শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩
শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩

দেবহাটায় সোনালু বাগান উদ্বোধন করলেন ডিসি কাউসার আজিজ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:২০ অপরাহ্ণ
দেবহাটায় সোনালু বাগান উদ্বোধন করলেন ডিসি কাউসার আজিজ

সংবাদদাতা: সাতক্ষীরার দেবহাটায় ‘৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ’ কর্মসূচির আওতায় উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বৃক্ষরোপণ’ কর্মসূচির আওতায় সোনালু বাগান সৃজন কার্যক্রমের উদ্বোধন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) উপজেলার কোমরপুর এলাকায় আয়োজিত এ কর্মসূচিতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মিজ কাউসার আজিজ।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা এবং সবুজায়ন সম্প্রসারণে বেশি বেশি গাছ লাগানোর ওপর জোর দিতে হবে।
তিনি জানান, জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এ বছর সাতক্ষীরার প্রতিটি উপজেলায় একটি করে বিশেষ বাগান সৃজন করা হচ্ছে। দেবহাটার পারুলিয়ায় সোনালু গাছের বাগান করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে দৃষ্টিনন্দন ভ্রমণস্থলে পরিণত হতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

আলোচনা সভায় দেবহাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিলন সাহার পরিচালনায় বক্তব্য দেন দেবহাটা উপজেলা বিএনপির সাবেক আহবায়ক মহিউদ্দিন সিদ্দিকী, পারুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান গোলাম ফারুক বাবু।

এসময় উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মঈনুল ইসলাম মঈন, দেবহাটা উপজেলার সহকরী কমিশনার (ভূমি) চৌধুরী আল মাহামুদ, দেবহাটা উপজেলা কৃষি অফিসার শওকত ওসমান, দেবহাটা থানার ওসি এইচএম শাহিন, দেবহাটা উপজেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা অলিউল ইসলাম, ইউপি সদস্য ফরহাদ হোসেন হিরা, ইউপি সদস্য আব্দুর আলিমসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গ।

এদিকে বৃক্ষ রোপণ শেষে আলোচনা সভায় আলোচনা রাখেন জেলা প্রশাসক। এছাড়া কোমরপুর কুমড়াখালি খালের উপর আয়রন ব্রীজ পরিদর্শন করেন।

Ads small one

মন্ত্রী আসছেন সাতক্ষীরায়: চাই বঞ্চনার অবসান

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:১৪ অপরাহ্ণ
মন্ত্রী আসছেন সাতক্ষীরায়: চাই বঞ্চনার অবসান

এম. এম হায়দার আলী

দেশের একবারে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা সাতক্ষীরা, সম্ভাবনার এক বিশাল জনপদ। সুন্দরবনের কোলঘেঁষা এই জেলা দেশের অর্থনীতি, কৃষি, মৎস্য, সীমান্ত বাণিজ্য ও পর্যটনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। অথচ দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নের প্রশ্নে সাতক্ষীরার মানুষ যেন বার-বারই থেকেছেন উপেক্ষিত। প্রতিশ্রুতি এসেছে, আশ্বাস এসেছে, প্রকল্পের কথা শোনা গেছে,কিন্তু কাক্সিক্ষত উন্নয়ন অনেক ক্ষেত্রেই অধরাই থেকে গেছে। এবার সেই বঞ্চনার বৃত্ত ভাঙার প্রত্যাশা জেগেছে সাতক্ষীরাবাসীর মনে।

আগামী ১৩ সেপ্টেম্বর আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী জনাব মোঃ আসাদুজ্জামান মহোদয়ের সাতক্ষীরা সফরকে ঘিরে তাই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। শুধু আনুষ্ঠানিক সফর নয়,সাতক্ষীরার বাস্তব সমস্যা, মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি এবং উন্নয়নের সম্ভাবনাকে সামনে রেখে একটি কার্যকর রোডম্যাপ তৈরি হবে,এমন প্রত্যাশাই এখন জনমনে। এদিন

সকাল ৯টায় সাতক্ষীরা জেলা জজ আদালতের সম্মেলনকক্ষে জেলা পর্যায়ের বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন মন্ত্রী। এরপর সকাল ১০টায় জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে জেলার সংসদ সদস্য, সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসক, বিজিবির সিও, র‌্যাবের সিও, পুলিশ সুপার, বিভিন্ন দপ্তরের প্রধান, জেলা পরিষদ প্রশাসক, পৌর প্রশাসক, সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ, আইনজীবী সমিতির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক, জিপি-পিপি, প্রেসক্লাবের সভাপতি, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন তিনি। আর বিকেল ৩টায় বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্য, সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য, জেলা ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় যোগ দেবেন মন্ত্রী।

 

এই তিনটি পর্বের মতবিনিময়কে নিছক সৌজন্য সাক্ষাৎ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। সাতক্ষীরার উন্নয়নের জন্য এসব মতবিনিময় হতে পারে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্ল্যাটফর্ম। কারণ উন্নয়ন শুধু রাস্তা-ঘাট নির্মাণের নাম নয়; উন্নয়ন মানে মানুষের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, যোগাযোগ, বন্দর, নদী-খাল, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং সর্বোপরি মানুষের জীবনমানের পরিবর্তন। প্রশ্ন হলো,সাতক্ষীরা এত সম্ভাবনাময় হয়েও পিছিয়ে থাকবে কেন ?

সীমান্তবর্তী জেলা হিসেবে সাতক্ষীরার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ভোমরা স্থলবন্দর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্র। সুন্দরবনকে ঘিরে রয়েছে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা। কৃষি ও মৎস্য খাতেও সাতক্ষীরার অবদান কম নয়। চিংড়ি ও কাঁকড়া রপ্তানি, সবজি উৎপাদন, কৃষিপণ্য, মৎস্য সম্পদ,সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক ভাবে সাতক্ষীরা একটি সম্ভাবনাময় জেলা। কিন্তু অবকাঠামোগত দুর্বলতা, যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা, জলাবদ্ধতা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি এবং শিল্প-কারখানার অপ্রতুলতা সেই সম্ভাবনার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

সাতক্ষীরার মানুষ উন্নয়নের গল্প শুনতে, শুনতে ক্লান্ত। তারা এবার বাস্তব উন্নয়ন দেখতে চান। তারা চান, সড়ক হবে, সেতু হবে, নদী-খাল বাঁচবে, জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান হবে, কৃষক ন্যায্য দাম পাবেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নত হবে, হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা বাড়বে, তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। সবচেয়ে বড় কথা, সাতক্ষীরাকে আর ‘অবহেলিত জেলা’ হিসেবে দেখতে চান না এখানকার মানুষ।

মন্ত্রী যদি সত্যিই সাতক্ষীরার মানুষের কথা শুনতে চান, তাহলে মতবিনিময় সভাগুলোতে শুধু বক্তব্যের ফুলঝুরি নয়,মানুষের বাস্তব অভিযোগ ও দীর্ঘদিনের দাবিগুলোও শুনতে হবে। কোন প্রকল্প আটকে আছে, কোথায় বরাদ্দের অভাবে কাজ থেমে আছে, কোন সড়ক বছরের পর বছর সংস্কার হয়নি, কোন নদী দখল-দূষণে মৃতপ্রায়, কোন এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা ভেঙে পড়েছে, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।

রাজনীতিরও একটি বড় দায়িত্ব আছে। দল-মত নির্বিশেষে সাতক্ষীরার উন্নয়নের প্রশ্নে সবাইকে এক টেবিলে বসতে হবে। উন্নয়ন কোনো একক দলের সম্পত্তি নয়। আজ যে রাস্তা নির্মিত হবে, সেটি শুধু একটি দলের মানুষ ব্যবহার করবেন না, হাসপাতাল, সেতু, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা কর্মসংস্থানের সুযোগও দল দেখে মানুষের কাছে পৌঁছাবে না। তাই সাতক্ষীরার স্বার্থে রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে একটি অভিন্ন উন্নয়ন দাবি তৈরি করা সময়ের প্রয়োজন।

 

বর্তমান বিএনপি সরকারের মন্ত্রী মহোদয়কে সাতক্ষীরাবাসীর পক্ষ থেকে প্রাণঢালা অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি একটি কথাই বলা দরকার, আমরা প্রতিশ্রুতি নয়, দৃশ্যমান পরিবর্তন চাই। মতবিনিময় সভা শেষে যেন ফাইলের স্তূপে মানুষের দাবিগুলো চাপা পড়ে না যায়। সভায় উত্থাপিত দাবিগুলোর অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে সময়সীমাবদ্ধ বাস্তবায়ন পরিকল্পনা প্রয়োজন। কোন কাজ কখন শুরু হবে, কোন কাজ কতদিনে শেষ হবে,তার একটি সুস্পষ্ট কর্ম-পরিকল্পনা থাকা দরকার।

সাতক্ষীরার মানুষ উন্নয়ন চায়, কিন্তু সেই উন্নয়ন হতে হবে টেকসই। এমন উন্নয়ন নয়, বর্ষা এলেই যে রাস্তা ভেঙে যাবে; এমন বাঁধ নয়, সামান্য জলোচ্ছ্বাসেই যে মানুষকে সর্বস্বান্ত করবে; এমন প্রকল্প নয়, যার সুফল জনগণের বদলে কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে। সাতক্ষীরা দীর্ঘকাল ধরে পিছিয়ে আছে, এ কথা শুধু অভিযোগ হিসেবে উচ্চারণ করলেই হবে না। কেন পিছিয়ে আছে, কারা দায়ী, কোথায় প্রশাসনিক দুর্বলতা, কোথায় পরিকল্পনার ঘাটতি এবং কোথায় বাস্তবায়নের ব্যর্থতা, সেসবও খুঁজে বের করতে হবে। ১৩ সেপ্টেম্বরের সফর তাই সাতক্ষীরার জন্য একটি সুযোগ। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে পারলে জেলার উন্নয়ন-ভাবনায় নতুন গতি আসতে পারে।

 

তাইতো সাতক্ষীরাবাসী এখন তাকিয়ে আছেন মন্ত্রীর দিকে। তারা আশা করছেন,আইন ও বিচার অঙ্গনের দায়িত্বের পাশাপাশি সাতক্ষীরার উন্নয়ন-সম্ভাবনাকেও তিনি গুরুত্বের সঙ্গে দেখবেন। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে অবহেলিত এই জনপদকে উন্নয়নের মূল গ্রোতে ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন। সাতক্ষীরা আর পেছনে পড়ে থাকতে চায় না।

 

ভোমরা বন্দর থেকে সুন্দরবন, কৃষকের মাঠ থেকে মৎস্যঘের, শহরের সড়ক থেকে প্রত্যন্ত গ্রামের জনপদ, সবখানেই উন্নয়নের ছোঁয়া পৌঁছাতে হবে। মানুষের চোখে-মুখে ফুটিয়ে তুলতে হবে পরিবর্তনের স্বপ্ন। সময় এসেছে সাতক্ষীরার বঞ্চনার হিসাব চুকিয়ে দেওয়ার। এবার চাই উন্নয়নের জোয়ার, থায় নয়, কাজে।

সাতক্ষীরাবাসীর প্রত্যাশা, মন্ত্রীর ১৩ সেপ্টেম্বরের সফর যেন সেই নতুন যাত্রার সূচনা করে। একই সাথে অবহেলা, বৈষম্য ও উন্নয়ন-ঘাটতির পুরোনো অধ্যায় পেছনে ফেলে সাতক্ষীরা এগিয়ে যাক সমৃদ্ধি, নিরাপত্তা ও সম্ভাবনার পথে,এই হোক আমাদের এবারের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

জীবনের অভিধানে ‘প’-এর কারসাজি!

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:০৭ অপরাহ্ণ
জীবনের অভিধানে ‘প’-এর কারসাজি!

গাজী হাবিব

জীবনে যত ঝামেলা, যত প্যাঁচ, যত প্যারা- সবকিছুর শুরুতেই যেন এক রহস্যময় অক্ষর বিস্ময়করভাবে ধরা পড়েচে! সেই অক্ষরটি হলো ‘প’। অবশ্য বাংলা বর্ণমালার ‘প’-এর কোনো দোষ নেই। সে তো নিরীহ একটি বর্ণ। কিন্তু মানুষের জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, ‘প’ দিয়ে শুরু হওয়া অনেক শব্দই জীবনে কখনো সুখ, কখনো দুঃখ, আবার কখনো মহাবিপদ ডেকে আনে। তাই মজা করে বলা যায়- ‘সব নষ্টের গোড়া হলো প!’
চলুন, ‘প’-এর প্যাঁচে জীবনের কয়েকটি পরিচিত অধ্যায় ঘুরে আসি।

পথ
প্রতিটি মানুষের জীবনে একটি পথ থাকে। কারও পথ শিক্ষার, কারও কর্মের, কারও ব্যবসার, কারও সেবার, আবার কারও পথ স্বপ্ন পূরণের। পথ কখনো আগে থেকে তৈরি থাকে না। অনেক সময় চলতে চলতেই মানুষ নিজের পথ খুঁজে নেয়। ছোটবেলায় যে স্বপ্ন দেখা হয়, বড় হতে হতে সেই স্বপ্নের রং বদলে যায়। মানুষ নতুন বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত হয়, নিজের সক্ষমতা বুঝতে শেখে এবং একসময় উপলব্ধি করেÑগন্তব্যের চেয়েও পথের অভিজ্ঞতা অনেক মূল্যবান। কিছু পথ আমাদের ধৈর্য শেখায়, কিছু পথ সাহস শেখায়, কিছু পথ মানুষ চিনতে শেখায়। আবার কিছু কঠিন পথ আমাদের নিজের শক্তির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।

