বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ১০ বৈশাখ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ১০ বৈশাখ ১৪৩৩

সাতক্ষীরায় থমকে আছে প্রতিবন্ধী উন্নয়ন কমিটির চাকা, উপবৃত্তি পাচ্ছে মাত্র ২ শতাংশ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬, ২:৪৭ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরায় থমকে আছে প্রতিবন্ধী উন্নয়ন কমিটির চাকা, উপবৃত্তি পাচ্ছে মাত্র ২ শতাংশ

মো. হোসেন আলী: সাতক্ষীরা জেলায় ৬৭ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী মানুষের বসবাস থাকলেও তাদের অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আইনি কাঠামোর সঠিক প্রয়োগ নেই বললেই চলে। একদিকে শিক্ষা উপবৃত্তি থেকে বঞ্চিত বিশাল এক অংশ, অন্যদিকে উপজেলা পর্যায়ের সুরক্ষা কমিটিগুলোর নিষ্ক্রিয়তা, এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছেন জেলার হাজার হাজার প্রতিবন্ধী মানুষ।

জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সাতক্ষীরা জেলায় মোট নিবন্ধিত প্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যা ৬৭ হাজার ৮৬ জন। এর মধ্যে ৫৫ হাজার ৭২৫ জন মাসিক ভাতা পেলেও শিক্ষা উপবৃত্তি পাচ্ছেন মাত্র ১ হাজার ৩৬৫ জন শিক্ষার্থী। শতাংশের হিসেবে যা মোট প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর মাত্র ২ শতাংশের সামান্য বেশি। তবে জেলায় মোট প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর সঠিক কোনো পরিসংখ্যান জেলা শিক্ষা অফিস বা পরিসংখ্যান অফিসে সংরক্ষিত নেই।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা জানান, উচ্চশিক্ষার খরচ মেটাতে না পেরে অনেকেই মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। তবে সমাজসেবা কার্যালয় জানিয়েছে, চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম থাকায় আবেদনকারী সকল যোগ্য শিক্ষার্থীকে এই তালিকার আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না।

উপবৃত্তি না পাওয়ার কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হিমশিম খাচ্ছেন অনেক শিক্ষার্থী। এমনই একজন সাতক্ষীরা সদরের শিমুলবাড়িয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী আশিস বিশ্বাস, যিনি হাতের কম্পনজনিত শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে এবারের (২০২৬) পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন।

পরীক্ষা কেন্দ্রের অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে আশিস বলেন, আমি কোনো শিক্ষা উপবৃত্তি পাই না। অভাবের সংসারে পড়াশোনা চালানোই কঠিন। আজ পরীক্ষার দিনেও সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়েছে সময় নিয়ে। নিয়ম অনুযায়ী অতিরিক্ত সময় পাওয়ার কথা থাকলেও আমাকে তা দেওয়া হয়নি। নির্ধারিত সময়েই খাতা নিয়ে নেওয়া হয়েছে। আমার জন্য স্বাভাবিক গতিতে লেখা সম্ভব না।

তিনি আরও জানান, শিক্ষকদের কাছ থেকে জেনেছেন যে নির্ধারিত ফরমে আবেদন করে শ্রুতিলেখকের অনুমতি নিতে হয়। তবে এ বিষয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা ও সহায়তা না পাওয়ায় তিনি সময়মতো আবেদন করতে পারেননি। ফলে নিজের সীমাবদ্ধতা নিয়েই পরীক্ষা দিতে হচ্ছে তাকে।

অন্যদিকে, প্রতিবন্ধকতা যে মেধার পথে বাধা হতে পারে না, তার উদাহরণ মো. সিহাব সিদ্দিকী। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়েও তিনি ২০১৯ সালে ‘শাপলা প্রতিবন্ধী যুব উন্নয়ন সংস্থা’ প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে ৬২ জন সদস্যের এই সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে ২০২২ সালে এসএসসি ও ২০২৪ সালে এইচএসসি পাস করেছেন সিহাব।

