্রতিবেশি সোহেল নামের এক নরপশুর হাতে যেভাবে অবোধ শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর মাথা কেটে হত্যা করা হলো, তা কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে কল্পনা করাও কঠিন। এই পৈশাচিকতা প্রমাণ করে যে, অপরাধীদের মনে আইনের প্রতি কোনো ভয় নেই, সমাজের প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা নেই। রামিসার মতো এমন অসংখ্য অবোধ প্রাণ প্রতিদিন ঝরে যাচ্ছে, অথচ রাষ্ট্র ও সমাজ এই ধারা রুখতে পারছে না।
রামিসা হত্যাকা-ের এই ভয়াবহ চিত্র আমাদের দেশের অপরাধ জগতের অন্যতম কুখ্যাত ও বিকৃত মানসিকতার খুনি মশিউর রহমান ওরফে রসু খাঁর কথা মনে করিয়ে দেয়। ২০০৯ সালে গ্রেফতার হওয়া রসু খাঁ একে একে ১১ জন পোশাক শ্রমিক নারীকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে, বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণের পর হত্যা করেছিল। এমনকি তার বিকৃত লক্ষ্য ছিল ১০১ জন নারীকে হত্যা করা। রসু খাঁর সেই রোমহর্ষক অপরাধের ইতিহাস পুরো দেশকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, রসু খাঁ গ্রেফতার হওয়ার পর প্রায় দেড় যুগ বা ১৬ বছরেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে, অথচ আজ পর্যন্ত তার সব মামলার চূড়ান্ত বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ করা সম্ভব হয়নি।
২০১৫ সাল থেকে কয়েকটি মামলায় তার মৃত্যুদ-ের রায় হলেও উচ্চ আদালতে আপিল, দীর্ঘ আইনি শুনানি এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার মারপ্যাঁচে সেই ফাঁসি আজও কার্যকর হয়নি। সে আজও কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারে বন্দি জীবন কাটাচ্ছে, অথচ তার শিকার হওয়া সেই ১১টি পরিবারের স্বজনেরা আজো ন্যায়বিচারের আশায় চেয়ে আছেন। রসু খাঁর এই দীর্ঘায়িত বিচার প্রক্রিয়াই মূলত আমাদের বিচার ব্যবস্থার এক মস্ত বড় দুর্বলতার প্রতীক।
বিচারের এই ধীরগতি এবং আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতাই অপরাধীদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে। শুধু রসু খাঁ কিংবা রামিসার হত্যাকারী সোহেলই নয়, অতীতে তনু, নুসরাত, কিংবা রূপার মতো অসংখ্য নারী ও শিশু ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে অপরাধীরা দ্রুত সনাক্ত হলেও বিচার ব্যবস্থার বিলম্ব প্রক্রিয়ার সুযোগ নিয়ে তারা পার পেয়ে যাওয়ার পথ খোঁজে। আমাদের দেশের প্রচলিত আইনের নানা ফাঁকফোকর গলে অনেক গুরুতর অপরাধী জামিনে বেরিয়ে আসে অথবা বছরের পর বছর আপিলের পর আপিল করে শাস্তি ঝুলিয়ে রাখে।
যখন একটি চাঞ্চল্যকর অপরাধের পর বিচার হতে দশকের পর দশক কেটে যায়, তখন অপরাধীদের মনে এই ধারণার জন্ম নেয় যে, অপরাধ করেও আইনের হাত থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি বা বিলম্বিত বিচারের কারণেই দেশে প্রতিনিয়ত ধর্ষণ ও হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটছে। অপরাধীরা জানে, জনরোষ সাময়িক; কিছুদিন পর সমাজ এই ঘটনা ভুলে যাবে এবং তারা আইনের কোনো না কোনো গলিপথ দিয়ে বেরিয়ে আসতে পারবে।
আজ দেশের মানুষ আর কোনো নারী বা শিশুর সম্ভ্রমহানি দেখতে চায় না, দেখতে চায় না কোনো মায়ের বুক খালি হওয়া লাশ। সমাজ ও পরিবারে প্রতিটি মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে সবার আগে এই আইনি দীর্ঘসূত্রতার অবসান ঘটাতে হবে। গুরুতর ও সংবেদনশীল অপরাধগুলোর জন্য বিশেষ দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে তদন্ত ও বিচারিক কাজ শেষ করা জরুরি। কোনো অবস্থাতেই যেন আইনের ফাঁক দিয়ে কোনো খুনি বা ধর্ষক পার পেয়ে যেতে না পারে, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্র ও বিচার বিভাগের।
অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর যদি দ্রুততম সময়ে অপরাধীর কঠিন ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কার্যকর করা যায়, তবেই কেবল অপরাধীদের মনে আইনের শাসন নিয়ে ভীতি তৈরি হবে। অন্যথায়, বিচারহীনতার এই অন্ধকার গ্রাস করবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে। আমরা চাই না আর কোনো রামিসার রক্তে এ দেশের মাটি রঞ্জিত হোক; অবিলম্বে রামিসার হত্যাকারী সোহেলের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি রসু খাঁসহ সকল ঝুলে থাকা মামলার চূড়ান্ত রায় কার্যকর করে সমাজে স্থায়ী শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা হোক।
(এটা সম্পূর্ণ লেখকের মন্তব্য)। লেখক: সাবেক ব্যাংকার ও সভাপতি, উদীচী-সাতক্ষীরা