প্রত্যয়
পথ খুঁজে পাওয়া গেলেই হয় না। সেই পথে হাঁটার জন্য দরকার প্রত্যয়। প্রত্যয় হলো নিজের ওপর বিশ্বাস। চারপাশের মানুষ যখন বলে, ‘তুমি পারবে না’, তখন ভেতর থেকে একটি কণ্ঠ যখন বলে-‘আমি চেষ্টা করব’- সেই কণ্ঠই প্রত্যয়। প্রত্যয় মানে অহংকার নয়। প্রত্যয় মানে নিজের সীমাবদ্ধতা জানা, ভুল থেকে শেখা এবং তারপরও এগিয়ে যাওয়ার সাহস রাখা। অনেকে প্রতিভাবান হয়েও ব্যর্থ হয়, কারণ তারা নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে পারে না। আবার অনেক সাধারণ মানুষ অসাধারণ হয়ে ওঠে শুধু এক কারণে- তারা হাল ছাড়ে না।

প্রচেষ্টা
স্বপ্ন দেখা সহজ। পরিকল্পনা করাও সহজ। কিন্তু স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য যে নিয়মিত কাজ করতে হয়, তার নাম প্রচেষ্টা। একজন শিক্ষার্থী ভালো ফল করতে চায়- এটি তার স্বপ্ন। ব্যবসায়ী সফল হতে চান- তাকে পরিশ্রম করতে হবে। খেলোয়াড় ভালো করতে চান-তাকে অনুশীলন করতে হবে। লেখক ভালো লিখতে চান- তাকে নিয়মিত লিখতে হবে। সাংবাদিক ভালো প্রতিবেদন করতে চান- তাকে পড়তে, জানতে, অনুসন্ধান করতে হবে। শুধু ইচ্ছা কখনো সাফল্য এনে দেয় না। ইচ্ছা পথ দেখায়, কিন্তু প্রচেষ্টা সেই পথে এগিয়ে নেয়।

প্রগতি
প্রত্যেক মানুষ একদিনে সফল হয় না। সফলতা আসলে ছোট ছোট অগ্রগতির সমষ্টি। সেই অগ্রগতির নাম প্রগতি। প্রগতি মানে সবসময় বড় কোনো অর্জন নয়। গতকালের চেয়ে আজ একটু ভালো হওয়াও প্রগতি। গতকাল যে বিষয়টি বুঝতে পারেননি, আজ সেটি বুঝতে পারাও প্রগতি। আগের ভুলটি আজ আর না করাও প্রগতি। গতকাল যেখানে ভয় পেয়েছিলেন, আজ সেখানে সাহস করে দাঁড়ানোও প্রগতি। আমরা অনেক সময় অন্যের সাফল্যের সঙ্গে নিজের জীবনকে তুলনা করি। তখন মনে হয়, অন্যরা অনেক এগিয়ে গেছে, আর আমি পিছিয়ে আছি।

প্ল্যানস
জীবনে প্ল্যান থাকতে হয়। কোথায় যাব, কী করব, কীভাবে ভবিষ্যৎ গড়ব- এসব নিয়ে পরিকল্পনা করা ভালো। কিন্তু শুধু প্ল্যান করলেই হবে না, সেটি বাস্তবায়নের কাজও করতে হবে। কারণ পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি অপূর্ণ জিনিসগুলোর একটি হলো- ‘দারুণ একটা প্ল্যান ছিল!’

পড়াশোনা
ছাত্রজীবনের সবচেয়ে বড় ‘প’- পড়াশোনা। কেউ পড়াশোনাকে ভালোবাসে, কেউ ভয় পায়, আবার কেউ পরীক্ষার আগের রাতে বই খুলে মনে করে- আজ থেকেই জীবন বদলে যাবে! আসলে পড়াশোনা শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য নয়; জ্ঞান, চিন্তা ও ভবিষ্যৎ গড়ার জন্যও জরুরি। তবে পড়াশোনাকে নিয়ে অতিরিক্ত চাপও ভালো নয়। নিয়মিত চেষ্টা আর ধৈর্যই আসল।

পরিশ্রম
সাফল্যের সঙ্গে ‘পরিশ্রম’-এর সম্পর্ক অনেক পুরোনো। ভাগ্য দরজায় কড়া নাড়তে পারে, কিন্তু দরজা খুলে দিতে হয় নিজের পরিশ্রমে। জীবনে শর্টকাটের সন্ধান করতে গিয়ে অনেকেই সময় হারায়। অথচ নিয়মিত পরিশ্রম ধীরে হলেও মানুষকে সামনে এগিয়ে দেয়।

