আলোর কারিগর : ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
আখলাকুর রহমান
যে মানুষ চব্বিশ ঘণ্টায় বশ মানিয়েছিলেন প্রমত্তা ঝিলাম নদীকে, নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে তাঁকেই হার মানতে হলো একটা ট্রেনের হুইসেলের কাছে, যা তাঁর বধির কান কোনোদিন শুনতেই পায়নি। সাতক্ষীরার বাবুলিয়া বাজারের কুমোরপাড়া পেরোলেই আজও দাঁড়িয়ে আছে সেই মানুষটির স্মৃতিচিহ্ন, জয়মনি শ্রীনাথ মাধ্যমিক বিদ্যালয়। ইটের পাঁজর বেরিয়ে পড়া দেয়ালগুলোর দিকে তাকালে আজ একে নিছক পুরনো একটা স্কুলবাড়ি বলেই মনে হয়, অথচ এর প্রতিটি কোণে মিশে আছে এক মহৎপ্রাণ মানুষের নিঃসঙ্গ দীর্ঘশ্বাস। আমরা আজ ক জনই বা চিনি সেই মানুষটিকে, যিনি নিজের সঞ্চিত সম্পদ ঢেলে দিয়েছিলেন এই জনপদের অবহেলিত সন্তানদের হাতে আলোর মশাল তুলে দিতে? সময়ের নিষ্ঠুর গ্রোতে সাতক্ষীরার বুক থেকেই আজ হারিয়ে যেতে বসেছে আমাদের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান, ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়।
১৮৪৭ সালে বাবুলিয়ার এক সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারে জন্ম নিয়েছিলেন এই মানুষটি। কিন্তু তিনি ছিলেন কেবল নামেই জমিদার নন, হৃদয়ের বিচারে ছিলেন এক প্রকৃত মহাজন। কর্মজীবনে তিনি ছিলেন এমন এক অসম্ভবকে সম্ভব করা কারিগর, যাঁর মেধার কাছে হার মেনেছিল প্রকৃতির রুদ্ররূপও। ভারত ও পাকিস্তানের বুক চিরে বয়ে চলা প্রমত্তা ঝিলাম নদীর ওপর যখন একটি ব্রিজ নির্মাণ জরুরি হয়ে পড়েছিল, তখন পাহাড়ি ঢল আর উত্তাল গ্রোতের সামনে নতিস্বীকার করেছিলেন বাঘা বাঘা প্রকৌশলীও। অথচ সবাইকে চমকে দিয়ে, প্রকৃতির সেই ভয়াল রূপকে টেক্কা দিয়ে মাত্র চব্বিশ ঘণ্টায় সেই অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখিয়েছিলেন সাতক্ষীরার এই কৃতী সন্তান। তাঁর এই অবিশ্বাস্য মেধা আর অসামান্য কীর্তির স্বীকৃতিস্বরূপ ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ভূষিত করেছিল রাও সাহেব উপাধিতে।
অথচ ইতিহাসের কী নির্মম পরিহাস। যিনি অন্যের চলার পথ মসৃণ করতে নিজের জীবন উজাড় করে দিয়েছিলেন, তাঁর নিজের শেষ জীবনের পথটাই হয়ে উঠেছিল ভীষণ কণ্টকাকীর্ণ। মা বাবার স্মৃতিরক্ষার্থে গড়ে তোলা জয়মনি শ্রীনাথ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছিল তাঁর প্রাণের চেয়েও প্রিয়। একদিন এই স্কুলেই ক্লাস নেওয়ার সময় তাঁর কাছে খবর আসে, তাঁর বড় ছেলে আর এই পৃথিবীতে নেই। বুকভাঙা সেই আর্তনাদ ভেতরে চেপে রেখে, ছলছল চোখে তিনি সামনে বসে থাকা ছাত্রদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, আজ আমার একটা ছেলে চলে গেছে তো কী হয়েছে, এই যে আমার সামনে শত শত ছেলে বসে আছে, তোমরাই তো আমার সন্তান। এমন হৃদয়ের ঔদার্য ক জন মানুষের মধ্যে দেখা যায়?
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এই মহৎ মানুষটি কানে প্রায় কিছুই শুনতে পেতেন না। ১৯১৬ সালের এক অভিশপ্ত দিনে কলকাতার উখড়া স্টেশনে ট্রেনের অপেক্ষায় দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। পেছন থেকে ধেয়ে আসছিল একটি দ্রুতগামী ট্রেন। চারপাশের মানুষ আতঙ্কে চিৎকার করে বলছিল, রাও সাহেব থামুন, সরুন। কিন্তু প্রকৃতির নির্মম পরিহাসে সেই বধির কানে পৌঁছায়নি কোনো সতর্কবার্তা। ট্রেনের সেই মরণঘাতী ধাক্কায় গুরুতর আহত হয়ে কলকাতার সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। অবশেষে ১৯১৬ সালের ১৭ই মার্চ হাসপাতালের চার দেয়ালের মাঝে চিরতরে নিভে যায় এই প্রদীপ্ত প্রাণ।
ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় ছিলেন এক জাদুকরি কর্মবীর, যাঁর দূরদৃষ্টি আর মানবিকতা সাতক্ষীরার প্রত্যন্ত জনপদে পৌঁছে দিয়েছিল শিক্ষার আলো। অথচ আজ আমাদের নতুন প্রজন্ম হয়তো তাঁর নামটাই ঠিকমতো উচ্চারণ করতে পারে না। আমাদের ঘরের কাছের এই মহামানবকে কি আমরা উপযুক্ত সম্মান দিতে পেরেছি? স্থানীয় পত্রিকার পাতায় আজ এই প্রশ্ন তোলার সময় এসেছে, যিনি আমাদের গর্ব, তাঁকে কি আমরা হৃদয়ে জায়গা দিতে পেরেছি, নাকি বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যেতে দিচ্ছি নিজেদেরই এক সোনালী ইতিহাসকে?











