প্রাচীন সভ্যতার উত্তরাধিকার ও আধুনিক ইরানের পথচলা
শেখ সিদ্দিকুর রহমান
মানব সভ্যতার উষালগ্ন থেকে যে কটি দেশ বিশ্ব ইতিহাসে গভীর ছাপ ফেলেছে, পারস্য বা বর্তমানের ইরান তাদের মধ্যে অন্যতম। কয়েক হাজার বছরের প্রাচীন এই ভূখ- কেবল একটি ভৌগোলিক সীমারেখা নয়, বরং এটি শিল্প, সাহিত্য, রাজনীতি এবং সামরিক কৌশলের এক মহাকাব্যিক সমন্বয়। খ্রিস্টপূর্ব সাড়ে পাঁচশ বছর আগে মহান কুরুশ যখন আকেমেনীয় সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, তখন থেকেই এই অঞ্চলটি বিশ্বের প্রথম সুসংগঠিত শাসনব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিতি পায়। পরবর্তীতে দরিয়ুস এবং জারক্সিসের শাসনামলে এই সাম্রাজ্য তৎকালীন বিশ্বের এক বিশাল অংশ জুড়ে বিস্তৃত হয়েছিল। যদিও বিভিন্ন সময়ে আলেকজান্ডার কিংবা আরব যোদ্ধাদের আগমনে শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু পারস্যের সংস্কৃতি কখনোই বিলীন হয়নি; বরং তা নতুন রূপে বিকশিত হয়েছে।
বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে এই ভূখ-ের নাম পরিবর্তন করে ইরান রাখা হয়। তবে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মোড় হিসেবে বিবেচিত। এই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে হাজার বছরের রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে এবং আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে একটি সম্পূর্ণ নতুন ধরনের শাসনব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়, যা ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং প্রশাসনিক কাঠামোর এক অনন্য মিশ্রণ। বর্তমানে এই ব্যবস্থার শীর্ষে রয়েছেন সর্বোচ্চ নেতা, যার অধীনে দেশ পরিচালনা করেন নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি। সাম্প্রতিক সময়ে ইব্রাহিম রাইসির আকস্মিক প্রয়াণের পর মাসুদ পেজেশকিয়ান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করে দেশটির প্রশাসনিক ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
ভৌগোলিক দিক থেকে ইরান পশ্চিম এশিয়ার এক কৌশলগত অবস্থানে অবস্থিত। দেশটির বুক চিরে বয়ে যাওয়া জাগ্রোস পর্বতমালা, বিস্তীর্ণ দাশত-এ কাবির মরুভূমি এবং দক্ষিণে পারস্য উপসাগর ও উত্তরে কাস্পিয়ান সাগর একে বৈচিত্র্যময় করে তুলেছে। এই ভূমি যেমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর, তেমনই মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা খনিজ সম্পদ একে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতিতে পরিণত করার সক্ষমতা রাখে। জ্বালানি তেলের বিশাল মজুদ এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের ভা-ার দেশটিকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে বসিয়েছে। তবে কেবল তেল নয়, কৃষিজাত পণ্যের মধ্যে জাফরান, পেস্তা এবং হাতে বোনা কার্পেট ইরানের নাম সারা বিশ্বে উজ্জ্বল করে রেখেছে।
ইরানের বর্তমান সামরিক শক্তি মধ্যপ্রাচ্য ছাড়িয়ে বিশ্ব দরবারে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশটির সামরিক বাহিনী প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত—একটি সীমান্ত রক্ষার জন্য প্রথাগত বাহিনী এবং অন্যটি শাসনব্যবস্থা ও বিপ্লব রক্ষায় নিবেদিত বাহিনী। আধুনিক ইরান আজ নিজস্ব প্রযুক্তি ও কারিগরি দক্ষতায় অবিশ্বাস্য সামরিক স্বনির্ভরতা অর্জন করেছে। বিশেষ করে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং দূরপাল্লার চালকবিহীন বিমান বা ড্রোনের সক্ষমতা অনেক উন্নত রাষ্ট্রকেও বিস্মিত করে। শত প্রতিকূলতা ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মাঝেও তারা যেভাবে নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করেছে, তা এক বিস্ময়। এছাড়া কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালীতে ইরানের নৌ-বাহিনীর আধিপত্য বিশ্ব বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও এক বড় প্রভাব বিস্তারকারী ফ্যাক্টর।
বর্তমানে ইরান আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নানামুখী চাপের সম্মুখীন হলেও তাদের ইতিহাস এবং জনগণের দৃঢ় চেতনা তাদের পথ চলতে সাহায্য করছে। একদিকে প্রাচীন পারস্যের গৌরবময় ঐতিহ্য, অন্যদিকে আধুনিক যুগের সামরিক ও বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিÑএই দুইয়ের সমন্বয়ে ইরান বিশ্ব মানচিত্রে এক প্রভাবশালী শক্তির নাম। তেল-গ্যাসের প্রাচুর্য আর কৌশলগত সামরিক শক্তির কারণে দেশটি কেবল একটি রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং একটি আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসেবে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। হাজার বছরের পরিবর্তনের স্রোতে গা ভাসিয়েও ইরান আজও তার নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি এবং স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে এক অপরাজেয় শক্তি হিসেবে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার উত্তেজনা এক ভয়াবহ যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান- ইজরাইল-মার্কিন যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালীর সংকট নিয়ে এবং ৭ এপ্রিল, ২০২৬ ট্রাম্পের আল্টিমেটাম পরবর্তী পরিস্থিতি ভয়াবহ রুপ নিয়েছে।
যুদ্ধের সর্বশেষ হালনাগাদ অবস্থা :
২০২৬ সালের ৭ এপ্রিল মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে একটি অন্ধকার দিন হিসেবে চিহ্নিত হতে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার জন্য যে চূড়ান্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন, তা ৭ এপ্রিল রাত ৮টায় (যুক্তরাষ্ট্রের ইস্টার্ন টাইম অনুযায়ী মধ্যরাত) শেষ হয়েছে। ইরান এই আল্টিমেটাম প্রত্যাখ্যান করার পর মধ্যপ্রাচ্য এখন এক প্রলয়ঙ্কারী যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে।
১. ট্রাম্পের আল্টিমেটাম ও এফ-৩৫ (ঋ-৩৫) হামলার বর্তমান পরিস্থিতি :
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পরিষ্কারভাবে সতর্ক করেছিলেন যে, ৭ এপ্রিলের মধ্যে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না করলে ইরানের বেসামরিক অবকাঠামো, বিশেষ করে বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ব্রিজগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হবে।
হামলার শুরু: আল্টিমেটাম শেষ হওয়ার পরপরই পারস্য উপসাগরে অবস্থানরত মার্কিন বিমানবাহী রণতরী এবং আঞ্চলিক ঘাঁটিগুলো থেকে ঋ-৩৫ খরমযঃহরহম ওও স্টিলথ ফাইটার জেটের স্কোয়াড্রনগুলো আকাশে উড়তে দেখা গেছে। সর্বশেষ সংবাদ অনুযায়ী, তেহরানসহ ইরানের প্রধান শহরগুলোর বিদ্যুৎ গ্রিড এবং কৌশলগত সেতুগুলোকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলা শুরু হয়েছে।
ইরানের প্রতিক্রিয়া: ইরান এই আল্টিমেটামকে “আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন” এবং “যুদ্ধাপরাধের উসকানি” হিসেবে অভিহিত করেছে। তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধ এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না করলে তারা প্রণালী খুলবে না।
২. যুক্তরাষ্ট্রে ইরানের সরাসরি হামলা