পরীক্ষা
‘পরীক্ষা’ শব্দটি শুনলেই অনেকের বুক ধড়ফড় শুরু হয়। বই খুললে অনেকের ঘুম আসে, কিন্তু পরীক্ষা শেষ হলে মনে হয়- আরেকটু পড়লেই ভালো হতো! পরীক্ষা আসলে শুধু জ্ঞান যাচাইয়ের মাধ্যম নয়; এটি প্রস্তুতি, সময় ব্যবস্থাপনা ও মানসিক দৃঢ়তারও পরীক্ষা। তাই পরীক্ষাকে ভয় না পেয়ে প্রস্তুত হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

প্যারা
জীবনের সবচেয়ে পরিচিত শব্দগুলোর একটি- প্যারা। কখনো পড়াশোনার প্যারা, কখনো পরিবার, কখনো বন্ধু, কখনো টাকা-পয়সা, আবার কখনো নিজের চিন্তাই নিজের সবচেয়ে বড় প্যারা হয়ে দাঁড়ায়। তবে সব প্যারা খারাপ নয়। কিছু প্যারা মানুষকে দায়িত্বশীল করে, কিছু প্যারা মানুষকে বাস্তবতা শেখায়। আসল বিষয় হলো-প্যারার মধ্যে পড়ে যেন মানুষ নিজেকে হারিয়ে না ফেলে।

পয়সা
জীবনে পয়সা দরকার। পয়সা ছাড়া সংসার চলে না, পড়াশোনা চলে না, স্বপ্নও অনেক সময় বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়। কিন্তু পয়সা যখন প্রয়োজনের বদলে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, তখন মানুষ সম্পর্ক, নীতি ও বিবেকের মূল্য ভুলে যেতে পারে। অর্থাৎ পয়সা প্রয়োজনীয়- কিন্তু পয়সার পেছনে ছুটতে গিয়ে যেন মানুষ নিজেকেই হারিয়ে না ফেলে।

পকেটখালি
মাসের শুরুতে পকেট ভারী, মাঝামাঝি স্বাভাবিক, আর মাসের শেষে-পকেট যেন বাতাসে ভরা! পকেট খালি হলে তখন বোঝা যায়, ছোট ছোট খরচগুলো কত বড় হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই আয় যতই হোক, হিসাব করে চলার অভ্যাস থাকাটা জরুরি।

প্যাঁচ
কিছু মানুষ যেখানে সহজ রাস্তা আছে, সেখানেও প্যাঁচ খুঁজে বের করেন। সম্পর্কের প্যাঁচ, কথার প্যাঁচ, রাজনীতির প্যাঁচ, অফিসের প্যাঁচÑজীবন যেন প্যাঁচেরই আরেক নাম। তবে সব প্যাঁচ অন্যের তৈরি নয়। অনেক সময় আমরা নিজেরাই অপ্রয়োজনীয় চিন্তা করে সহজ বিষয়কে কঠিন বানিয়ে ফেলি।

প্রেশার
জীবনে প্রেশার থাকবেই। পড়াশোনার প্রেশার, কাজের প্রেশার, পরিবারের প্রত্যাশা- সব মিলিয়ে কখনো কখনো মনে হয়, জীবনটাই যেন একটা প্রেসার কুকার! তবে সব চাপ একা বহন করার দরকার নেই। প্রয়োজন হলে পরিবারের সদস্য, শিক্ষক বা বিশ্বস্ত কারও সঙ্গে কথা বলা উচিত। নিজের সামর্থ্য বুঝে এগিয়ে যাওয়াও জরুরি।

পেইন
‘পেইন’ মানে কষ্ট। জীবনে কষ্ট থাকবে- এটাই বাস্তবতা। কখনো সম্পর্কের কষ্ট, কখনো ব্যর্থতার কষ্ট, কখনো প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ার কষ্ট। তবে প্রতিটি কষ্টই মানুষকে কিছু না কিছু শেখায়। তাই পেইনকে শুধু দুর্ভাগ্য না ভেবে জীবনের শিক্ষক হিসেবেও দেখা যায়।

পাগলামি
জীবনে একটু পাগলামি না থাকলে জীবনও যেন পানসে। বন্ধুদের সঙ্গে হঠাৎ ঘুরতে যাওয়া, নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করা কিংবা নিজের স্বপ্নের পেছনে ছুটে চলা- এসবও এক ধরনের ভালো পাগলামি। তবে পাগলামি আর বেপরোয়া আচরণের মধ্যে পার্থক্য আছে। আনন্দ করতে গিয়ে নিজের বা অন্যের ক্ষতি করা কখনোই বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

প্রেম
জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অনুভূতিগুলোর একটি প্রেম। কিন্তু প্রেম যখন সুন্দর সম্পর্কের বদলে অতিরিক্ত আবেগ, ভুল সিদ্ধান্ত কিংবা অযথা প্রত্যাশার বোঝা হয়ে যায়, তখন শুরু হয় প্যারা। ঘুম কমে যায়, মন খারাপ বাড়ে, মোবাইলের দিকে তাকিয়ে থাকার সময় বাড়ে। ফলে প্রেম কখনো জীবনকে সুন্দর করে, আবার কখনো জীবনকে ‘প্যারা’ করে তোলে!

