দায়িত্বহীন সাংবাদিকতার ভিড়ে প্রশ্নবিদ্ধ মূলধারার সাংবাদিকতা
এম. এম হায়দার আলী
সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়,এটি সমাজের বিবেক, সত্য অনুসন্ধানের একটি দায়িত্বশীল মাধ্যম এবং গণতন্ত্রের অন্যতম শক্তিশালী স্তম্ভ। রাষ্ট্র, সমাজ ও জনগণের মধ্যে তথ্যের সেতুবন্ধন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু প্রযুক্তির সহজলভ্যতা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিস্তারের ফলে বর্তমানে এমন এক বাস্তবতার সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে প্রকৃত সাংবাদিকতা ও দায়বদ্ধ সংবাদ পরিবেশন আজ নানা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
বেশ কিছুদিন যাবত দেশে ব্যাঙের ছাতার মতো অসংখ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং ফেসবুক ভিত্তিক তথাকথিত সংবাদ মাধ্যম গড়ে উঠেছে। যা কোন নেতা বা সরকারি-বেসরকারি প্রোগ্রামে ছবি ওঠানোর জন্য স্টেজের সামনে ভিড় করে থাকা এদের যন্ত্রণায় প্রকৃত সাংবাদিকরা তাদের তথ্য সংগ্রহের জন্য একরকম বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে যাওয়ার ঘটনা নতুন কোন খবর নয়। যাদের অনেকেরই নেই সরকারি নিবন্ধন, নেই সম্পাদকীয় নীতিমালা, নেই কোনো পেশাগত জবাবদিহিতা ।
একটি স্মার্টফোন, একটি ফেসবুক পেজ কিংবা ইউটিউব চ্যানেল খুলেই কেউ কেউ নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন। ফলে সাংবাদিকতার মতো সম্মানজনক পেশার মর্যাদা ক্ষুণ্ন হচ্ছে। বিশেষ করে কিছু ভিউ ব্যবসায়ীরা দ্রুত খবর প্রকাশের প্রতিযোগিতায় অনেক ক্ষেত্রেই সত্যতা যাচাইয়ের পরিবর্তে গুজব, অর্ধসত্য কিংবা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে প্রকৃত সংবাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করার মতো ন্যাক্কারজনক কর্মকা- চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে তাদের এহেনো কর্মকা-ের কারণে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক সময় একটি ভুল বা উদ্দেশ্য প্রণোদিত সংবাদ একজন মানুষের সম্মান, কর্মজীবন এমনকি সামাজিক অবস্থানও ধ্বংস করে দিতে পারে। অন্যদিকে প্রকৃত সাংবাদিকরা প্রতিটি তথ্য একাধিক সূত্র থেকে যাচাই করে, নীতিমালা মেনে এবং পেশাগত ঝুঁকি নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেন।
তাঁদের কাজের পেছনে থাকে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণ ও নৈতিক দায়বদ্ধতা। কিন্তু দায়িত্বজ্ঞানহীন কিছু অনলাইন ও ফেসবুক ভিত্তিক কার্যক্রমের কারণে সাধারণ মানুষ অনেক সময় প্রকৃত সাংবাদিকদের প্রতিও সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকান। এতে পুরো সাংবাদিক সমাজের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাংবাদিকতা কখনো ব্যক্তিগত প্রচারণা, প্রতিপক্ষকে হেয় করা বা আর্থিক সুবিধা আদায়ের হাতিয়ার হতে পারে না। সংবাদ প্রকাশের মূল ভিত্তি হতে হবে সত্য, নিরপেক্ষতা, জনস্বার্থ এবং নৈতিকতা। যে সংবাদ মানুষের উপকারের পরিবর্তে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে, সেটি সাংবাদিকতা নয়, বরং সমাজের জন্য ক্ষতিকর।
সময়ের দাবি হলো,অনলাইন সংবাদমাধ্যম পরিচালনার ক্ষেত্রে কার্যকর নীতিমালা বাস্তবায়ন, নিবন্ধনবিহীন সংবাদ মাধ্যমের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সাংবাদিকদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও পেশাগত মানোন্নয়নের উদ্যোগ গ্রহণ। একই সঙ্গে সাধারণ জনগণকেও সচেতন হতে হবে, যাতে তারা যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো সংবাদ বিশ্বাস বা প্রচার না করেন। প্রযুক্তির এই যুগে অনলাইন সাংবাদিকতার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
বরং সঠিক নীতিমালা, জবাবদিহিতা ও পেশাগত মান বজায় রেখে পরিচালিত অনলাইন সাংবাদিকতাই ভবিষ্যতের শক্তিশালী গণমাধ্যম হতে পারে। তবে দায়বদ্ধতা, সত্যনিষ্ঠা ও নৈতিকতা ছাড়া কোনো সাংবাদিকতাই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। পরিশেষে বলা যায়, সাংবাদিকতার পরিচয় প্রেস কার্ডে নয়, বরং সত্য প্রকাশের সাহস, পেশাগত সততা এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতায়।
ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা অনিয়ন্ত্রিত অনলাইন ও ফেঁসবুক সাংবাদিকতার ভিড়ে আজ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন স্বচ্ছ, দায়িত্বশীল ও জবাবদিহি মূলক সাংবাদিকতা। কারণ, একমাত্র সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতাই পারে সমাজকে আলোকিত করতে, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে এবং মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে। আর দিনশেষে সেটাই যেন হয় এমনটি আশা আমার।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট












