ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নই হোক রাষ্ট্রের অঙ্গীকার
গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ
গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয়, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোয় দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তন কেবল ক্ষমতার পালাবদলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; জাতীয় ইতিহাসের উপস্থাপন, রাষ্ট্রীয় স্মৃতিচর্চা এবং মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক বয়ান নিয়েও নতুন করে আলোচনা-বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় দাপ্তরিক পরিসর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পাঠ্যপুস্তক ও জাতীয় স্মারকে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি ও নাম ব্যবহারের পরিবর্তন এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের ঘটনাবলি নতুনভাবে তুলে ধরার উদ্যোগ জাতীয় ইতিহাসের ধারাবাহিকতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে।
একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম ভিত্তি তার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জাতীয় পরিচয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা কিংবা আকস্মিক রাজনৈতিক অর্জন নয়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের ভাষা আন্দোলন, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম, স্বায়ত্তশাসনের দাবি, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ এই সংগ্রামের মধ্য দিয়েই বাঙালি জাতি স্বাধীনতার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে। সেই ঐতিহাসিক অভিযাত্রায় শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ইতিহাসের স্বীকৃত অংশ।
তবে ইতিহাসের প্রতি সুবিচার করতে হলে কোনো একজন ব্যক্তি বা একটি রাজনৈতিক দলের অবদানকে কেন্দ্র করে জাতীয় ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দাঁড় করানো যায় না। মুক্তিযুদ্ধ ছিল সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত সংগ্রাম। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বের পাশাপাশি তাজউদ্দীন আহমদের সংগঠক ও রাষ্ট্র পরিচালনায় ভূমিকা, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার ও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামসহ অসংখ্য রাজনৈতিক নেতা, সামরিক কর্মকর্তা, মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। ইতিহাসের কোনো অধ্যায়কে অতিরঞ্জিত করা যেমন অনুচিত, তেমনি কোনো অধ্যায় বা ব্যক্তির অবদান ইচ্ছাকৃতভাবে আড়াল করাও ইতিহাসের প্রতি অবিচার।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিন ধরেই ইতিহাসকে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে উপস্থাপনের প্রবণতা দেখা গেছে। অতীতের শাসনামলে রাষ্ট্রীয় পরিসরে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বয়ানকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে অনেক জাতীয় নেতার অবদান যথাযথ গুরুত্ব পায়নি—এমন অভিযোগ ও বিতর্ক রয়েছে। আবার রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এর বিপরীতমুখী প্রবণতা তৈরি হলে ইতিহাসের ভারসাম্য পুনরুদ্ধারের পরিবর্তে নতুন করে একপেশে বয়ান প্রতিষ্ঠার আশঙ্কা দেখা দেয়। অথচ ইতিহাস কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়; এটি একটি জাতির সম্মিলিত উত্তরাধিকার।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, বৈষম্য, কর্তৃত্ববাদ ও গণতান্ত্রিক অধিকার সংকুচিত হওয়ার বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিবাদ এই অভ্যুত্থানকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। নতুন প্রজন্মের আত্মত্যাগ, সাহস ও প্রত্যাশাকে রাষ্ট্রীয় ইতিহাসে যথাযথ মর্যাদা দেওয়া প্রয়োজন। তবে নতুন একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়কে স্বীকৃতি দিতে গিয়ে পুরোনো কোনো অধ্যায়ের গুরুত্ব অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানো কিংবা মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক ভিত্তিকে খাটো করা কোনোভাবেই জাতীয় স্বার্থের অনুকূল হতে পারে না।
১৯৭১ ও ২০২৪ সালের ঘটনাকে তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক, সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করতে হবে। একটির সঙ্গে অন্যটির সরল তুলনা না করে বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠন, গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা ও নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিকতায় তাদের অবস্থান নির্ধারণ করা জরুরি। ১৯৭১ আমাদের স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে, আর ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামো, জবাবদিহি ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে। এই দুই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়াই হবে দায়িত্বশীল রাষ্ট্রচিন্তার পরিচয়।
এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক, শিক্ষাবিদ, ইতিহাসবিদ, গণমাধ্যম ও বুদ্ধিজীবী সমাজের দায়িত্ব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পাঠ্যপুস্তক বা রাষ্ট্রীয় নথিতে কোনো পরিবর্তন আনতে হলে তা রাজনৈতিক আবেগ কিংবা প্রতিশোধের ভিত্তিতে নয়, বরং গবেষণা, তথ্যপ্রমাণ ও ঐতিহাসিক সত্যের আলোকে করতে হবে। জাতীয় স্মারক ও রাষ্ট্রীয় প্রতীক নিয়েও এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া উচিত নয়, যা একটি পক্ষকে সম্মানিত করতে গিয়ে অন্য পক্ষের ঐতিহাসিক অবদানকে অস্বীকার করে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব ইতিহাসের কোনো পক্ষ নেওয়া নয়; বরং ইতিহাসের সত্যকে যথাযথ মর্যাদায় সংরক্ষণ করা।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তন হবে। রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিতেও পরিবর্তন আসতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় ইতিহাসের ভিত্তি বারবার বদলে ফেলার প্রবণতা রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতার জন্য শুভ নয়। ইতিহাসকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার বানানো হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বিভ্রান্ত হবে এবং জাতীয় ঐক্যের জায়গায় অবিশ্বাসের দেয়াল আরও দীর্ঘ হবে।
বাংলাদেশের ইতিহাস কোনো একক ব্যক্তি, দল বা সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের রয়েছে নিজস্ব তাৎপর্য ও অবদান। তাই ১৯৭১ বনাম ২০২৪—এমন বিভাজন নয়; বরং ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ের সত্যনিষ্ঠ, নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নই হোক রাষ্ট্রের অঙ্গীকার।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। পত্রদূত অনলাইন এবং পত্রদূত- এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)