পরকীয়া
প্রেমের পরের ধাপ যদি হয় ‘পরকীয়া’, তাহলে ‘প্যারা’ অনেক গুণ বেড়ে যায়। একটি ভুল সিদ্ধান্ত শুধু একজনের নয়, একাধিক মানুষের জীবনকে অশান্ত করে তুলতে পারে। বিশ্বাস ভাঙে, সম্পর্ক নষ্ট হয়, পরিবারে অশান্তি তৈরি হয়। তাই পরকীয়ার শুরু যতটা গোপন, তার পরিণতি অনেক সময় ততটাই প্রকাশ্য।

প্রতারণা
প্রতারণা শুধু টাকা-পয়সার ক্ষেত্রে হয় না। মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, ভুয়া আশ্বাস কিংবা বিশ্বাসের সুযোগ নেওয়াও প্রতারণা। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় তখনই, যখন মানুষ শুধু টাকা নয়- কারও বিশ্বাসও হারিয়ে ফেলে। টাকা হারালে আবার উপার্জন করা যায়, কিন্তু হারানো বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা অনেক কঠিন।

পত্রিকা
পত্রিকা হলো এমন একটি গণমাধ্যম, যেখানে নির্দিষ্ট সময় পরপর দেশ-বিদেশের সংবাদ, সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, খেলাধুলা, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, মতামত ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশিত হয়। সাধারণত দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক বা মাসিক ভিত্তিতে পত্রিকা প্রকাশিত হয়ে থাকে। মানুষের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য পৌঁছে দেওয়া, জনমত গঠন করা এবং সমাজের বিভিন্ন অসঙ্গতি তুলে ধরা পত্রিকার অন্যতম প্রধান কাজ। সহজভাবে বলা যায়- পত্রিকা হলো সমাজ ও রাষ্ট্রের দর্পণ।

পেটের সমস্যা
মানুষের অনেক বড় বড় স্বপ্ন থাকে, কিন্তু পেটের সমস্যা হলে সেই স্বপ্ন কিছুক্ষণের জন্য স্থগিত! সুস্থ শরীর ছাড়া ভালোভাবে পড়াশোনা, কাজ কিংবা আনন্দ- কিছুই ঠিকমতো করা যায় না। তাই স্বাস্থ্যকর খাবার, পর্যাপ্ত পানি, ঘুম ও নিয়মিত জীবনযাপনকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

পাদ্য
‘পাদ্য’ শব্দটি শুনলেই অনেকে হাসতে শুরু করেন। কিন্তু জীবনের কিছু বিষয় এমনই- যেগুলো নিয়ে হাসাহাসি করা সহজ, অথচ বাস্তবতা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। শরীরের স্বাভাবিক বিষয়গুলো নিয়ে অযথা লজ্জা বা কুসংস্কার না রেখে স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে সচেতন হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
তাহলে কি সত্যিই সব নষ্টের গোড়া ‘প’? না, মোটেও নয়। ‘প’ দিয়ে যেমন প্রেম, পড়াশোনা, পরিশ্রম, পরিকল্পনা শুরু হয়, তেমনি প্যারা, প্রতারণা, পরকীয়া-ও শুরু হয়। অর্থাৎ ভালো-মন্দ দুটোই মানুষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। একই ‘প’ কারও জীবনে প্রেম হয়ে আসে, কারও জীবনে প্যারা। কেউ পড়াশোনা করে ভবিষ্যৎ গড়ে, কেউ আবার পাগলামি করে সময় নষ্ট করে। কেউ পরিশ্রম করে সফল হয়, কেউ পয়সার পেছনে ছুটতে গিয়ে সম্পর্ক হারায়।

তাই আসল সমস্যা ‘প’-এ নয়- সমস্যা আমাদের পছন্দে। জীবনে ‘প’ অনেক আসবে। প্রেম আসবে, প্যারা আসবে, পরীক্ষা আসবে, প্রেশার আসবে।
কখনো পকেট খালি হবে, কখনো পরিকল্পনা ব্যর্থ হবে। তবুও জীবন থেমে থাকবে না। কারণ ‘প’ দিয়েই তো পথ, প্রত্যয়, প্রচেষ্টা, প্রগতি এবং শেষ পর্যন্ত পূর্ণতা-ও শুরু হয়!

বিশ্ব ডলফিন দিবস: নীল পৃথিবীর বুদ্ধিমান জলজ প্রহরীদের আহ্বান

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:৫৮ অপরাহ্ণ
বিশ্ব ডলফিন দিবস: নীল পৃথিবীর বুদ্ধিমান জলজ প্রহরীদের আহ্বান

সাকিবুর রহমান বাবলা

১২ সেপ্টেম্বর বিশ্ব ডলফিন দিবস। পৃথিবীর অন্যতম বুদ্ধিমান, সামাজিক ও সংবেদনশীল প্রাণী ডলফিনের সংরক্ষণ, তাদের পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরা এবং মানবসৃষ্ট বিভিন্ন হুমকির বিরুদ্ধে বিশ্বজনমত গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে দিবসটি পালিত হয়। ১২ সেপ্টেম্বরের বিশ্ব ডলফিন দিবসের পেছনে রয়েছে এক বেদনাদায়ক ইতিহাস। ২০২১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ডেনমার্কের অধীনস্থ ফারো দ্বীপপুঞ্জে ঐতিহ্যবাহী ‘গ্রিন্ড’ শিকারের নামে একদিনে ১,৪২৮টি আটলান্টিক হোয়াইট-সাইডেড ডলফিন হত্যা করা হয়। এটিকে ইতিহাসের বৃহত্তম একক ডলফিন হত্যাকা- হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই ঘটনার প্রতিবাদ এবং বিশ্বব্যাপী ডলফিন সংরক্ষণের দাবি জোরদার করতে সামুদ্রিক সংরক্ষণ সংস্থা ‘সি শেফার্ড গ্লোবাল’ ২০২২ সালে এ দিবসের সূচনা করে।

ডলফিন মাছ নয়, তারা স্তন্যপায়ী প্রাণী। মানুষের মতোই তারা ফুসফুসের মাধ্যমে বাতাসে শ্বাস নেয়, জীবন্ত বাচ্চা জন্ম দেয় এবং শাবকদের দুধ পান করিয়ে লালন-পালন করে। পৃথিবীতে প্রায় ৪০টির কাছাকাছি ডলফিন প্রজাতি রয়েছে, যার মধ্যে অধিকাংশই সামুদ্রিক। ডেলফিনিডি পরিবারভুক্ত এসব প্রাণীর মধ্যে বোতলনোজ ডলফিন, স্পিনার ডলফিন, কমন ডলফিন এবং ওড়কা বা কিলার হোয়েল বিশেষভাবে পরিচিত। অনেকেই অবাক হন জেনে যে কিলার হোয়েল আসলে তিমি নয়, বরং ডলফিন পরিবারের সবচেয়ে বড় সদস্য। প্রাকৃতিক পরিবেশে এদের গড় আয়ু ৩০ থেকে ৫০ বছর পর্যন্ত।

বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই ডলফিনকে প্রাণিজগতের অন্যতম বুদ্ধিমান প্রাণী হিসেবে বিবেচনা করে আসছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিটি ডলফিনের নিজস্ব স্বতন্ত্র শিসধ্বনি রয়েছে, যা অনেকটা মানুষের নামের মতো কাজ করে। কোনো ডলফিন তার নিজস্ব শিসধ্বনি শুনলে সাড়া দেয়। সামাজিক সম্পর্ক, শিকার এবং দলগত যোগাযোগে এই ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ডলফিন সাধারণত ‘পড’ নামে পরিচিত দলে বসবাস করে। একটি পডে কয়েকটি থেকে শুরু করে শত শত, কখনও কখনও হাজার হাজার ডলফিনও থাকতে পারে। আহত বা অসুস্থ সদস্যকে সহায়তা করা, সন্তান জন্মের সময় সহযোগিতা করা এবং দলবদ্ধভাবে শিকার করা তাদের উন্নত সামাজিক আচরণের প্রমাণ বহন করে।

ডলফিন শুধু আকর্ষণীয় প্রাণী নয়; তারা জলজ বাস্তুতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নদীর ডলফিনকে বিজ্ঞানীরা ‘কিস্টোন স্পিসিজ’ এবং ‘বায়ো-ইন্ডিকেটর’ হিসেবে বিবেচনা করেন। অর্থাৎ, কোনো নদী বা সমুদ্রে ডলফিনের উপস্থিতি সেই পরিবেশের সুস্থতার অন্যতম সূচক। খাদ্যশৃঙ্খলের শীর্ষ পর্যায়ের শিকারি হিসেবে তারা মাছ ও স্কুইডের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। ডলফিন না থাকলে কিছু প্রজাতির মাছ অতিরিক্ত বৃদ্ধি পেয়ে পুরো খাদ্যশৃঙ্খলে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে, যাকে বিজ্ঞানীরা ‘ট্রফিক ক্যাসকেড’ বলে অভিহিত করেন।

সাম্প্রতিক গবেষণায় ডলফিনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা উঠে এসেছে। তারা গভীর সমুদ্র থেকে খাদ্য গ্রহণ করে উপরের স্তরে মলত্যাগ করে, যা ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনের জন্য পুষ্টি হিসেবে কাজ করে। ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন পৃথিবীর মোট অক্সিজেন উৎপাদনের একটি বড় অংশে অবদান রাখে এবং বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। ফলে ডলফিন সংরক্ষণ কেবল জীববৈচিত্র্যের বিষয় নয়; এটি জলবায়ু সুরক্ষার সঙ্গেও সম্পর্কিত।

তবুও আজ বিশ্বের বিভিন্ন প্রজাতির ডলফিন মারাত্মক হুমকির মুখে। প্লাস্টিক দূষণ, শিল্পবর্জ্য, রাসায়নিক দূষণ, তেল দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন, নৌযানের শব্দদূষণ, নদীতে বাঁধ নির্মাণ এবং মাছ ধরার জালে আটকা পড়াÑসব মিলিয়ে তাদের অস্তিত্ব সংকুচিত হচ্ছে। বিশেষ করে ‘বাইক্যাচ’ বা অনিচ্ছাকৃতভাবে মাছ ধরার জালে আটকা পড়ে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক ডলফিন মারা যায়। অনেক ক্ষেত্রে ডলফিনের প্রজনন ক্ষেত্র এবং চলাচলের পথও মানবিক কর্মকা-ের কারণে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

পরিবেশ দূষণের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের একটি বড় উদাহরণ হলো ২০১০ সালের ডিপওয়াটার হরাইজন তেল দুর্ঘটনা। মেক্সিকো উপসাগরে প্রায় ১৩৪ মিলিয়ন গ্যালন অপরিশোধিত তেল ছড়িয়ে পড়ার ১৫ বছর পরও লুইজিয়ানার বারাটারিয়া উপসাগরের বটলনোজ ডলফিনদের মধ্যে ফুসফুসের রোগ, উচ্চ মৃত্যুহার, প্রজনন ব্যর্থতা এবং শারীরিক দুর্বলতার প্রভাব দেখা যাচ্ছে।আইইউসিএন, এনওএএ বা ডাব্লিউডাব্লিউএফ গবেষকদের মতে, পরিবেশগত বিপর্যয়ের ক্ষতি কখনও কখনও কয়েক প্রজন্ম পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন অঞ্চলের গোলাপি নদী ডলফিনও আরেকটি উদ্বেগজনক সংকটের মুখে রয়েছে। বর্তমানে প্রাকৃতিক পরিবেশে এদের সংখ্যা ১০ হাজারেরও কম বলে ধারণা করা হয়। অবৈধ শিকার, মাছ ধরার জাল এবং তথাকথিত ‘পুসাঙ্গা’ নামের প্রেমের ওষুধ তৈরিতে ডলফিনের তেল ও দেহাংশ ব্যবহারের কুসংস্কার এই বিরল প্রাণীটির অস্তিত্বকে আরও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

বাংলাদেশও ডলফিন সংরক্ষণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ। সুন্দরবন অঞ্চলে গাঙ্গেয় শুশুক ও ইরাবতী ডলফিনের আবাসস্থল রক্ষায় ধানমারী, চাঁদপাই এবং দুধমুখী ডলফিন অভয়ারণ্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বন অধিদপ্তর ও ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটি-এর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এসব অভয়ারণ্য দেশের জলজ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে নদী দূষণ, নৌযানের চাপ এবং জালে আটকে পড়ার ঘটনা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

ডলফিন রক্ষা মানে শুধু একটি প্রাণীকে রক্ষা করা নয়; বরং সমুদ্র, নদী, মৎস্যসম্পদ, জলবায়ু এবং মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত রাখা। পৃথিবীর এই বুদ্ধিমান প্রহরীরা সৃষ্টি থেকেই জলজ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে আসছে। তাদের অস্তিত্ব বিপন্ন হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো বাস্তুতন্ত্র, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবন ও অর্থনীতির ওপরও পড়বে। তাই দূষণ নিয়ন্ত্রণ, টেকসই মৎস্যব্যবস্থা, সংরক্ষিত এলাকা সম্প্রসারণ, বৈজ্ঞানিক গবেষণা বৃদ্ধি এবং জনসচেতনতা জোরদার করার মধ্য দিয়েই ডলফিনের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব। আজ বিশ্ব ডলফিন দিবসে এটাই হোক আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার।