সংগীত মানুষের মনে নাড়া দেয়
প্রকাশ ঘোষ বিধান
সংগীত মানুষের মনে নাড়া দেয় কারণ এর সুর ও ছন্দ সরাসরি মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী অংশে প্রভাব ফেলে। গান শোনার সময় মস্তিষ্কে ডোপামিন নামক হরমোন নিঃসৃত হয়, যা মনের ভেতর আনন্দ, বিষণ্ণতা বা নস্টালজিয়ার মতো গভীর অনুভূতি জাগিয়ে তোলে।
সংগীত মানুষের জীবনে এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। নিয়মিত গান শুনলে মানসিক চাপ কমে, অবসাদ দূর হয়, সৃজনশীলতা বাড়ে।সংগীত মানুষের মনে আনন্দের মুহূর্তে উচ্ছ্বাস বাড়ায় এবং বেদনার মুহূর্তে সান্ত¡না খুঁজে পেতে সাহায্য করে। সুর ও ছন্দ মস্তিষ্কের লিম্বিক সিস্টেমকে উদ্দীপ্ত করে, যা আবেগ ও স্মৃতি নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রবিন্দু।
শ্রবণের পাশাপাশি শব্দ তরঙ্গ আমাদের শরীরে শারীরিক কাঁপুনি তৈরি করে, যা গভীর আবেগের সৃষ্টি করে।
সংগীত মানুষের মনে প্রভাব ফেলে। একটি ভালো গান বা সুর মুহূর্তের মধ্যে মানুষের ভেতর লুকিয়ে থাকা ভালোবাসা, স্মৃতি বা নস্টালজিয়া জাগিয়ে তুলতে পারে। মন খারাপের সময় গান শোনা মানসিক চাপ ও রাগ কমাতে অত্যন্ত কার্যকর। সুর ও লয় মস্তিষ্কে ডোপামিন নামক হরমোন নিঃসরণ বাড়ায়, যা মানুষকে আনন্দ ও প্রশান্তি দেয়। প্রিয় কোনো গানের তালে হৃৎপিন্ডের গতি ও রক্তচাপ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রিত হতে পারে। এই কারণেই সংগীত কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি মানুষের আত্মার খোরাক এবং অনুভূতির শক্তিশালী বহিঃপ্রকাশ। এটি ভাষা ও সংস্কৃতির সীমানা পেরিয়ে মানুষকে একে অপরের সাথে আবেগগতভাবে সংযুক্ত করে।
২১ জুন বিশ্ব সংগীত দিবস। শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে বিখ্যাত ফ্রান্স বিশ্ব সংগীত দিবস উদ্যাপনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ১৯৮১ সালে ফ্রান্সের সংস্কৃতিমন্ত্রী জ্যাক ল্যাং এই উৎসবকে একটি আন্তর্জাতিক রূপ দেয়ার চেষ্টা করেন। এই দিবসটির সঙ্গে ফ্রান্সের উৎসব ফেট ডে লা মিউজক উৎসবের যোগসূত্র রয়েছে। ১৯৮২ সালে বিশেষ এই সংগীত উৎসবের দিনটিই ওয়ার্ল্ড মিউজিক ডে হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। পৃথিবীতে শান্তি ও ইতিবাচক চিন্তাকে ছড়িয়ে দেয়াই দিবসটির উদ্দেশ্য। সংগীত ও সুর নির্দিষ্ট কোনো দেশের গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তাই গানের এই ভাষাকে সর্বজনীন ভাষাও বলা হয়ে থাকে।
সংগীতের মূল ভিত্তি হলো ধ্বনি বা নাদ। নিখুঁত ও শ্রুতিমধুর শব্দ এবং নির্দিষ্ট ছন্দ বা বিন্যাসের মাধ্যমে সংগীত সৃষ্টি হয়। সংগীত হলো স্বর, ধ্বনি ও সুসংবদ্ধ শব্দের এক শিল্পিত সমন্বয়, যা মানুষের মনে আনন্দ ও ভাবের সঞ্চার করে। সাধারণত গীত, বাদ্য এবং নৃত্য- এই তিনের সংমিশ্রণকে সংগীত বলা হয়। সুর, তাল ও লয়ের মাধ্যমে মানুষের আবেগ ও অনুভূতি প্রকাশের একটি শক্তিশালী মাধ্যম সংগীত।
সংগীত মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমাতে জাদুকরী ভূমিকা পালন করে। সংগীত সরাসরি মানুষের মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী অংশকে উদ্দীপিত করে মানুষের মনে ও শরীরে গভীর নাড়া দেয়। বিজ্ঞানীদের মতে, সংগীত কেবল আমাদের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থাই পরিবর্তন করে না, বরং এটি আমাদের হৃদস্পন্দন, রক্তচাপ এবং হরমোন নিঃসরণকেও সরাসরি প্রভাবিত করে।
গান শোনার সময় মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা অংশটি সক্রিয় হয়ে আমাদের আনন্দ, দুঃখ বা উত্তেজনাকে নিয়ন্ত্রণ করে। ধীরলয়ের বা পরিচিত কোনো সুর মস্তিষ্কে প্রোল্যাকটিন হরমোন তৈরিতে সাহায্য করে, যা পুরনো স্মৃতিকে সতেজ করে দ্রুত তাল বা রক মিউজিক শুনলে হার্ট রেট ও রক্তচাপ বাড়ে। শান্ত ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিক রক্তচাপ কমিয়ে শরীরকে আরামদায়ক অবস্থায় নিয়ে আসে। গান শোনার মাধ্যমে মানসিক অবসাদ, রাগ, ক্ষোভ ও হতাশা অনেকাংশে দূর হয়।
সংগীত মানুষকে নিজের ব্যক্তিত্ব, অনুভূতি ও জীবনের লক্ষ্য নিয়েতোলে। গবেষণায় দেখা গেছে যে সংগীত মানুষের কাজের একাগ্রতা, চিন্তাশক্তি ও শেখার আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়। সংগীতের এই জাদুকরী ক্ষমতার কারণেই মন খারাপের দিনে একটি সাধারণ গানও আমাদের মুহূর্তে চাঙ্গা করে তুলতে পারে।
গান সবার জীবনের শান্তি কামনা করা হয়। সংগীতের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে এখন চিকিৎসাও করা হয়। সারা বিশ্বেই নানা ভাষায় সমান তালে সংগীতের চর্চা চলছে। সংগীত হোক মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট









