যাচিত জীবন: স্বপ্ন, মানবিকতা ও প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
মানুষের জীবনে কিছু চাওয়া প্রকাশ্য, কিছু একান্ত ব্যক্তিগত। কিছু স্বপ্ন মানুষ অন্যের কাছে প্রকাশ করে, আবার কিছু স্বপ্ন মনের গভীরে লুকিয়ে রাখে। সেই স্বপ্ন, প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষার সমষ্টিতেই গড়ে ওঠে মানুষের যাচিত জীবনের ধারণা। মানুষ যে জীবন পেতে চায়, নিজের ইচ্ছা, অনুভূতি ও বিশ্বাস দিয়ে যেভাবে জীবন সাজাতে চায়, সেটিই তার যাচিত জীবন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মানুষ কি কখনো সত্যিকার অর্থে তার কাঙ্ক্ষিত জীবন পায়?
জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষের পথচলা মূলত চাওয়া ও পাওয়ার এক নিরন্তর হিসাব। শৈশবে থাকে ছোট ছোট আবদার, কৈশোরে স্বপ্নের বিস্তার, আর যৌবনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার আকাঙ্ক্ষা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চাওয়ার ধরনও বদলে যায়। একসময় যে মানুষ অনেক বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখত, পরিণত বয়সে সে হয়তো একটু শান্তি, নির্ভরতা ও আপনজনের সান্নিধ্য চায়। অথচ জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে বাস্তবতা তার সামনে নতুন নতুন শর্ত হাজির করে।
যাচিত জীবন বলতে শুধু অর্থবিত্ত, ক্ষমতা কিংবা সামাজিক প্রতিষ্ঠা বোঝায় না। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আত্মমর্যাদা, ভালোবাসা, স্বাধীনতা, মানসিক প্রশান্তি এবং নিজের মতো করে বেঁচে থাকার অধিকার। কারও কাছে একটি সুন্দর পরিবারই কাঙ্ক্ষিত জীবন, কারও কাছে সৎভাবে জীবিকা নির্বাহ করে সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকা। কেউ চান মানুষের ভালোবাসা, কেউ চান নিঃসঙ্গতার মধ্যে নিজের মতো করে সময় কাটাতে। প্রত্যেকের চাওয়া আলাদা হলেও প্রত্যাশার কেন্দ্রে থাকে একটু ভালো থাকার আকাঙ্ক্ষা।
দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, মানুষের ইচ্ছা আর জীবনের বাস্তবতা সব সময় একই পথে চলে না। পরিবার, সমাজ, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও নানা দায়িত্বের কারণে মানুষকে অনেক সময় নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কখনো পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিতে হয়, কখনো সামাজিক সম্পর্ক রক্ষা করতে গিয়ে মনের কথা চেপে রাখতে হয়। আবার কখনো জীবিকার তাগিদে এমন পথে হাঁটতে হয়, যে পথে যাওয়ার স্বপ্ন কোনো দিনই ছিল না।
এভাবেই মানুষ ধীরে ধীরে নিজের কাঙ্ক্ষিত জীবন থেকে দূরে সরে যায়। বাইরে থেকে তাকে সফল মনে হলেও ভেতরে জমে থাকে অপূর্ণতার দীর্ঘশ্বাস। তার অর্জন, পরিচিতি ও সামাজিক অবস্থান আছে; কিন্তু কোথাও যেন নিজের সঙ্গে নিজের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। এই দূরত্বের কথা সবাই বুঝতে পারে না। কারণ মানুষের বাহ্যিক হাসি সব সময় তার মনের সুখের পরিচয় বহন করে না।
