মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩

শব্দ, মাটি ও দ্রোহের সমীকরণ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬, ১:০৪ পূর্বাহ্ণ
শব্দ, মাটি ও দ্রোহের সমীকরণ

মোঃ রুহুল আমিন
সাহিত্যের ব্যাকরণ ও নতুন ধারার অভ্যুদয়
সাহিত্যের ইতিহাস কোনো স্থির নদী নয়; তা মূলত মানুষের সমাজ-সংগ্রাম, রাষ্ট্রীয় ভাঙাগড়া এবং সাংস্কৃতিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত এক গতিশীল ধারা। একটি নির্দিষ্ট সময়ের সাহিত্যিক আভিজাত্য যখন মেকি ভদ্রতা ও শব্দবিলাসের বৃত্তে বন্দী হয়ে পড়ে, তখনই কোনো এক কালজয়ী স্রষ্টার হাত ধরে জন্ম নেয় নতুন প্রাতিষ্ঠানিক বিপ্লব। সমসাময়িক বাংলা কবিতার আকাশে রেশম লতা ঠিক তেমনই এক আপসহীন, দূরদর্শী এবং ‘নতুন ধারা’র অগ্রণী ও বিপ্লবী কণ্ঠস্বর। প্রথাগত কাব্যের তথাকথিত শুদ্ধ বা মার্জিত ভাষার দেয়াল ধসিয়ে দিয়ে তিনি যেভাবে মাটির কাছাকাছি কথ্য ও আঞ্চলিক ভাষাকে প্রতিবাদের সর্বাধুনিক রাজনৈতিক হাতিয়ার করে তুলেছেন, তা সমকালের সাহিত্যে এক যুগান্তকারী ঘটনা। তাঁর জীবন ও তাঁর কবিতা—উভয়ই মূলত একই মোহনায় এসে মিশেছে, যার এক প্রান্তে রয়েছে গভীর অ্যাকাডেমিক মননশীলতা এবং অন্য প্রান্তে রয়েছে গণমানুষের প্রতি তীব্র সামাজিক দায়বদ্ধতা।
শিকড় থেকে গবেষক সত্তার প্রাতিষ্ঠানিক উত্তরণ। রেশম লতার জীবন আলেখ্যের দিকে গভীরভাবে নজর দিলে দেখা যায়, তাঁর সাহিত্যিক চেতনার মজবুত ভিত্তিটি তৈরি হয়েছে বাংলার লোকজ মাটি ও প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষার এক অনন্য মেলবন্ধনে।
জন্ম, পরিবার ও শৈশবের আবহ: রেশম লতার জন্ম ১৯৯৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি নেত্রকোণা জেলার পূর্বধলা উপজেলার বুধি গ্রামে। নেত্রকোণার উর্বর লোকজ ঐতিহ্য, বাউল সাধনা এবং মৈমনসিংহ গীতিকার আবহ তাঁর শৈশবেই মনের অবচেতনে সাহিত্যের গভীর বীজ রোপণ করেছিল। তাঁর পিতা আছকর আলী এবং মাতা আসমা বেগম। দুই ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি চতুর্থ। একটি বৃহৎ ও একান্নবর্তী পারিবারিক আবহে বড় হওয়ার কারণে মানুষের মনস্তত্ত্ব, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং সামাজিক বৈষম্যকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল তাঁর।
তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন অত্যন্ত গৌরবময় ও নিয়মতান্ত্রিক। তিনি ২০১৩ সালে পূর্বধলা উচ্চ বিদ্যালয় হতে সফলতার সাথে এসএসসি এবং ২০১৫ সালে পূর্বধলা ডিগ্রি কলেজ হতে এইচএসসি পাস করেন। এরপর উচ্চশিক্ষার তাগিদে তিনি ঢাকা সংলগ্ন অঞ্চলে চলে আসেন এবং ২০১৯ সালে গাজীপুর সরকারি মহিলা কলেজ থেকে বাংলা বিষয়ে স্নাতক (সম্মান/অনার্স) ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০২০ সালে ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজ হতে প্রথম শ্রেণিতে স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) ডিগ্রি লাভ করার পরও তাঁর সাহিত্যের তৃষ্ণা নিভে যায়নি। ফলশ্রুতিতে তিনি কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় হতে পুনরায় একই বিষয়ে (বাংলা) স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সর্বোচ্চ শিখর ছোঁয়ার লক্ষ্যে বর্তমানে তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধীনে একজন এম.ফিল গবেষক হিসেবে অধ্যয়নরত আছেন।
