আর কত মায়ের বুঁক খালি হলে বন্ধ হবে ধর্ষণ ও হত্যা?
এমএম হায়দার আলী
দেশে বহুল আলোচিত ফুটফুটে শিশু শিক্ষার্থী রামিসা ধর্ষণ ও হত্যার রেশ না কাটতেই, আবারো মানিকগঞ্জের সিংগাইরে নিখোঁজের ছয় দিন পর মারিয়া (১৪) নামে এক স্কুলছাত্রীর খন্ডিত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। সম্পতি উপজেলার জামির্ত্তা ইউনিয়নের চন্দননগর এলাকায় কবরস্থান-সংলগ্ন একটি ঝোপ থেকে এই মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
নিহত মারিয়া সিংগাইর উপজেলার শায়েস্তা ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর দেওয়ানবাড়ি এলাকার প্রবাসী মিজানের মেয়ে বলে জানা গেছে। যে ঘটনায় উক্ত স্কুলের প্রধান শিক্ষক সহ ৮ জনকে পুলিশ ইতিমধ্যে গ্রেপ্তারও করেছে। শুধু রামিসা বা মারিয়া নয় বর্তমানে প্রতিদিন খবরের কাগজ খুললেই অথবা টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখলেই কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঢুকলেই ভেসে আসে একের পর এক হৃদয়বিদারক সংবাদ, শিশু কন্যা ধর্ষণ, নির্যাতন, তারপর নির্মম হত্যা।
শুধু কি অবুঝ শিশু, এই তালিকা থেকে বাদ পড়ছে না কিশোরী, যুবতী, মধ্যবয়সী এবং বৃদ্ধারাও। যা প্রতিটি ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর দেশজুড়ে ক্ষোভ, প্রতিবাদ, মানববন্ধন এবং বিচার দাবির ঝড় ওঠার বিষয়টি অস্বাভাবিক কোনো খবর নয়। পরে প্রশাসন নড়েচড়ে বসে, মামলা হয়, তদন্ত হয়, অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা গ্রেপ্তারও হয়। কিন্তু প্রশ্ন একটাই, আর কত মায়ের বুঁক খালি হলে এই নৃশংসতা বন্ধ হবে ? একটি শিশু যখন জন্ম নেয়, তখন তার পরিবার হাজারো স্বপ্ন বুনে।
বাবা-মা কল্পনা করেন, তাদের সন্তান একদিন বড় হবে, মানুষ হবে, পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করবে। কিন্তু কিছু নরপিশাচের লালসা ও পাশবিকতার কারণে সেই স্বপ্নগুলো মুহূর্তেই চুরমার হয়ে যায়। একটি নিষ্পাপ শিশুর প্রাণহীন দেহ যখন পরিবারের সামনে পড়ে থাকে, তখন পৃথিবীর কোনো বিচার, কোনো শাস্তি, কোনো ক্ষতিপূরণ সেই পরিবারের হারিয়ে যাওয়া সন্তানকে ফিরিয়ে দিতে পারে না। আমরা প্রায়ই বলি, অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অবশ্যই করতে হবে।
আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে এবং অপরাধীকে দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো,বিচার পেলেই কি নিহত শিশুটির পরিবার তাদের হারানো সন্তানকে ফিরে পায় ? একজন মায়ের বুকের শূন্যতা কি ফাঁসির রায়ে পূরণ হয়? একজন বাবার চোখের জল কি আদালতের রায়ে শুকিয়ে যায়? ভাই-বোনদের শোক কি কোনো শাস্তি মুছে দিতে পারে ? উত্তর হলো, না। বিচার অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করতে পারে, কিন্তু পরিবারের ক্ষত সারাতে পারে না।
তাহলে সমাধান কোথায় ? শুধু কঠোর আইন করলেই এই অপরাধ পুরোপুরি বন্ধ হবে না। আর তাই যদি হতো তাহলে দেশের আইনি ব্যবস্থায় বহু ধর্ষক-হত্যাকারীকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড পর্যন্ত দেয়ার নজির রয়েছে। কিন্তু কই বন্ধ তো হচ্ছে না। এর জন্য প্রয়োজন সামাজিক, পারিবারিক, ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের পূর্ণজাগরণ। পরিবার থেকে সন্তানদের মানবিক শিক্ষা দিতে হবে। নারী ও শিশুদের প্রতি সম্মানবোধ গড়ে তুলতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষার চর্চা বাড়াতে হবে। সমাজের প্রতিটি মানুষকে সচেতন হতে হবে এবং সন্দেহজনক আচরণ দেখলে নীরব না থেকে প্রতিবাদ করতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছত্রছায়ায় অপরাধীরা সাহস পায়। রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থের প্রভাব কিংবা ক্ষমতার কারণে অপরাধীরা যদি পার পেয়ে যায়, তাহলে সমাজে ভুল বার্তা যায়। তাই অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধকেই বিবেচনায় এনে দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার, স্কুল, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সমন্বিত ভাবে কাজ করতে হবে।
শিশুদের নিজেদের নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে। কোনো শিশু যদি ভয়, অস্বস্তি বা নির্যাতনের ইঙ্গিত দেয়, তবে তা গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। একটি সভ্য সমাজে কোনো শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে বাবা-মাকে আতঙ্কে থাকতে হবে না। কিন্তু আজ বাস্তবতা হলো, সন্তান স্কুলে গেলে, খেলতে বাইরে গেলে কিংবা প্রতিবেশীর বাড়িতে গেলেও অনেক পরিবার দুশ্চিন্তায় থাকে। এটি কোনো সুস্থ সমাজের চিত্র হতে পারে না।
আজ সময় এসেছে শুধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশের নয়, বাস্তব পরিবর্তনের জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়ার। কারণ প্রতিটি নিহত শিশু শুধু একটি পরিবারের সন্তান নয়; সে পুরো জাতির সন্তান। তার কান্না, তার অসমাপ্ত স্বপ্ন, তার মায়ের আহাজারি আমাদের সকলের বিবেককে প্রশ্ন করে। আর কত শিশুর জীবন নষ্ট হলে আমরা সত্যিকার অর্থে জেগে উঠব ? আর কত মায়ের বুঁক খালি হলে আমরা বুঝব, এটি শুধু একটি অপরাধ নয়,এটি মানবতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ?
যেদিন সমাজের প্রতিটি মানুষ শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের বিরুদ্ধে আপোষহীন অবস্থান নেবে, যেদিন অপরাধী জানবে কোনো প্রভাব বা ক্ষমতা তাকে রক্ষা করতে পারবে না, যেদিন পরিবার, শিক্ষা ও সমাজ মিলিত ভাবে মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তুলবে, সেদিনই হয়তো আমরা এমন বিভীষিকাময় সংবাদ থেকে মুক্তি পাবো। ততদিন পর্যন্ত প্রতিটি বিবেকবান মানুষের একটাই আহ্বান, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন, অপরাধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন, নীরবতা ভাঙুন। কারণ একটি শিশুর জীবন কোনো পরিসংখ্যান নয়, সে একটি পরিবারের স্বপ্ন, একটি জাতির ভবিষ্যৎ-নয় কি…?
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট









