ন্যাশনাল ডেস্ক: জলবায়ু উদ্বাস্তু ও অসহায় মানুষের সহায়তার নামে প্রস্তাবিত সমাজসেবা অধিদপ্তরের ‘ইন্টিগ্রেট’ শীর্ষক বিতর্কিত প্রকল্পটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বর্তমান সরকার। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে প্রস্তাবিত প্রকল্পে মাত্র ৮ কোটি টাকা সহায়তা বিতরণের বিপরীতে ৫৩ কোটি টাকা প্রশাসনিক ও পরামর্শক ব্যয়ের অস্বাভাবিক প্রস্তাব নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায়ও এ প্রকল্পের অস্বাভাবিক ব্যয় কাঠামো নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন তুলে বাতিলের পক্ষে মতামত দেওয়া হয়। এর আগে রোববার (০৫ জুলাই) একটি জাতীয় পত্রিকায় ‘৮ কোটি টাকা বিতরণে খরচ ৫৩ কোটি!’ শিরোনামে সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিভিন্ন মহলে সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
বৃহস্পতিবার (০৯ জুলাই) এ বিষয়ে জানতে চাইলে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন পুতুল বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া ওই প্রকল্পটি বাতিল করা হয়েছে।’ জার্মান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জিআইজেড) অর্থায়নে বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ৬১ কোটি টাকার প্রস্তাবিত প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠায় সমাজসেবা অধিদপ্তর। পরে প্রকল্পটি যাচাইবাছাই করে গত ৫ জুলাই প্রকল্পটির ওপর মূল্যায়ন কমিটির সভা (পিইসি) অনুষ্ঠিত হয়। আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগের সদস্যের (সচিব) সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভার নোটিশ জারি করা হয় চলতি বছরের ২৪ জুন। সভায় পরিকল্পনা কমিশন ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের নগর একীভূতকরণ সক্ষমতা শক্তিশালীকরণ এবং স্বাগতিক সম্প্রদায়কে সহায়তা প্রদান (ইন্টিগ্রেট) প্রস্তাবিত প্রকল্পের বিভিন্ন খাতে অপ্রয়োজনীয় এবং অস্বাভাবিক ব্যয় নির্ধারণ নিয়ে নানা প্রশ্ন তোলা হয়। প্রকল্পের ব্যয় কাঠামো এবং উপকারভোগী বাছাইয়ের অস্বচ্ছতা নিয়েও ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। বিশেষ করে প্রকল্পের আওতায় অত্যধিক পরামর্শ নিয়োগ ও ব্যয় এবং বিদেশ ভ্রমণসহ অন্যান্য খাতের ব্যয়কে অস্বাভাবিক ও অগ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করে অনুমোদন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
পিইসি সভার আগে একই দিন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বাতিলের বিষয়ে আলোচনা হয়। যার প্রতিফলন ঘটে পরিকল্পনা কমিশনের পিইসি সভায়। মন্ত্রণালয়ে আপত্তি এবং প্রকল্পের ব্যয় কাঠামোসহ নানা অসংগতি থাকায় শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটি বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
পিইসি সভায় বাতিলের সিদ্ধান্ত হলেও আনুষ্ঠানিক রেজল্যুশন বা কার্যবিবরণী চূড়ান্ত হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, এ ধরনের ব্যয় কাঠামো অনুমোদনের সুযোগ নেই। এমনকি সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকেও প্রকল্পটি বাতিলের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
সভায় উপস্থিত এক কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য খরচের চেয়ে আনুষঙ্গিক খাতে ব্যয় কয়েকগুণ বেশি হওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ছাড়া প্রকল্পের সময়সীমা বা টাইমিং নিয়েও সভায় গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে। যদিও দাপ্তরিক রেজল্যুশন বা কার্যবিবরণী এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে এ প্রকল্পটি অনুমোদনের সুযোগ কম।’ প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়, প্রস্তাবিত এ প্রকল্পের মোট বাজেট ধরা হয়েছিল ৬১ কোটি ২৯ লাখ ৬৪ হাজার টাকা।
যার লক্ষ্য খুলনা, সাতক্ষীরা, রাজশাহী ও সিরাজগঞ্জের ৩০০ জন অসহায় মানুষকে ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য অনুদান দেওয়া। তবে এ বাজেটের মধ্যে প্রকৃত অভাবী মানুষের হাতে অনুদান হিসেবে পৌঁছানোর কথা ছিল মাত্র ৮ কোটি ১০ লাখ ৯০ হাজার টাকা, যা মোট বাজেটের মাত্র ১৩ দশমিক ২৩ শতাংশ। বাকি ৫৩ কোটি ১৮ লাখ ৭৪ হাজার টাকা রাখা হয়েছিল কর্মকর্তাদের ব্যবস্থাপনা খরচ, অফিস ভাড়া, বিদেশ ভ্রমণ ও পরামর্শকদের পেছনে।
প্রকল্পের নথিপত্র বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, মাত্র ৩০০ জন দরিদ্র মানুষের জন্য পরামর্শ দেশি-বিদেশি পরামর্শকদের পেছনে ব্যয় ধরা হয় ২৯ কোটি ৬২ লাখ টাকা। এ ছাড়া ব্যবস্থাপনা চার্জ ও অফিস ভাড়া বাবদ প্রায় ১৩ কোটি ২৭ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণে ৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা এবং অভ্যন্তরীণ ভ্রমণে ১ কোটি ২৭ লাখ ৭৬ হাজার টাকা বরাদ্দেরও প্রস্তাব করা হয়েছে।