তবে নিজের অভিজ্ঞতায় বৈষম্যের চিত্রই তুলে ধরেন তিনি। সিহাব বলেন, একজন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষাজীবন এক ধরনের যুদ্ধ। আইন অনুযায়ী অতিরিক্ত সময় ও শ্রুতিলেখকের সুবিধা থাকলেও বাস্তবে তা অনেক সময় পাওয়া যায় না। ফলে পরীক্ষা কেন্দ্রে গিয়ে শিক্ষার্থীদের এসব অধিকার পেতে অনুরোধ করতে হয়।

তিনি আরও বলেন, জেলায় ভাতার তুলনায় উপবৃত্তি পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা খুবই কম, যা প্রমাণ করে প্রতিবন্ধীদের প্রতি সহানুভূতি থাকলেও তাদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করার উদ্যোগ কম। পাশাপাশি প্রতিবন্ধীদের জন্য গঠিত উপজেলা সুরক্ষা কমিটিগুলোও কার্যত নিষ্ক্রিয়। নিয়মিত সভা না হওয়ায় তাদের দাবি ও সমস্যাগুলো সামনে আসে না।

এই প্রতিকূলতার চিত্র আরও ভয়াবহ নারী প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক নারী প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী বলেন, আমাদের জন্য পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াটাই কঠিন, তার ওপর পরীক্ষা কেন্দ্রে গিয়ে আরও সমস্যায় পড়তে হয়। শ্রুতিলেখক বা অতিরিক্ত সময় পাওয়ার বিষয়গুলো নিয়ে পরিষ্কারভাবে কেউ আগে থেকে জানায় না। মেয়েদের ক্ষেত্রে যাতায়াত ও কেন্দ্রে ওঠানামার সমস্যাও থাকে। অনেক সময় এসব কারণে ঠিকমতো পরীক্ষা দিতে পারি না।

‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩’-এর ২৩ ধারা অনুযায়ী, প্রতিটি উপজেলায় একটি সংবিধিবদ্ধ ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা কমিটি’ থাকার বিধান রয়েছে। প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রতি তিন মাসে অন্তত একবার এই কমিটির সভা হওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু সাতক্ষীরার চিত্র ভিন্ন। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘ সময় ধরে এসব কমিটির কোনো সভা হচ্ছে না।

প্রতিবন্ধীব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা সংক্রান্ত উপজেলা কমিটির সভাপতি এবং সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অর্ণব দত্ত বলেন, আমরা নিয়মিত তদারকির চেষ্টা করি। তবে অনেক সময় দাপ্তরিক ব্যস্ততায় নির্দিষ্ট সময় অন্তর সভা করা সম্ভব হয় না। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা কেন্দ্রে নিয়ম অনুযায়ী সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে কেন্দ্র সচিবদের সঙ্গে কথা বলা হবে।

সাতক্ষীরা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক সায়েদুর রহমান মৃধা নিয়মিত সভা না হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, আমাদের উপজেলা পর্যায়ে কাজের চাপ অনেক বেশি থাকে, যে কারণে প্রতি তিন মাস পর পর সভা করা সবসময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। সাধারণত যখন বিশেষ কোনো প্রয়োজন দেখা দেয়, তখনই আমরা সভা আহ্বান করি। তবে নিয়মিত না হলেও বছরে গড়ে ১টি বা ২টি সভা হয়ে থাকে। আমরা চেষ্টা করছি সামনের দিনগুলোতে এই সমন্বয় আরও বাড়াতে।

গত এক বছরে জমা পড়া অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের কাছে এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ জমা পড়েনি। তবে অনেক সময় ভুক্তভোগীরা আমাদের কাছে এসে মৌখিকভাবে তাদের সমস্যার কথা জানান। আমরা চেষ্টা করি তাৎক্ষণিকভাবে সেসব সমস্যার সমাধান করে দিতে।