ইরান সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখ-ে হামলা করার সক্ষমতা সীমিত রাখলেও, তারা “অপ্রতিসম যুদ্ধ” (অংুসসবঃৎরপ ডধৎভধৎব) কৌশলে আঘাত হেনেছে:
সাইবার হামলা: মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, আল্টিমেটাম শেষ হওয়ার আগমুহূর্ত থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং আর্থিক খাতে বড় ধরনের সাইবার আক্রমণ শুরু করেছে ইরানি হ্যাকাররা।
আঞ্চলিক আঘাত: ইরান সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখ-ে ক্ষেপণাস্ত্র না ছুড়লেও, তারা ইরাক ও সিরিয়ায় থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে এবং ইসরায়েলের তেল আবিব লক্ষ্য করে ব্যাপক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
৩. হতাহতের সর্বশেষ পরিসংখ্যান (৭ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত) যুদ্ধের ভয়াবহতা উভয় পক্ষেই ব্যাপক প্রাণহানির কারণ হয়েছে।
২০২৬ সালের এই প্রলয়ঙ্কারী যুদ্ধে হতাহতের সঠিক সংখ্যা নিরুপণ করা কঠিন হলেও, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থা এবং সংবাদমাধ্যমের সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে একটি আনুমানিক চিত্র তুলে ধরা হলো।
হতাহতের পরিসংখ্যান ও মানবিক বিপর্যয়
এই ভয়াবহ যুদ্ধে এখন পর্যন্ত কয়েক লক্ষ মানুষের জীবনহানি ঘটেছে। বিভিন্ন সূত্রের সংগৃহীত তথ্যানুযায়ী, ইরানে নিহতের সংখ্যা আনুমানিক চল্লিশ হাজার থেকে পঞ্চাশ হাজার এর মধ্যে। এর মধ্যে একটি বড় অংশই হলো সামরিক বাহিনীর সদস্য, তবে আমেরিকার তীব্র বিমান হামলায় ইরানের তেহরান ও ইসফাহানের মতো শহরগুলোতে প্রায় পঁচিশ হাজার বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। ইরানে আহতের সংখ্যা বর্তমানে এক লক্ষ বিশ হাজার ছাড়িয়ে গেছে, যাদের মধ্যে অনেকের অবস্থাই আশঙ্কাজনক।
ইসরায়েলের ক্ষেত্রে প্রাণহানির সংখ্যা ইরানের তুলনায় কিছুটা কম হলেও তা দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধাক্কা। ইরানের মুহুর্মুহু ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরায়েলে প্রায় দশ হাজার থেকে পনেরো হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। যার মধ্যে সামরিক সদস্যের সংখ্যা প্রায় চার হাজার। ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরে আহতের সংখ্যা প্রায় পঁয়ত্রিশ হাজার, যারা মূলত রকেট হামলা ও ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে পড়ে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন।
আমেরিকার ক্ষেত্রে সরাসরি যুদ্ধে নিহতের সংখ্যা তুলনামূলক কম। জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা মার্কিন বাহিনীর প্রায় দুই হাজার থেকে তিন হাজার সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন এবং প্রায় সাত হাজার সৈন্য গুরুতর আহত হয়েছেন। মূলত ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর চোরাগোপ্তা হামলায় এই ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
প্রতিবেশী দেশগুলোতেও এই যুদ্ধের আঁচ লেগেছে। লেবানন এবং সিরিয়ায় অন্তত আট হাজার মানুষ নিহত হয়েছে এবং প্রায় কুড়ি হাজার মানুষ আহত হয়েছে। সব মিলিয়ে এই যুদ্ধে নিহতের মোট সংখ্যা প্রায় পঁচাত্তর হাজার ছাড়িয়ে গেছে এবং আহতের সংখ্যা দুই লক্ষাধিক। এই বিশাল সংখ্যক হতাহত এবং তার ফলে সৃষ্ট উদ্বাস্তু সমস্যা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যকে এক দীর্ঘমেয়াদী অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। লেখক: সাবেক ব্যাংকার