আমাদের সমাজে জীবনের সাফল্যকে প্রায়ই অর্থ, সম্পদ, পদ-পদবি ও সামাজিক মর্যাদার মাপকাঠিতে বিচার করা হয়। অথচ একজন মানুষ কতটা মানসিক শান্তিতে আছেন, নিজের সিদ্ধান্তে কতটা সন্তুষ্ট এবং তাঁর সম্পর্কগুলো কতটা আন্তরিক—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অর্থ দিয়ে প্রয়োজন মেটানো যায়, কিন্তু সব অভাব পূরণ করা যায় না। সামাজিক পরিচিতি পাওয়া যায়, কিন্তু শুধু পরিচয়ের জোরে আন্তরিক ভালোবাসা অর্জন করা যায় না। তাই যাচিত জীবনের সঙ্গে বস্তুগত প্রাপ্তির পাশাপাশি মানসিক তৃপ্তির সম্পর্ক গভীর।
জীবনের একটি পর্যায়ে এসে মানুষ পেছন ফিরে তাকায়। মনে পড়ে শৈশবের দিন, পুরোনো বন্ধুত্ব, হারিয়ে যাওয়া মানুষ, অসমাপ্ত স্বপ্ন আর না-বলা কথাগুলো। তখন মনে হয়, কত কিছু চেয়েছিলাম, কত কিছু করার পরিকল্পনা ছিল। সময়ের অভাবে, পরিস্থিতির চাপে কিংবা নিজের সিদ্ধান্তের কারণে অনেক কিছুই আর হয়ে ওঠেনি। যে সময়টুকু একদিন নিজের জন্য তুলে রাখার কথা ভেবেছিলাম, সেই সময়ও কখন যে পার হয়ে গেছে, তা বোঝা যায়নি।
তবে অপ্রাপ্তিই জীবনের একমাত্র সত্য নয়। মানুষ যা পেয়েছে, তার মূল্যও উপলব্ধি করা প্রয়োজন। একটি সুস্থ সম্পর্ক, পরিবারের মানুষের ভালোবাসা, বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানো একজন বন্ধু কিংবা নিজের শ্রমে অর্জিত সামান্য সাফল্য—এসবও জীবনের বড় সম্পদ। অনেক সময় আমরা যা পাইনি, তার জন্য এত বেশি আক্ষেপ করি যে যা পেয়েছি, তার আনন্দটুকুও উপভোগ করতে ভুলে যাই।
জীবনে বড় হওয়ার চেয়ে ভালো মানুষ হওয়া অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অর্থ, সম্পদ কিংবা সামাজিক প্রতিষ্ঠা একসময় মানুষের পরিচয় তৈরি করতে পারে, কিন্তু মানুষের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায় তার আচরণে, মানবিকতায় এবং অন্যের প্রতি দায়িত্ববোধে। একজন ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে খাবার তুলে দেওয়া, অসহায় মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানো, কারও দুঃখ মন দিয়ে শোনা কিংবা বিপন্ন মানুষকে একটু সাহস দেওয়া—এসব কাজের মূল্য কোনো সম্পদের মাপকাঠিতে নির্ধারণ করা যায় না।
আমরা অনেক সময় নিজের প্রাপ্তি নিয়ে এতটাই ব্যস্ত থাকি যে পাশের মানুষটির কষ্ট দেখতে পাই না। অথচ জীবন শুধু নিজের জন্য নয়। পরিবার, সমাজ ও মানুষের প্রতি আমাদের নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে। কারও মনে কষ্ট দিয়ে, কাউকে ছোট করে কিংবা অন্যের অধিকার নষ্ট করে যে সাফল্য অর্জিত হয়, তা কখনো প্রকৃত সার্থকতা হতে পারে না। মানুষের ভালোবাসা অর্জন করতে হলে আগে মানুষকে ভালোবাসতে শিখতে হয়।
জীবনের পথে অনেক মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়। কেউ পাশে থাকে দীর্ঘদিন, কেউ আবার সময়ের ব্যবধানে দূরে চলে যায়। কিন্তু প্রতিটি সম্পর্কেরই একটি মানবিক মূল্য রয়েছে। অহংকার, অভিমান কিংবা সামান্য ভুল বোঝাবুঝির কারণে অনেক সুন্দর সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়। অথচ সময় একবার চলে গেলে সব সম্পর্ক ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় না। তাই প্রয়োজন হলে ক্ষমা করতে শেখা, নিজের ভুল স্বীকার করা এবং প্রিয়জনের প্রতি আন্তরিক হওয়া জরুরি। মনে রাখতে হবে, মানুষের জীবনে অর্থের অভাব পূরণ করা সম্ভব, কিন্তু হারিয়ে যাওয়া সময় এবং কিছু মানুষের শূন্যতা কখনো পূরণ হয় না।