উপবৃত্তির সীমাবদ্ধতা প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, জেলায় প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ উপবৃত্তি থেকে বঞ্চিত থাকার মূল কারণ হলো চাহিদার তুলনায় বরাদ্দের স্বল্পতা। বরাদ্দ কম থাকায় অনেক সময় আবেদনকারী সকল যোগ্য শিক্ষার্থীকে এই তালিকার আওতায় আনা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয় না।

সাতক্ষীরা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী এসএম বিপ্লব হোসেন মনে করেন, কমিটির এই নিষ্ক্রিয়তা আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। তিনি বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন-২০১৩ এটি একটি সংবিধিবদ্ধ আইন যার বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক। আইনের ২৩ ধারা অনুযায়ী উপজেলা কমিটিগুলোর নিয়মিত সভা না হওয়া এবং নীতিমালার তোয়াক্কা না করে পরীক্ষা কেন্দ্রে অতিরিক্ত সময় না দেওয়া সরাসরি আইনের লঙ্ঘন। এমনকি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের স্থানীয় সরকারের স্থায়ী কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত না করাও তাদের সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করার শামিল।

তিনি আরও বলেন, সরকারি কর্মকর্তারা ‘কাজের চাপে’ সভা করতে না পারার যে অজুহাত দিচ্ছেন, তা আইনি দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ এই কমিটিগুলো গঠিত হয়েছে বিশেষ একটি জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে। সংশ্লিষ্ট প্রশাসন যদি আইন ও নীতিমালার এই ব্যত্যয়গুলো দ্রুত সমাধান না করে, তবে ভুক্তভোগীরা আইনি প্রতিকারের জন্য উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার সুযোগ রাখেন।

মানবাধিকার কর্মী মাধব চন্দ্র দত্ত বলেন, কাজের চাপের অজুহাত দিয়ে একটি সংবিধিবদ্ধ কমিটির সভা বন্ধ রাখা যায় না। এর ফলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা তাদের অধিকার ও অভাব-অভিযোগ জানানোর কোনো কার্যকর প্ল্যাটফর্ম পাচ্ছেন না। আইন অনুযায়ী কমিটি গঠন করা হয়েছে তাদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য। কিন্তু সভা না হওয়া মানে তাদের সমস্যাগুলোকে এড়িয়ে যাওয়া। নিয়মিত তদারকি না থাকায় ইউনিয়ন ও উপজেলা পরিষদের স্থায়ী কমিটিগুলোতেও প্রতিবন্ধীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হচ্ছে না।

অপরদিকে, জেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, পাবলিক ও শ্রেণি পরীক্ষায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বা শারীরিক অক্ষমতার কারণে যারা লিখতে পারেন না, তাদের জন্য শ্রুতিলেখক ও সহায়তাকারীর স্পষ্ট নীতিমালা রয়েছে। নতুন নীতিমালা (২০২৫) অনুযায়ী, একজন পরীক্ষার্থী চাইলে নিজের পছন্দের বা কেন্দ্র থেকে সরবরাহকৃত যোগ্যতাসম্পন্ন শ্রুতিলেখকের সাহায্যে পরীক্ষা দিতে পারবেন। এক্ষেত্রে পরীক্ষার্থী প্রতি ঘণ্টায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময় পাওয়ার অধিকারী।

শিক্ষা অফিস আরও জানায়, নিয়ম অনুযায়ী পরীক্ষার আগে নির্ধারিত ফরমে কর্তৃপক্ষের কাছে শ্রুতিলেখকের অনুমতির আবেদন করতে হয়। শ্রুতিলেখককে অবশ্যই পরীক্ষার্থীর চেয়ে অন্তত এক বা দুই ধাপ নিচের ক্লাসের (যেমন এসএসসির জন্য ৮ম বা ৯ম শ্রেণি) শিক্ষার্থী হতে হবে। বোর্ড বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই যোগ্যতা যাচাই করে অনুমোদন প্রদান করেন। তবে শিক্ষা অফিসে এ সংক্রন্ত কোনো অভিযোগ কেউ করেনি।

এ ব্যাপারে সাতক্ষীরা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আলমগীর কবীর বলেন, শ্রুতিলেখকের অনুমতির জন্য এখন পর্যন্ত কেউ আবেদন করেনি। এছাড়া কতজন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে, সে সম্পর্কেও আমাদের কাছে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ কমাতে আমরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছি। কেউ যদি কোনো সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়, তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আমরা ব্যবস্থা নেব।

Ads small one

তাপপ্রবাহ, বিদ্যুৎঘাটতি ও অন্ধকারের অন্তর্লিখন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬, ৩:৫৩ অপরাহ্ণ
তাপপ্রবাহ, বিদ্যুৎঘাটতি ও অন্ধকারের অন্তর্লিখন

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

বাংলাদেশে গ্রীষ্ম মানেই তাপদাহ, আর তাপদাহ মানেই বিদ্যুতের ওপর বাড়তি চাপ-এই বাস্তবতা নতুন নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতি কেবল মৌসুমি চাপের সীমা অতিক্রম করে একটি গভীর কাঠামোগত সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। রাজশাহী, খুলনা বিভাগসহ দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তাপপ্রবাহের সঙ্গে বিদ্যুৎঘাটতি যেভাবে একসঙ্গে প্রকট হয়েছে, তা আমাদের বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতা, পরিকল্পনার অসামঞ্জস্য এবং জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতার একটি সুস্পষ্ট প্রতিফলন।

 

এই সংকটকে বোঝার জন্য কেবল বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলেই হবে না; বরং এর পেছনের কাঠামোগত কারণ, নীতিগত সিদ্ধান্ত, আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রভাব-সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ে-এটি একটি স্বাভাবিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া। গরমে ফ্যান, এয়ারকন্ডিশনার, পানির পাম্প-সবকিছুর ব্যবহার বেড়ে যায়।

 

শিল্পকারখানায়ও শীতলীকরণ ব্যবস্থার প্রয়োজন বাড়ে। ফলে বিদ্যুতের চাহিদা একধাক্কায় কয়েক হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি পৌঁছানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে উৎপাদন হচ্ছে তার চেয়ে অনেক কম। ফলে তৈরি হচ্ছে ঘাটতি, যা লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে সামাল দেওয়া হচ্ছে।

 

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো-এই চাহিদা কি সত্যিই অপ্রত্যাশিত? না, মোটেই নয়। আবহাওয়া অধিদপ্তর প্রতি বছরই তাপমাত্রা বৃদ্ধির পূর্বাভাস দেয়। কাজেই পরিকল্পনা থাকলে এই চাহিদা মোকাবিলা করা সম্ভব ছিল। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো-উৎপাদন সক্ষমতা ও বাস্তব উৎপাদনের মধ্যে বিশাল ব্যবধান।

 

দেশে প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও বাস্তবে তা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এর প্রধান কারণগুলো হলো: গ্যাস, কয়লা ও তেলের সরবরাহে ঘাটতি বিদ্যুৎ উৎপাদনের সবচেয়ে বড় বাধা। গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো গ্যাস পাচ্ছে না, কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো কয়লার অভাবে বন্ধ বা আংশিক চালু, আর তেলচালিত কেন্দ্রগুলো তেলের উচ্চমূল্য ও বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে সীমিত উৎপাদনে বাধ্য হচ্ছে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত ক্রমেই আমদানিনির্ভর হয়ে উঠেছে।

 

কয়লা, এলএনজি, এমনকি বিদ্যুৎও আমদানি করতে হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি বা সরবরাহে বিঘœ ঘটলেই দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যাহত হয়। বড় বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা নতুন নয়। কিন্তু সংকটের সময় এসব ত্রুটি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। গত এক দশকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ হয়েছে। নতুন নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে, উৎপাদন সক্ষমতা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু এই বিনিয়োগের একটি বড় অংশ ছিল পরিকল্পনাহীন বা অসমন্বিত।

 

বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের আগে জ্বালানির স্থায়ী উৎস নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে এখন কেন্দ্র আছে, কিন্তু চালানোর মতো জ্বালানি নেই। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে করা চুক্তি অনুযায়ী, কেন্দ্র চালু থাকুক বা না থাকুক, সরকারকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দিতে হয়। এতে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ খাতে পরিকল্পনা অনেক সময় রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।

 

বর্তমান লোডশেডিং পরিস্থিতির একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো-গ্রামাঞ্চলে এর প্রভাব অনেক বেশি। শহরে তুলনামূলকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থিতিশীল থাকলেও গ্রামে দিনে ৮-১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। এই বৈষম্যের কারণগুলো হলো:শহরে শিল্প ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম বেশি, তাই সেখানে বিদ্যুৎ সরবরাহকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। গ্রামীণ বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতা সীমিত সরবরাহকে “লোড ম্যানেজমেন্ট” করার সময় গ্রামকে সহজ লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেওয়া কিন্তু এই নীতি দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর।

 

কৃষি, ক্ষুদ্র শিল্প ও গ্রামীণ অর্থনীতি এতে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। লোডশেডিং কেবল একটি প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়; এটি একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট। সেচব্যবস্থা বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। বিদ্যুৎ না থাকলে কৃষকরা সময়মতো জমিতে পানি দিতে পারেন না। ফলে ফসলের উৎপাদন কমে যায়। গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা রাতে পড়াশোনা করতে পারে না। পরীক্ষা সামনে থাকলেও তারা প্রস্তুতি নিতে ব্যর্থ হয়। তীব্র গরমে বিদ্যুৎ না থাকলে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষের কষ্ট বহুগুণ বেড়ে যায়।

 

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সংকটকে পুরোপুরি অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবে দেখা যাবে না। আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তনও এখানে বড় ভূমিকা রাখছে। তবে প্রশ্ন হলো-এই ঝুঁকিগুলো কি আগে থেকে অনুমান করা যেত না? নিশ্চয়ই যেত। কিন্তু সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সমন্বয়। জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি আমদানি নিশ্চিত করা, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ জোরদার করা, লোডশেডিং বণ্টনে ন্যায্যতা নিশ্চিত করা, দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করা, বিদ্যুৎ খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, পরিকল্পনা প্রণয়নে রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনা করা, বর্তমান বিদ্যুৎ সংকট কেবল একটি মৌসুমি সমস্যা নয়; এটি একটি কাঠামোগত ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ।

 

তাপপ্রবাহ সাময়িকভাবে এই সংকটকে তীব্র করেছে, কিন্তু এর মূল কারণ নিহিত রয়েছে নীতিগত দুর্বলতা ও পরিকল্পনার ঘাটতিতে। যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে ভবিষ্যতে এই সংকট আরও ঘন ঘন ও তীব্র আকারে ফিরে আসবে। বিদ্যুৎ খাত একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মেরুদ-। সেই মেরুদ- যদি দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে উন্নয়নের পুরো কাঠামোই ঝুঁকির মুখে পড়ে। অতএব, সময় এসেছে কাগুজে সক্ষমতার মোহ থেকে বেরিয়ে বাস্তবসম্মত, টেকসই ও জবাবদিহিমূলক বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার দিকে এগিয়ে যাওয়ার। নইলে তাপপ্রবাহের সঙ্গে সঙ্গে অন্ধকারই হবে আমাদের নিত্যসঙ্গী।

লেখক: সংবাদকর্মী

সাতক্ষীরায় জাতীয় পুষ্টি সপ্তাহ উপলক্ষে র‌্যালি ও আলোচনা সভা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬, ৩:৪৪ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরায় জাতীয় পুষ্টি সপ্তাহ উপলক্ষে র‌্যালি ও আলোচনা সভা

সংবাদদাতা: “পুষ্টি বৈষম্যের দিন শেষ, গড়ব স্বনির্ভর বাংলাদেশ” এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে সাতক্ষীরায় জাতীয় পুষ্টি সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে বর্ণাঢ্য র‌্যালি ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) বেলা সাড়ে ১২ টায় সাতক্ষীরা সিভিল সার্জন অফিসের সামনে হতে জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান এর আয়োজনে এবং সিভিল সার্জন অফিস সাতক্ষীরার বাস্তবায়নে এক র‌্যালি বের হয়।

 

র‌্যালিটি প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের কনফারেন্স রুমে আলোচনা সভায় মিলিত হয়। সিভিল সার্জন ডাঃ আব্দুস সালাম এর সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন ও জাতীয় পুষ্টি সপ্তাহ ২০২৬ এর উদ্বোধন করেন সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মিজ আফরোজা আখতার। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিথুন সরকার।

এসময় পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক রওশানারা জামান, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ ফরহাদ জামিল, জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নাজমুন নাহার, জেলা সমাজ সেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. রোকনুজ্জামান, সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. আসাদুজ্জামান, সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডাঃ আব্দুর রহমানসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিগন উপস্থিত ছিলেন।

 

সমগ্র অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন, সিনিয়র স্বাস্থ্য শিক্ষা অফিসার মো. মাহবুবুর রহমান। আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি জেলা প্রশাসক মিজ আফরোজা আখতার বলেন, উন্নত বিশ্বে সকাল বেলা পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানোর ক্ষেত্রে সচেতন আছে। আমাদের বাচ্চাদের পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানোর জন্য পরিবার ও স্কুল-মাদরাসার শিক্ষকদের ভূমিকা রাখতে হবে, যে বাচ্চারা সকালে ডিমসহ পুষ্টিকর খাবার খেয়ে আসছে কি না। সুস্থ্য হিসেবে বাচ্চাকে গড়ে তুলতে হবে অবশ্যই পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে। একটি দেশকে এগিয়ে নিতে হলে, স্বনির্ভর বাংলাদেশ” গড়তে হলে অবশ্যই ছেলে মেয়েদের পুষ্টিকর সম্পন্ন খাবার খাওয়াতে হবে।

বেনাপোলে নির্যাতনের পর হত্যা, মরদেহ ফেলে গেল ধানক্ষেতে

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬, ৩:৩৬ অপরাহ্ণ
বেনাপোলে নির্যাতনের পর হত্যা, মরদেহ ফেলে গেল ধানক্ষেতে

এম এ রহিম, বেনাপোল (যশোর): যশোরের বেনাপোলে ধানক্ষেত থেকে ইউনুস আলী (৪৮) নামে এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নির্যাতনের পর তাকে হত্যা করে মরদেহটি ধানক্ষেতে ফেলে রেখে যায় দুর্বৃত্তরা বলে জানায় পুলিশ।

বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) সকালে সীমান্তবর্তী বড় আঁচড়া গ্রামের ধানক্ষেত থেকে ওই মরদেহটি উদ্ধার করা হয়।
নিহত ইউনুস আলী (৪৮) বেনাপোল পোর্ট থানার ছোট আঁচড়া গ্রামের মৃত মোস্তাব আলীর ছেলে। সে বেনাপোল থেকে আমদানিকৃত মালামালের ট্রাকের সাথে পৌছে দেওয়ার (স্কট) কাজ করতো।

পুলিশ ও স্থানীয়রা জানায়, নিহত ব্যক্তির শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, দুর্বৃত্তরা তাকে নির্যাতনের পর হত্যা করে মরদেহটি ধানক্ষেতে ফেলে রেখে গেছে।

বেনাপোল পোর্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশরাফ হোসেন জানান, সকালে স্থানীয় কৃষকরা মাঠে কাজ করতে গিয়ে ধানক্ষেতে মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে পুলিশে খবর দেয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য যশোর ২৫০ শষ্যা জেনারেল হাসপাতালে পাঠায়।

ওসি আরও জানান, হত্যার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করতে পুলিশের তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।