কাজী মামুনুর রহমান মাহিম
সাংবাদিকতা শুধু সংবাদ প্রকাশের কাজ নয়; অপরাধ, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সত্য তুলে ধরাও এর অন্যতম দায়িত্ব। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনো সাংবাদিককে প্রাণ হারাতে হলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরের হত্যাকাণ্ড সেই প্রশ্নকে আরও গভীর করেছে।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলিফ সীমান্ত এলাকায় মাদক, চোরাচালান এবং অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলনসহ বিভিন্ন অপরাধ নিয়ে অনুসন্ধান করতেন। তথ্য সংগ্রহে কখনো ছদ্মবেশও ধারণ করতেন তিনি। ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামের একটি ফেসবুক পেজে বিভিন্ন অপরাধ ও অনিয়ম নিয়ে তথ্য প্রকাশ করতেন। হত্যাকাণ্ডের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত ১৫ অক্টোবর ২০২৬ রাতে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার বিরিশিরি ইউনিয়নের তেলনজিয়া এলাকায় শ্যামগঞ্জ–বিরিশিরি সড়কের পাশে গুলিতে নিহত হন আলিফ। তিনি বেসরকারি আইপি টেলিভিশন চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি ছিলেন। এর আগে, ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর দুর্গাপুরের সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় সংবাদ সংগ্রহের সময় হামলায় গুরুতর আহত হয়েছিলেন তিনি।
আগের হামলার পরও একজন সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কতটা জরুরি, আলিফের হত্যাকাণ্ড তা নতুন করে সামনে এনেছে। তাঁর অনুসন্ধানী কাজের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে উদ্ঘাটন করা প্রয়োজন। অনুমান বা অভিযোগের ভিত্তিতে হত্যার উদ্দেশ্য সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো নয়, বরং তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রকৃত ঘটনা বের করে আনাই জরুরি।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২১ অক্টোবর পর্যন্ত এ মামলায় দুজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে সাজিবুল ইসলাম ওরফে অপূর্বকে চার দিন এবং আশিকুর রহমান প্রাঙ্গণকে তিন দিনের পুলিশ রিমান্ডে নেওয়ার আদেশ দেন আদালত। তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে এখন প্রত্যাশা, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে আলিফের ওপর আগের হামলার ঘটনাটিও গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
এ হত্যাকাণ্ডে তাঁর স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা ও দুই সন্তান অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তাঁদের পাশে দাঁড়ানো, প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা এবং ন্যায়বিচারের দাবিতে সোচ্চার থাকা মানবিক ও পেশাগত দায়িত্বের অংশ।
প্রথম আলোর ১৭ অক্টোবরের প্রতিবেদনে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্তের মাধ্যমে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে। বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাংবাদিকদের সুরক্ষায় আইন প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা গণতান্ত্রিক সমাজে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা এবং জনস্বার্থ রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। সাংবাদিকেরা অপরাধ ও অনিয়মের তথ্য প্রকাশ করতে গিয়ে যদি হামলা, হুমকি কিংবা হত্যার ঝুঁকিতে থাকেন, তবে তা শুধু তাঁদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকেই বিপন্ন করে না; মানুষের জানার অধিকার এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
সাংবাদিকের ওপর হামলা ও হত্যার ঘটনায় কার্যকর তদন্ত এবং বিচার নিশ্চিত না হলে দায়মুক্তির আশঙ্কা বাড়ে। এতে অপরাধের তথ্য প্রকাশে সাংবাদিকদের মধ্যে ভীতি তৈরি হতে পারে। তাই সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তাঁদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের দ্রুত তদন্ত করা এবং দোষীদের আইনানুগ শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।
আলিফ ফকিরের হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাংবাদিকদের নিরাপদে কাজ করার পরিবেশ প্রতিষ্ঠায় কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। তাঁর পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি সাংবাদিক সমাজেরও উচিত তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি অনুসরণ করা এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তার প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধভাবে সোচ্চার থাকা।
অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা যেন ভয় ও প্রাণহানির আশঙ্কায় থমকে না যায়, সে দায়িত্ব রাষ্ট্র, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং সামগ্রিকভাবে সমাজের। আলিফ হত্যার নিরপেক্ষ তদন্ত, ন্যায়বিচার এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি তাই শুধু একজন সাংবাদিকের জন্য নয়—এটি স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মানুষের জানার অধিকার রক্ষারও দাবি।
সাংবাদিক আলিফ ফকির হত্যার নিরপেক্ষ তদন্ত ও ন্যায়বিচার চাই। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
কাজী মামুনুর রহমান মাহিম, সাংবাদিক ও আইন-নীতি বিশ্লেষক