মানুষ: সহমর্মিতার সংকটে মানবিক সমাজে অগ্রসর হই
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় কী? তার অর্থ-বিত্ত, শিক্ষা, পেশা, সামাজিক মর্যাদা কিংবা ক্ষমতা? নাকি তার প্রকৃত পরিচয় লুকিয়ে আছে অন্য মানুষের প্রতি তার আচরণে, দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতায় এবং মানবিক মূল্যবোধে? সভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাস বলে, মানুষকে মানুষ করেছে তার সহমর্মিতা। একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর শক্তিই মানুষকে প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে শিখিয়েছে। কিন্তু আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, তীব্র প্রতিযোগিতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রার কারণে সেই মানবিক বন্ধন অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।
আমরা ক্রমেই দর্শক হয়ে উঠছি; কিন্তু প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠার পথ যেন কঠিন হয়ে যাচ্ছে। একজন মানুষ যখন হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়, তখন সমাজের প্রকৃত চেহারা প্রকাশ পায়। কেউ দূরে দাঁড়িয়ে দেখে, কেউ মন্তব্য করে, কেউ সমালোচনা করে, কেউবা উপহাস করে। আবার কেউ এগিয়ে আসে, হাত ধরে দাঁড় করায়, ধুলো ঝেড়ে দেয় এবং বলেÑ”ভয় পেও না, আমি আছি; আবার শুরু করো।” এই শেষ মানুষটিই প্রকৃত অর্থে মানবিক।কারণ অন্যের ব্যর্থতা নিয়ে কথা বলা সহজ, কিন্তু তার কষ্ট অনুভব করা কঠিন। ভুল খুঁজে বের করা সহজ, কিন্তু ভুলের পেছনের কারণ বোঝার চেষ্টা করা কঠিন। একজন মানুষকে বিচার করা সহজ, কিন্তু তাকে পরিবর্তনের সুযোগ দেওয়া কঠিন।
আজকের সমাজে এই কঠিন কাজটিই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।বর্তমান সময়ে আমরা এমন এক সমাজব্যবস্থার মধ্যে বাস করছি, যেখানে মানুষের সাফল্যকে যতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়, তার সংগ্রামকে ততটা মূল্য দেওয়া হয় না। একজন সফল মানুষের পেছনের দীর্ঘ পথচলা, ব্যর্থতার গল্প কিংবা অসংখ্য অদৃশ্য লড়াই অনেক সময় আমাদের চোখে পড়ে না।কেউ পরীক্ষায় ভালো ফল করলে আমরা তাকে প্রশংসা করি, কিন্তু যে শিক্ষার্থী ব্যর্থ হয়ে মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যায়, তার পাশে কতজন দাঁড়াই? কেউ ব্যবসায় সফল হলে তার গল্প শুনি, কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তার কষ্ট বোঝার চেষ্টা করি কতজন?
একটি ভুলের জন্য একজন মানুষকে চিরদিনের জন্য ব্যর্থ বলে চিহ্নিত করা আমাদের সামাজিক প্রবণতা হয়ে উঠছে। অথচ ভুল মানুষের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। পৃথিবীর কোনো সফল মানুষই ভুলের বাইরে নন। বরং ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগই মানুষকে পরিণত করে। একটি শিশুর দিকে তাকালে আমরা এই সত্য সহজেই বুঝতে পারি। হাঁটতে শেখার সময় একটি শিশু বারবার পড়ে যায়। কিন্তু তাকে নিয়ে কেউ হাসে না। সবাই হাত বাড়িয়ে তাকে দাঁড় করায়।
কারণ আমরা জানি, পড়ে যাওয়া শেখারই অংশ। কিন্তু বড় হওয়ার পর সেই একই মানুষ যখন জীবনের কোনো ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়, তখন সমাজ অনেক সময় তার প্রতি কঠোর হয়ে ওঠে। এই দ্বৈত আচরণ আমাদের মানবিকতার সংকটকে প্রকাশ করে। প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা বাড়িয়েছে। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব হয়েছে।
কিন্তু এর পাশাপাশি তৈরি হয়েছে নতুন এক সংস্কৃতিÑদ্রুত বিচার করার সংস্কৃতি।কেউ কোনো ভুল করলেই মুহূর্তের মধ্যে তা ছড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় মন্তব্য, সমালোচনা ও বিদ্রƒপ। অনেকেই না জেনে, না বুঝে একজন মানুষের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।কিন্তু আমরা ভুলে যাই, একটি পর্দার ওপাশে একজন মানুষ আছেন। তার অনুভূতি আছে, আত্মসম্মান আছে, পরিবার আছে, স্বপ্ন আছে। একটি কঠোর মন্তব্য হয়তো একজনের কাছে সামান্য বিষয় মনে হতে পারে, কিন্তু যার উদ্দেশে বলা হয়, তার মনে তা গভীর ক্ষত তৈরি করতে পারে।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের অনেক সময় বাস্তব মানবিকতা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। আমরা একজন মানুষের কষ্টকে অনুভব করার বদলে সেটিকে একটি ঘটনা হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি।
দুর্ঘটনাস্থলে সাহায্যের হাত বাড়ানোর আগে ভিডিও ধারণ করা, বিপদে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বদলে ছবি তুলে প্রচার করাÑএসব আচরণ আমাদের ভাবিয়ে তোলে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি মানুষের কষ্টকে সাহায্যের সুযোগ হিসেবে দেখছি, নাকি দর্শকের বিনোদন হিসেবে?মানবিকতার প্রথম শিক্ষা পরিবার থেকেই শুরু হয়। একটি শিশু তার বাবা-মায়ের আচরণ দেখে শেখে কীভাবে অন্য মানুষের সঙ্গে ব্যবহার করতে হয়।পরিবারে যদি সহানুভূতি, শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার পরিবেশ থাকে, তাহলে শিশুর মধ্যেও সেই মূল্যবোধ গড়ে ওঠে। কিন্তু যদি সে দেখে দুর্বলকে অপমান করা, অন্যকে ছোট করা কিংবা শুধু নিজের সাফল্যের পেছনে ছোটাÑতাহলে তার মধ্যেও একই মানসিকতা তৈরি হতে পারে। বর্তমান সময়ে সন্তানদের ওপর সাফল্যের চাপ বাড়ছে।
ভালো ফলাফল, ভালো চাকরি, সামাজিক প্রতিষ্ঠাÑএসব অর্জনের প্রতিযোগিতায় অনেক সময় তাদের মানসিক বিকাশ ও মানবিক মূল্যবোধের বিষয়টি উপেক্ষিত হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাজ শুধু পরীক্ষার ফল ভালো করা নয়; একজন ভালো মানুষ তৈরি করাও শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য। একজন শিক্ষার্থীকে শেখাতে হবেÑপ্রতিযোগিতা করবে, কিন্তু প্রতিহিংসা নয়; সফল হবে, কিন্তু অহংকারী হবে না; নিজের জন্য এগোবে, কিন্তু অন্যকে পিছনে ফেলে নয়। সহমর্মিতা মানে অন্যায়কে সমর্থন করা নয়। এর অর্থ হলো একজন মানুষের পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করা এবং তাকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া। একজন হতাশ মানুষের প্রয়োজন সব সময় বড় কোনো সমাধান নয়; অনেক সময় একটি আন্তরিক বাক্যই তার জীবনে নতুন শক্তি এনে দিতে পারে।
“আমি তোমার পাশে আছি”Ñএই কথাটি কখনো কখনো একজন মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্বাস হয়ে ওঠে। আমাদের সমাজে এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষ বিপদের সময় অসাধারণ মানবিকতার পরিচয় দিয়েছেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দুর্ঘটনা, অসুস্থতা কিংবা সংকটের সময় মানুষ একে অপরের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এগুলো প্রমাণ করে, মানবিকতা এখনো আমাদের সমাজের শক্তি। শুধু এটিকে আরও বিস্তৃত করতে হবে।একটি মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে রাষ্ট্র, গণমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক দায়িত্ববোধকে গুরুত্ব দিতে হবে।
গণমাধ্যমকে মানুষের মর্যাদা রক্ষা করে সংবাদ পরিবেশন করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। মনে রাখতে হবে, স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি অন্যের সম্মান রক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ। তরুণ প্রজন্মকে মানবিক কাজে সম্পৃক্ত করা জরুরি। রক্তদান, স্বেচ্ছাসেবা, দুর্যোগে সহায়তা কিংবা অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মতো উদ্যোগগুলো একটি সহমর্মী সমাজ গড়ে তুলতে পারে। জীবনের কোনো এক সময় প্রত্যেক মানুষই দুর্বল হয়ে পড়ে। আজ যে শক্ত অবস্থানে আছে, কাল তারও সাহায্যের প্রয়োজন হতে পারে। তাই অন্যের প্রতি আমাদের আচরণ হওয়া উচিত সেই আচরণ, যা আমরা নিজের জন্য প্রত্যাশা করি।
দর্শক হওয়া সহজ। কারণ সেখানে কোনো দায়িত্ব নেই, কোনো ত্যাগ নেই। কিন্তু মানুষ হওয়ার জন্য দরকার সাহসÑঅন্যের কষ্ট অনুভব করার সাহস, পাশে দাঁড়ানোর সাহস এবং একটি হাত বাড়িয়ে দেওয়ার সাহস।পৃথিবী মনে রাখে না কে কতবার অন্যের ভুল ধরেছে। পৃথিবী মনে রাখে কারা অন্ধকার সময়ে আলো জ্বালিয়েছে। তাই আসুন, আমরা শুধু দর্শক না হয়ে মানুষ হওয়ার চেষ্টা করি। অন্যের পতনে হাসি নয়, তার উঠে দাঁড়ানোর শক্তি হই। সমালোচনার আগে বোঝার চেষ্টা করি। কারণ একটি সুন্দর সমাজ গড়ে ওঠে বড় বড় কথায় নয়; গড়ে ওঠে মানুষের ছোট ছোট মানবিক আচরণে।শেষ পর্যন্ত মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়Ñসে কতটা সফল তা নয়, সে কতটা মানবিক। কারণ সবাই দর্শক হতে পারে, কিন্তু সবাই মানুষ হতে পারে না।
লেখক: সংবাদকর্মী