যাচিত জীবন অর্জনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা কখনো কখনো আমাদের নিজেদের অতিরিক্ত প্রত্যাশা। আমরা অন্যের জীবন দেখে নিজের জীবনের সঙ্গে তুলনা করি। অন্যের সাফল্য, সুখ কিংবা প্রাপ্তি দেখে মনে করি, আমাদের জীবন বুঝি পিছিয়ে আছে। অথচ প্রত্যেক মানুষের জীবনপরিস্থিতি আলাদা। অন্যের জীবনের বাহ্যিক চাকচিক্য দেখে নিজের জীবনের মূল্য নির্ধারণ করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। নিজের সামর্থ্য, প্রয়োজন ও মূল্যবোধ অনুযায়ী জীবনকে সাজাতে পারাই প্রকৃত প্রজ্ঞা।
এ ক্ষেত্রে দায়িত্ব ও ব্যক্তিস্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য রাখাও জরুরি। পরিবার ও সমাজের প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতা রয়েছে। কিন্তু সেই দায়বদ্ধতা পালনের নামে নিজের অস্তিত্ব, আত্মসম্মান ও ব্যক্তিগত স্বপ্নকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা উচিত নয়। মানুষ অন্যের জন্য বাঁচবে, ভালোবাসবে, দায়িত্ব পালন করবে; একই সঙ্গে নিজের মনের কথাকেও গুরুত্ব দেবে। কারণ নিজের ভেতরের মানুষটিকে হারিয়ে ফেলে বাইরে যত পরিচয়ই তৈরি হোক, তাতে জীবনের পূর্ণতা আসে না।
জীবনকে সুন্দর করার জন্য সব সময় বড় কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন হয় না। কখনো নিজের পছন্দের কাজটি করার সময় বের করা, প্রিয় মানুষের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানো, পুরোনো বন্ধুর খোঁজ নেওয়া কিংবা কারও বিপদে পাশে দাঁড়ানোই মনে প্রশান্তি এনে দিতে পারে। সুখকে ভবিষ্যতের কোনো অনিশ্চিত প্রাপ্তির জন্য তুলে না রেখে বর্তমানের ছোট ছোট মুহূর্তের মধ্যেও খুঁজে নিতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, জীবন একবারই আসে। তাই শুধু আগামী দিনের প্রত্যাশায় বর্তমানকে অবহেলা করা উচিত নয়। আমরা অনেক সময় ভাবি, আরও কিছু অর্জন করতে পারলে সুখী হব, আরও কিছু সম্পদ হলে নিশ্চিন্ত হব, আরও প্রতিষ্ঠিত হলে নিজের জন্য সময় বের করব। কিন্তু আরও কিছু পাওয়ার অপেক্ষা কখনো শেষ হয় না। একসময় দেখা যায়, জীবনই ফুরিয়ে এসেছে, অথচ নিজের মতো করে বাঁচার সময়টুকু আর পাওয়া গেল না।
পরিশেষে বলা যায়, যাচিত জীবন কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য নয়; এটি মানুষের স্বপ্ন, সাধনা, মানবিকতা ও আত্মোপলব্ধির চলমান যাত্রা। সব চাওয়া পূরণ হবে না, সব স্বপ্ন বাস্তব হবে না, সব সম্পর্কও শেষ পর্যন্ত একই রকম থাকবে না। তবু জীবনকে ভালোবাসতে হবে, নিজের বিবেকের কাছে সৎ থাকতে হবে এবং প্রাপ্তির আনন্দকে স্বীকার করতে হবে।
জীবনের শেষ হিসাব যেন শুধু কতটা পেলাম, কতটা হারালাম—এতেই সীমাবদ্ধ না থাকে। বরং কতটা ভালোবাসতে পেরেছি, কতটা মানুষের উপকারে এসেছি, কতটা আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচেছি এবং নিজের জীবনকে কতটা অর্থবহ করতে পেরেছি, সেই প্রশ্নের উত্তরই হোক আমাদের জীবনের প্রকৃত মূল্যায়ন। যাচিত জীবন মানে শুধু নিজের স্বপ্ন পূরণ করা নয়; অন্যের স্বপ্নের প্রতি সম্মান দেখানো, অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো, মানুষের দুঃখ বোঝা এবং ভালোবাসা দিয়ে পৃথিবীকে একটু সুন্দর করে তোলাও। আমরা কতটা পেয়েছি, তার চেয়ে বড় হয়ে থাকুক—আমাদের কারণে কতজন মানুষ একটু ভালো থাকতে পেরেছে।
লেখক: সংবাদকর্মী