কর্মজীবনের শুরুতেই তিনি শিক্ষকতাকে ব্রত হিসেবে বেছে নেন। প্রথমে গাজীপুর অগ্রণী মডেল কলেজের বাংলা বিভাগে প্রভাষক এবং পরবর্তীতে গাজীপুর সাইফুদ্দিন মডেল স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে অত্যন্ত সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেন। এই শিক্ষকতা ও প্রশাসনিক কর্মজীবন তাঁকে তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্ব, শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরকার ক্ষয়িষ্ণু রূপ এবং সমাজ কাঠামোর অবক্ষয়কে খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ ও ব্যবচ্ছেদ করার সুযোগ করে দেয়।
একজন মননশীল গবেষক হিসেবে তাঁর ভূমিকা সম্বলিত প্রকাশিত দুটি কালজয়ী গ্রন্থ হলো—কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস ‘অহিংসা’ এবং বাংলা লোক-সাহিত্যের অমূল্য আকর ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’। এছাড়া দেশের শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক পত্রিকায় তাঁর রচিত শতাধিক সাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধ, নিখুঁত অনুবাদ, কবিতা ও গল্প প্রকাশিত হয়েছে।
চার কবিতার নিবিড় ও দীর্ঘ ভাব বিশ্লেষণ।
রেশম লতার কবিতা কেবল সুন্দরের আরাধনা কিংবা বায়বীয় কল্পনাবিলাসের বৃত্তে বন্দী নয়, বরং তা সমকালীন সমাজ, রাজনীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, ফ্যাসিবাদের উত্থান এবং বুদ্ধিবৃত্তিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে এক জ্বলন্ত প্রতিরোধ। তাঁর চারটি বহুল আলোচিত কবিতার ব্যবচ্ছেদ করলে তাঁর বৈপ্লবিক দর্শনের গভীরতা ও রূপকের বহুমাত্রিক ব্যবহার স্পষ্ট হয়ে ওঠে:
কণ্ঠরোধের রাজনীতি ও শোষণের উপহাস
‘নেয়ামত’ কবিতায় কবি অত্যন্ত তীব্র ও ধারালো শ্লেষের (ঝধঃরৎব) সাহায্যে স্বৈরতান্ত্রিক ক্ষমতা কাঠামোর নগ্ন ও বীভৎস রূপ উন্মোচন করেছেন। কবিতার শুরুতেই আঞ্চলিক ভাষায় চরম বিরাগ ও হতাশা প্রকাশ করে বলা হয়—“দেশ হান্দায়া গেছে / যাক। তোরা বাঁইচ্চা থাক।” এটি মূলত দেশের সংকটে সাধারণ মানুষের এক ধরনের অসহায় আত্মসমর্পণ।
কবি দেখিয়েছেন কীভাবে শাসক শ্রেণী সাধারণ মানুষের কণ্ঠরোধ করে তাকে তোষামোদের সংস্কৃতি গেলাতে চায়:
“নতুন বাবা আইছে তার পায়ে চুমা দিবা তিনখান / মাইকে বয়ান, ‘চুপ থাকা সবচেয়ে বড় নেয়ামত।’”
এখানে ‘নেয়ামত’ শব্দটি চরম ব্যঙ্গাত্মক ও পরিহাসমূলক। যখন রাষ্ট্র বা সমাজ অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের কথা বলার অধিকার কেড়ে নেয় এবং সেই আপসহীন নীরবতাকেই ‘শান্তি বা পরম নেয়ামত’ বলে প্রচার করে, কবি তখন তাঁর কলমকে চাবুক বানিয়ে তোলেন। “নুনেরচে এহন খুনের দাম কম”—লাইনটির মাধ্যমে তিনি বিচারহীনতার এক ভয়াবহ, সস্তা এবং অমানবিক বাস্তবতাকে আমাদের সামনে নগ্নভাবে দাঁড় করিয়ে দেন।
জাতীয় সংকট ও সান্ত¡নার তোষামোদ
‘একগাট্টি মুলা’ কবিতাটি গণমানুষের হাহাকার এবং বিপরীতে শাসকগোষ্ঠীর চরম উদাসীনতার এক জীবন্ত রাজনৈতিক দলিল। যখন পুরো দেশ কোনো এক জাতীয় মহাসংকটে বা আন্দোলনে পুড়ছে (‘আমার সোনার দেশ পুইড়া কেমুন অঙ্গার হইতাছে’), তখন রাষ্ট্রযন্ত্র ও একশ্রেণীর মেরুদ-হীন চাটুকার গণমাধ্যম ব্যস্ত থাকে উৎসব ও প্রচারণার আনুষ্ঠানিকতায় (‘সারাদেশে একযোগে জুলাই সনদ স্বাক্ষর উপলক্ষে অনুষ্ঠান’)।
কবি সাধারণ মানুষের ঈশ্বরমুখী অসহায়ত্ব দেখানোর পাশাপাশি নেতার চূড়ান্ত স্তরের দায়িত্বহীনতাকে ফুটিয়ে তুলেছেন অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে:
“চুপ কর শালারা আমার লেতা এহন নাকে তেল দিয়া ঘুমাইব ; কাইল তার বিদেশ সফরথথ / এয়ারপোর্টে হাত বান্ধিস একগাট্টি মুলা দিমুনে-”
এখানে ‘একগাট্টি মুলা’ একটি অভাবনীয় ও শক্তিশালী রূপক। এর অর্থ হলো, শোষিত ও অধিকারবঞ্চিত জনগণকে তাদের রাষ্ট্রীয় ও মানবিক ন্যায্য পাওনা না দিয়ে সান্ত¡না পুরস্কার হিসেবে সস্তা উপহাস বা অন্তসারশূন্য মিথ্যা আশ্বাস ছুঁড়ে দেওয়া হয়, যা জনগণের সাথে এক ধরনের পরিহাস।
ফ্যাসিবাদের আগ্রাসন ও মনস্তাত্ত্বিক অবদমন-এই কবিতাটিতে রেশম লতা গ্রামীণ ঐতিহ্য, স্মৃতিকাতরতা এবং সমকালীন ফ্যাসিবাদের আগ্রাসনকে এক সুতোয় বেঁধেছেন। অতীতে যেখানে ‘মিনাফুফির জিরনখালে খাজনার বাঁশি’ বাজতো, অর্থাৎ গ্রামীণ জীবন যেখানে মুখরিত, স্বতঃস্ফূর্ত ও স্বাধীন ছিল, আজ ফ্যাসিবাদের (কবিতার ভাষায়: নাৎসিত্ব) ছোঁয়ায় তা ‘হাঞ্জারমাঠ’ বা উষর প্রান্তরে পরিণত হয়েছে।
সমাজে যখন অন্যায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়, তখন সাধারণ মানুষ নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এক প্রকার ভয়ের সংস্কৃতিতে (ঈঁষঃঁৎব ড়ভ ঋবধৎ) শামিল হয়। কবি এই মনস্তাত্ত্বিক দাসত্ব ও ভীরুতাকে চিহ্নিত করেছেন নিখুঁতভাবে:
“আমরা অতিথি সাইজে দেহি আর হাততালি দেই / য্যামনে হাতুড়ি পেটা কইরা আমার কইলজা ভাঙছে / তয় কই না কিছুই, পাপের ভারে ঠোঁট চাইপে থাহে”
এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা না বলার যে গোপন অপরাধবোধ ও মানসিক যন্ত্রণা, তা গ্রাস করছে পুরো সমাজকে। কবি আক্ষেপ করে বলেছেন, যদি মানুষ এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে কলম ধরতো, তবে হয়তো এক নতুন ইতিহাস তৈরি হতো। কিন্তু মানুষের সেই অক্ষমতাকে বালিশের কাছে গোপন কান্নার সাথে তুলনা করা হয়েছে (‘বালিশ যদি নালিশ করে গোপন অত্যাচারে’)।
সাংস্কৃতিক দাসত্ব ও বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের ইশতেহার এই কবিতায় রেশম লতা সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক অবক্ষয় এবং শিক্ষা ব্যবস্থার ধ্বংসযজ্ঞের ওপর সরাসরি আঘাত হেনেছেন। যখন কোনো সমাজে ‘বাংলা, ইতিহাস, দর্শন’ এর মতো মননশীল চর্চাকে বন্ধ করে দিয়ে ‘দুর্নীতি, খুন, ধর্ষণ’ এর মতো অপরাধকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়, তখন সমাজটি একটি মেকি উন্নতমানের শিক্ষা কর্মশালায় পরিণত হয়।
কবি এখানে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির ওপর ভিনদেশী অপসংস্কৃতির (যেমন: ‘বঙ্গের হিন্দি নাইচ’) আগ্রাসনকে তীব্র উপহাস করেছেন। চাটুকার ‘উল্লুকের দল’ যখন ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে ঘুমিয়ে থাকে, কবি তখন তাদের জাগিয়ে তোলার জন্য ডাক দেন:
“ওরে উল্লুকের দল আয়, আন্দা হইয়া না ঘুমাইয়া / ল এক্কান কপতে লিখি।”
এখানে ‘কপতে’ বা কবিতা লেখা কেবল কোনো ছন্দ মেলানোর খেলা নয়; এটি হলো চেতনার ঘুম ভাঙানোর এবং কলমের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের এক বৈপ্লবিক ইশতেহার।
রেশম লতাকে বাংলা সাহিত্যে কেন ‘নতুন ধারা’র প্রবক্তা বলা হয়, তা তাঁর কাব্যশৈলী বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট বোঝা যায়।
কথ্য ও আঞ্চলিক ভাষার বৈপ্লবিক উপযোগিতা: বাংলা কবিতায় আঞ্চলিক ভাষা এর আগে মূলত হাস্যরস কিংবা গ্রামীণ আবহ তৈরিতে ব্যবহৃত হতো। কিন্তু রেশম লতা ‘হান্দায়া’, ‘পিন্দায়া’, ‘বেত্তমিজ’, ‘এক্কান’, ‘কপতে’, ‘লাহান’ এর মতো খাঁটি লোকজ শব্দগুলোকে প্রতিবাদের এক একটি ধারালো বুলেটে রূপান্তরিত করেছেন
পাবলিক স্যাটায়ার বা সামাজিক শ্লেষ: তিনি সরাসরি শ্লোগান না দিয়ে কবিতার ভেতর রূপক, উপহাস ও শ্লেষের এমন এক জাল বোনেন, যা পাঠকের মগজে গিয়ে সরাসরি আঘাত করে। তাঁর ব্যঙ্গ এতটাই ধারালো যে তা সমাজ ও রাষ্ট্রের ভন্ডামিকে এক নিমেষে নগ্ন করে দেয়।
অ্যাকাডেমিক মনন ও দ্রোহের সমীকরণ: একজন এম.ফিল গবেষক এবং বাংলা সাহিত্যের শিক্ষক হওয়ার কারণে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বা মৈমনসিংহ গীতিকার সমাজবাস্তবতা ও লোকায়ত জীবনের দর্শন তিনি ধারণ করেছেন। আর সেই প্রাতিষ্ঠানিক প্রজ্ঞাকেই তিনি তাঁর কবিতায় বৈপ্লবিক রূপ দিয়েছেন।
পরিশেষে বলা যায়, রেশম লতা কেবল একজন নিছক কবি বা গবেষক নন, তিনি তাঁর সময়ের এক সাহসী ঐতিহাসিক দলিল লেখক তাঁর জীবন ও সৃষ্টি একে অপরের পরিপূরক। প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার গভীর আলোয় আলোকিত হয়েও তিনি ভুলে যাননি তাঁর শেকড়ের মাটিকে, ভুলে যাননি শোষিত মানুষের ভাষাকে। ‘নেয়ামত’ থেকে ‘ল এক্কান কপতে লিখি’—প্রতিটি সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি বাংলা কবিতায় যে নতুন ধারা ও বিপ্লবী ভাবনার জন্ম দিয়েছেন, তা সমকালীন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তাঁকে এক অনন্য, অপরিহার্য ও দীর্ঘস্থায়ী আসন দান করেছে।

Ads small one

ঋশিল্পীতে বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবস উদযাপন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:৪৮ অপরাহ্ণ
ঋশিল্পীতে বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবস উদযাপন

নিজস্ব প্রতিনিধি: “হৃদরোগ ও স্ট্রোক প্রতিরোধ, ব্যবস্থাপনা এবং পুনর্বাসনে ফিজিক্যাল থেরাপির ভূমিকা”Ñএই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে সাতক্ষীরায় ঋশিল্পীর স্বাস্থ্য ও পুনর্বাসন কর্মসূচির উদ্যোগে উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবস-২০২৬ উদযাপিত হয়েছে।

মঙ্গলবার রিহ্যাবিলিটেশন হেলথ বিল্ডিংয়ের প্রশিক্ষণ কক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ঋশিল্পীর প্রেসিডেন্ট মনিকা তোজি। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন ঋশিল্পী ইন্টারন্যাশনালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ খালেদ, প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর সেলিমুল ইসলাম, সিনিয়র ফিজিওথেরাপিস্ট ও হেড অব ফিজিওথেরাপি ইউনিট শংকর কুমার ঢালীসহ বিভিন্ন কর্মসূচির কর্মকর্তা-কর্মচারী, ফিজিওথেরাপিস্ট ও স্বাস্থ্যকর্মীরা।

আলোচনায় বক্তারা ঋশিল্পীর ফিজিওথেরাপি কার্যক্রমের প্রশংসা করেন এবং হৃদরোগ ও স্ট্রোক প্রতিরোধে নিয়মিত শারীরিক কর্মকা-, ব্যায়াম ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি হৃদরোগ ও স্ট্রোকে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা-পরবর্তী পুনর্বাসন, চলাফেরার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং স্বনির্ভর জীবনে ফিরে আসার ক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তুলে ধরা হয়। আলোচনা শেষে মানুষের স্বাস্থ্য, শারীরিক সক্ষমতা ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ঋশিল্পীর স্বাস্থ্য ও পুনর্বাসন কর্মসূচির কার্যক্রম আরও সম্প্রসারিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।

 

কলারোয়ায় ১০০ কিলোমিটার সড়কে তালবীজ রোপণের উদ্যোগ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:৪৫ অপরাহ্ণ
কলারোয়ায় ১০০ কিলোমিটার সড়কে তালবীজ রোপণের উদ্যোগ

শেখ জিল্লু, কলারোয়া: বজ্রপাত প্রতিরোধ, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সবুজ ও বাসযোগ্য পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে সাতক্ষীরার কলারোয়ায় ১০০ কিলোমিটার সড়কজুড়ে তালবীজ রোপণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কলারোয়ার যুগিখালি গ্রামের তরুণ সিভিল প্রকৌশলী আসিফ ইকবাল চয়ন সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে স্থানীয় তরুণ ও স্বেচ্ছাসেবীদের সহযোগিতায় ২০২৪ সাল থেকে এ কর্মসূচি পরিচালনা করে আসছেন।

২০২৪ ও ২০২৫ সালে উপজেলার যুগিখালী ইউনিয়নের প্রায় ১৪ কিলোমিটার সড়কের দুই পাশে তালবীজ রোপণ করা হয়। এর মধ্যে রোপণ করা বীজের প্রায় ৭০ শতাংশ থেকে চারা গজিয়েছে। এ সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে এবার পুরো উপজেলায় বৃহৎ পরিসরে কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ছয় বছরের মধ্যে কলারোয়া উপজেলার বিভিন্ন প্রধান ও আঞ্চলিক সড়কের প্রায় ১০০ কিলোমিটারজুড়ে পর্যায়ক্রমে তালবীজ রোপণ করা হবে। ইতিমধ্যে জয়নগর, সোনাবাড়িয়া, কুশোডাঙ্গা ও দেয়াড়া ইউনিয়নের বিভিন্ন সড়কে তালবীজ রোপণ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে।

উচ্চ ভবনে বজ্রপাতের ক্ষতি কমাতে যেমন লাইটনিং অ্যারেস্টার ব্যবহার করা হয়, তেমনি গ্রামীণ এলাকায় প্রাকৃতিকভাবে তালগাছের বিস্তার ঘটিয়ে বজ্রপাতের ক্ষতিকর প্রভাব কমানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। প্রতিবছর বজ্রপাতে মানুষ ও গবাদিপশুর প্রাণহানি ঘটে। দীর্ঘমেয়াদে তালগাছের একটি প্রাকৃতিক বলয় গড়ে তুলে জীবনের ঝুঁকি কমানোই এ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।
এ উদ্যোগে স্থানীয় বাসিন্দা, প্রবাসী এবং বিভিন্ন এলাকার গ্রামবাসী স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া দিচ্ছেন। অনেকেই বিনামূল্যে হাজার হাজার তালবীজ দিয়ে সহযোগিতা করছেন। প্রতিদিনের কর্মসূচিতে স্থানীয় ভ্যানচালক, শ্রমজীবী মানুষ ও বিপুলসংখ্যক তরুণ স্বেচ্ছাশ্রমে অংশ নিচ্ছেন।

মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) তরুণ প্রকৌশলী আসিফ ইকবাল বলেন, তরুণ সমাজকে মাদক ও নানা নেতিবাচক কর্মকা- থেকে দূরে রেখে সামাজিক ও পরিবেশবান্ধব কাজে সম্পৃক্ত করাও তাঁর এ উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য। ব্যক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এগিয়ে এলে কলারোয়ায় একটি সবুজ জনপদ গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

কলারোয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফুল ইসলাম এ উদ্যোগকে প্রশংসনীয় সামাজিক কর্মকা- হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় সূত্রে বিষয়টি তাঁর নজরে আসে। উদ্যোগটি শুরুর আগেই আসিফ ইকবাল উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে অবহিত করেছিলেন এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের কল্যাণমূলক উদ্যোগে উপজেলা প্রশাসন ভবিষ্যতেও পাশে থাকবে বলে জানান তিনি।

ব্যক্তিগত অর্থায়ন, স্বেচ্ছাশ্রম এবং তরুণদের অংশগ্রহণে দীর্ঘমেয়াদি এ উদ্যোগ স্থানীয়ভাবে প্রশংসিত হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করছেন, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে কলারোয়ার সড়কগুলো সবুজে আচ্ছাদিত হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও বজ্রপাতের ঝুঁকি মোকাবিলায় তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

অনলাইন জুয়ায় বাড়ছে দাম্পত্য কলহ ও সামাজিক অপরাধ!

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:৪২ অপরাহ্ণ
অনলাইন জুয়ায় বাড়ছে দাম্পত্য কলহ ও সামাজিক অপরাধ!

এম শফিকুল ইসলাম: সর্বনাশা মোবাইল ফোনভিত্তিক অনলাইন জুয়ার বিস্তার ঘটেছে সাতক্ষীরার গ্রাম থেকে শহরাঞ্চলে। এই ভয়াবহ অনলাইন জুয়ার থাবায় তরুণ-তরুণীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে।

সাতক্ষীরা সীমান্ত আদর্শ কলেজের অধ্যক্ষ আজিজুর রহমান বলেন, মোবাইল ফোনের পর্দায় কয়েকটি ক্লিকের মাধ্যমেই বড় অঙ্কের টাকা জেতার প্রলোভন দেখানো হয়। দ্রুত ধনী হওয়ার এই ফাঁদে পা দিয়ে তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে নানা পেশার মানুষ নিঃস্ব হচ্ছেন। চক্রের এজেন্টরা রাতারাতি কোটিপতি বনে গেলেও সাধারণ মানুষ সর্বস্ব হারাচ্ছেন।

শাঁখড়া কোমরপুর আব্দুল গনি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আহমেদ শরীফ ইকবাল উল্লেখ করেন, অনলাইন জুয়াকে কেন্দ্র করে সাতক্ষীরায় একটি সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন সময়ে ছোটখাটো এজেন্টরা গ্রেপ্তার হলেও মূল পরিকল্পনাকারীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান। ফলে এজেন্ট পরিবর্তন হলেও অনলাইন জুয়ার দৌরাত্ম্য থামছে না। জুয়ায় হেরে সহায়-সম্পদ বিক্রি করেও অনেকে ঘুরে দাঁড়াতে পারছেন না। এতে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি পরিবারে অশান্তি, দাম্পত্য কলহ ও বিচ্ছেদ বাড়ছে। একই সঙ্গে জড়াচ্ছে নানা সামাজিক অপরাধে।

ভোমরা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ইসরাইল গাজী বলেন, অনলাইন জুয়ায় নিঃস্ব হচ্ছে বহু তরুণ ও যুবক। শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে জমজমাট জুয়া খেলা চলছে। ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও বেকার যুবকেরা এ নেশায় ঝুঁকছেন। জুয়ার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে অনেকে অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছেন এবং মানসিক চাপে ভুগছেন।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের জুন মাসে সাতক্ষীরা জেলা পুলিশের বিশেষ অভিযানে জুয়াড়ি চক্রের ১০ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে মামলা করা হয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে সদর থানা ও আশপাশের এলাকায় অভিযান চালিয়ে একাধিক মাস্টার এজেন্ট আটক করা হয়। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ১১ অক্টোবর মেহেরপুর জেলার শিবপুর গ্রামের জিনারুল ইসলামের ছেলে মুর্শিদ আলম (২৫) ও বামনডাঙ্গা গ্রামের মাসুদুল আলমের ছেলে মুসাই আলমকে সাতক্ষীরা থেকে আটক করে পুলিশ।

একই বছরের ২৯ অক্টোবর সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার খাজরা এলাকায় অভিযান চালিয়ে আতিয়ার সরদারের ছেলে ও মাস্টার এজেন্ট তৈয়ব হাসান (২৭) এবং আজিজুল সানার ছেলে তারেকুজ্জামান জুয়েলকে আটক করা হয়। এ ছাড়া শ্যামনগর, আশাশুনি, দেবহাটা ও তালা থানা এলাকা থেকে ১০ জন জুয়াড়িকে আটক এবং তাঁদের কাছ থেকে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়। জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) বিশেষ অভিযানেও অনলাইন জুয়াড়ি চক্রের মাস্টারমাইন্ড এজেন্টসহ দুই সদস্য আটক হয়েছেন।

সাতক্ষীরা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেন, অনলাইন জুয়ার বিষয়ে কঠোর নজরদারি চালানো হচ্ছে। বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যেকোনো স্থান থেকে তথ্য পেলে তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।