সম্পাদকীয়/ দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা ও হুমকির মুখে সাতক্ষীরার কৃষি অর্থনীতি
filter: 0; jpegRotation: 0; fileterIntensity: 0.000000; filterMask: 0;
উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায় সৃষ্টি হওয়া দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা কেবল একটি সাময়িক প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং তা এখন এ অঞ্চলের কৃষি, জনস্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্যের জন্য এক মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এক তথ্যে উঠে এসেছে যে, স্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরার প্রায় সাড়ে ১২ হাজার হেক্টর জমিতে আমন ধানের আবাদ করা সম্ভব হয়নি। এর ফলে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এলাকার ২৫ থেকে ৩০ হাজার কৃষক। উপকূলীয় অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতির যে মূল ভিত্তি কৃষি, তা এভাবে ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
সাতক্ষীরার তালা, সদর, কলারোয়া, আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলার বিস্তীর্ণ ফসলি বিল দীর্ঘ বছর ধরে পানির নিচে তলিয়ে থাকছে। একদা যে জমিতে প্রচুর আমন ধান উৎপাদিত হতো, আজ সেখানে বছরের পর বছর ধরে কোনো ফসল ফলানো যাচ্ছে না। কৃষি ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি উন্মুক্ত চারণভূমি না থাকায় কমে যাচ্ছে গবাদিপশুর সংখ্যা। শুধু তা-ই নয়, দীর্ঘস্থায়ী স্থির দূষিত পানির কারণে নিরাপদ পানির চরম সংকট, পয়োনিষ্কাশন সমস্যা এবং চর্মরোগসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি মারাত্মক আকার ধারণ করছে। একই সঙ্গে উদ্ভিদ, জলজ প্রাণী ও দেশীয় মাছের স্বাভাবিক আবাসস্থল ধ্বংস হয়ে ভেঙে পড়ছে সামগ্রিক পরিবেশের ভারসাম্য।
এই কৃত্রিম ও প্রাকৃতিক সংকট জটিল হওয়ার পেছনে পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের পাশাপাশি মানুষের তৈরি নানা প্রতিবন্ধকতা প্রধানত দায়ী। নদ-নদীর নাব্যতা হ্রাস ও অতিবৃষ্টির সাথে যোগ হয়েছে অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ এবং খাল-বিল দখলের প্রবণতা। প্রভাবশালী শ্রেণির হাতে সরকারি নদী ও খাল দখল হয়ে থাকায় স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। যদি খাল ও নদীগুলো দ্রুত পুনঃখনন না করা হয় এবং সাধারণ কৃষকদের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত না করা হয়, তবে প্রতি বছর অনাবাদি জমির পরিমাণ কেবল বাড়তেই থাকবে।
জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পেতে এবং সাতক্ষীরার কৃষি ও জনজীবন রক্ষা করতে অবিলম্বে সরকারের সমন্বিত ও বৈজ্ঞানিক মহাপরিকল্পনা গ্রহণ প্রয়োজন। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ইতিপূর্বে খাল পুনঃখননের মাধ্যমে কিছু জমিতে আবাদ ফিরিয়ে আনতে পেরেছে, যা প্রমাণ করে যে কার্যকর পদক্ষেপ নিলে সুফল পাওয়া সম্ভব। তাই বিল ও নদীর পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক করতে এলাকাভিত্তিক জলবিজ্ঞানবিষয়ক সমীক্ষা চালানোর পাশাপাশি জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকার জন্য সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন ও বিকল্প চাষাবাদ পদ্ধতি জোরদার করতে হবে।
একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত কৃষি পুনর্বাসন সহায়তার আওতায় আনা এবং তাদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। সাতক্ষীরার কৃষিজমি ও পরিবেশকে দীর্ঘস্থায়ী অবক্ষয়ের হাত থেকে বাঁচাতে নদী ও খালের অবৈধ দখল উচ্ছেদ, পুনঃখনন এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সচল করার বিকল্প নেই। নীতিনির্ধারকেরা এ সংকটের স্থায়ী ও টেকসই সমাধানে দ্রুত নজর দেবেনÑএটাই আমাদের প্রত্যাশা।












