সম্পাদকীয়/ সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধ ও তারুণ্যের জাগরণ: পুলিশ-জনতার মিলিত প্রয়াস
মাদক, অনলাইন জুয়া, বাল্যবিয়ে, ইভটিজিং এবং সড়ক অসচেতনতার মতো সামাজিক ব্যাধিগুলো আজ আমাদের সমাজজীবনে গভীর ক্ষত তৈরি করছে। এই বহুমুখী অপরাধপ্রবণতা কেবল বর্তমান প্রজন্মকেই বিপথগামী করছে না, বরং একটি সুস্থ ও মেধাভিত্তিক জাতি গঠনের পথেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এমতাবস্থায় অপরাধের বিরুদ্ধে কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একক পদক্ষেপ বা আইনি কঠোরতাই যথেষ্ট নয়; বরং এর জন্য প্রয়োজন পুলিশ ও জনগণের সম্মিলিত প্রতিরোধ এবং সামাজিক আন্দোলন। সম্প্রতি সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত কমিউনিটি পুলিশিং সমাবেশ এবং অর্ধসহস্রাধিক শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি আমাদের সেই সম্মিলিত জাগরণেরই এক আশাবাদী বার্তা শোনায়।
সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সাতক্ষীরা জেলা পুলিশ সুপার আবু সালেহ মো. আশরাফুল আলম যে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী। তিনি সঠিকভাবেই উল্লেখ করেছেন যে, অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশ ও জনগণের পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার সম্পর্ক সুদৃঢ় করা অপরিহার্য। পাশাপাশি মাদক, অনলাইন জুয়া, বাল্যবিয়ে ও ইভটিজিংসহ সব ধরনের সামাজিক অপরাধ নির্মূলে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার বিকল্প নেই। বিশেষ করে, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের তথ্য দ্রুত পুলিশকে জানানোর যে আহ্বান তিনি জানিয়েছেন, তা অপরাধ দমনে জনসচেতনতার গুরুত্বকে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়।
এ আয়োজনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ও অনুপ্রেরণাদায়ক দিকটি ছিল শিক্ষার্থীদের শপথগ্রহণ পর্ব। সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) পরিচালনায় এবং ওসির পড়ানো শপথবাক্যে শিক্ষার্থীরা মাদক থেকে দূরে থাকা, বাল্যবিয়ে ও ইভটিজিং প্রতিহত করা এবং একটি অপরাধমুক্ত সমাজ গঠনে নিজেদের জীবনকে উৎসর্গ করার দীক্ষা নিয়েছে। আজকের কোমলমতি ও তারুণ্যদীপ্ত শিক্ষার্থীরাই আগামীর ভবিষ্যৎ। তাদের নৈতিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করে অপরাধের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর এই শিক্ষা শুধু বিদ্যালয়ের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়, বরং তা ছড়িয়ে পড়তে হবে প্রতিটি পরিবার ও শিক্ষাঙ্গনে।
শুধু আইন প্রয়োগ বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে সমাজ থেকে অপরাধ পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, পারিবারিক ও ধর্মীয় অনুশাসন এবং সঠিক নৈতিক শিক্ষার প্রসার। কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মতো উদ্যোগগুলো পুলিশ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যকার ব্যবধান কমিয়ে আস্থার সেতুবন্ধ তৈরি করে। যখন সমাজের প্রতিটি মানুষ নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন হয়ে পুলিশকে তথ্য ও সহযোগিতা দিয়ে সহায়তা করবে, তখনই কেবল মাদকমুক্ত ও নিরাপদ সমাজ বিনির্মাণ সম্ভব হবে।
সাতক্ষীরার এই শিক্ষার্থী সমাবেশ ও কমিউনিটি পুলিশিংয়ের উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে আমাদের যুবসমাজ সামাজিক অপরাধের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে প্রস্তুত। এই ধরনের সচেতনতামূলক কার্যক্রম কেবল সাতক্ষীরায় নয়, বরং দেশের প্রতিটি জনপদে নিয়মিত হওয়া উচিত। তারুণ্যের শক্তিকে সঠিক পথে পরিচালনা করতে পারলে এবং পুলিশ ও জনগণের কার্যকর অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা গেলে একটি বৈষম্যহীন, নিরাপদ ও প্রগতিশীল সমাজ গড়ে তোলা মোটেও অসম্ভব নয়।












