সদ্য সমাপ্ত ২০২২৫-২৬ অর্থবছরে সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর কাস্টম হাউসে রাজস্ব আদায়ের যে চিত্র সামনে এসেছে, তা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য পরিস্থিতির একটি উদ্বেগজনক প্রতিফলন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নির্ধারিত ২,০৬৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকার সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে মাত্র ১,১১৪ কোটি ১৯ লাখ টাকার কিছু বেশি। ফলে অর্থবছর শেষে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৫০ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় রাজস্ব আদায় প্রায় অর্ধেকে নেমে আসার এই পরিসংখ্যান কেবল একটি বন্দরের ব্যর্থতা নয়, বরং তা আমাদের আমদানি-রপ্তানি খাতের সামগ্রিক স্থবিরতারই ইঙ্গিত দেয়।
কাস্টমস কর্তৃপক্ষের মতে—বৈশ্বিক মন্দা, দ্বিপক্ষীয় টানাপোড়েন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধীরগতি এবং শুল্কায়ন কাঠামোর পরিবর্তনের কারণে এই ঘাটতি তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, শুল্ক ফাঁকি রোধে কঠোর নজরদারির কারণে বড় বিপর্যয় এড়ানো গেছে বলে দাবি করা হলেও, বন্দরসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের বক্তব্য ভিন্ন এক বাস্তবতার দিকে আঙুল তোলে। ব্যবসায়ীদের মতে, ডলার সংকট, ব্যাংক ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি এবং এলসি (ঋণপত্র) খোলায় তীব্র জটিলতার কারণে ব্যবসায়ীরা পুঁজি হারিয়ে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। এর সঙ্গে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অভ্যন্তরীণ নানা সংকট যুক্ত হওয়ায় সামগ্রিক বাণিজ্য সক্ষমতা বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
ভোমরা স্থলবন্দরটি ভৌগোলিক কারণে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাথে স্বল্প সময়ে ও সাশ্রয়ী খরচে বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। কিন্তু এই বহুমুখী সংকটের বৃত্তে ঘুরপাক খেয়ে বন্দরটির স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হচ্ছে। যদি এলসি খোলার জটিলতা দূর করা না যায় এবং ডলার সংকটের টেকসই সমাধান না মেলে, তবে কেবল শুল্কায়ন কাঠামোর পরিবর্তন বা নজরদারি বাড়িয়ে রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়। ব্যবসা সচল না থাকলে রাজস্ব আসবে কোথা থেকেÑএই সহজ সমীকরণটি নীতিনির্ধারকদের গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য এনবিআরের নির্দেশনা অনুযায়ী নতুন রাজস্ব আহরণ কৌশল নির্ধারণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কাস্টম হাউসের কমিশনার। আমরা আশা করব, এই নতুন কৌশল যেন কেবল করের বোঝা বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রয়োজন একটি ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা, এলসি প্রাপ্তি সহজ করা এবং দ্বিপক্ষীয় টানাপোড়েন নিরসনে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা। ভোমরা বন্দরের বাণিজ্য খাতের গতি ফেরাতে এবং রাজস্ব খাতের এই বড় ধাক্কা সামলে উঠতে এখন প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট, সমন্বিত ও কার্যকর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।