খোলা কলাম/শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কের সৌন্দর্য নষ্ট করছে ডাস্টবিন ও উন্মুক্ত শৌচাগার
মোহাম্মদ মুজাহিদ
নাগরিক জীবনের কর্মব্যস্ততা, ক্লান্তি ও অবসাদ কাটাতে মানুষ খোঁজেন একটু নির্মল পরিবেশ ও স্বস্তির নিঃশ্বাস। আর সেই প্রত্যাশা নিয়েই প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় সাতক্ষীরা শহরের একমাত্র উন্মুক্ত বিনোদনকেন্দ্র শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কে ভিড় করেন নানা বয়সী মানুষ। কিন্তু পার্কের উত্তর পাশে স্থাপিত ডাস্টবিন এবং পশ্চিম পাশে অবস্থিত উন্মুক্ত শৌচাগারের তীব্র দুর্গন্ধে দর্শনার্থীদের সেই স্বস্তি এখন পরিণত হয়েছে চরম ভোগান্তিতে।সরেজমিনে দেখা যায়, পার্কের উত্তর পাশে সড়কের ধারে পৌরসভার ময়লা ফেলার নির্ধারিত স্থানে বিভিন্ন এলাকার আবর্জনা জমা করা হচ্ছে। ডাস্টবিনের ঠিক পাশেই অবস্থিত জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগার (সাতক্ষীরা কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরি)। ফলে লাইব্রেরিতে আসা পাঠক, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সাধারণ পথচারীদের দুর্গন্ধের মধ্য দিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পার্কসংলগ্ন এলাকার বাসাবাড়ি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য প্রতিদিন এখানে ফেলা হলেও সময়মতো তা অপসারণ করা হয় না। অনেক সময় সকাল ১০টা পর্যন্তও ময়লা বহনের কনটেইনার সরানো হয় না। এছাড়া পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা ডাস্টবিনে জমে থাকা আবর্জনা ঘেঁটে বিভিন্ন ভাঙাচোরা ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী সংগ্রহ করেন। এতে ময়লার দুর্গন্ধ আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়। আবর্জনার ময়লা পানি পাশের পয়নিষ্কাশন ড্রেনে গড়িয়ে পড়ায় পরিবেশ দূষণও বাড়ছে। পার্কে নিয়মিত ব্যায়াম করতে আসা সুলতানপুর এলাকার বাসিন্দা সাইফুল আজম খান মামুন বলেন, পার্কটির আয়তন মাত্র দেড় থেকে দুই একর। ফলে ডাস্টবিনের দুর্গন্ধ সহজেই পুরো পার্কে ছড়িয়ে পড়ে। সকালে ব্যায়াম করতে আসা মানুষের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। কিছুদিন পর উত্তর দিকের বাতাস প্রবাহিত হলে দুর্গন্ধ আরও তীব্র হবে। তখন পার্কে বসে থাকাও কঠিন হয়ে পড়বে। ডায়াবেটিস রোগী মিনাক্ষী জানান, চিকিৎসকের পরামর্শে প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় হাঁটতে পার্কে আসেন তিনি। কিন্তু পার্কের উত্তর-পশ্চিম অংশে গেলেই দুর্গন্ধে নাক চেপে হাঁটতে হয়। তিনি বলেন, সুস্থ থাকার জন্য হাঁটতে আসি, অথচ দূষিত বাতাসে উল্টো অসুস্থ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। বর্তমানে পার্কে নিয়মিত হাঁটতে আসা মানুষের বড় একটি অংশ ডায়াবেটিস ও অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত। এছাড়া অনেকেই শরীর সুস্থ রাখতে ব্যায়াম করতে আসেন। কিন্তু পার্কের পরিবেশগত সমস্যার কারণে তাদের অনেকেই অসন্তুষ্ট। উন্মুক্ত শৌচাগারের পাশ দিয়ে নাক চেপে হেঁটে যাচ্ছিলেন মুনজিতপুরের বাসিন্দা রবিউল ইসলাম। তিনি বলেন, শৌচাগারটি উন্মুক্ত হওয়ায় এবং নিয়মিত পরিষ্কার না করায় বাতাসে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। অন্যদিকে পার্কের উত্তর পাশের ডাস্টবিনে সারাদিন ময়লা জমা হচ্ছে। কিন্তু নিয়মিত অপসারণ করা না হওয়ায় এটি স্থায়ী সমস্যায় পরিণত হয়েছে। ব্যাংকার ইজ্জত উল্লাহ বলেন, সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রতিদিন শরীরচর্চা করতে পার্কে আসি। কিন্তু আশপাশের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে এখন আর আগের মতো ভালো লাগে না। এলাকাবাসী পৌরসভায় অভিযোগ করলে কয়েকদিন পরিস্থিতির উন্নতি হয়, এরপর আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। স্থানীয়দের মতে, পার্কের ভেতরের পরিবেশ এখনও মোটামুটি পরিচ্ছন্ন থাকলেও বাইরের অংশের অব্যবস্থাপনা পুরো পার্কের সৌন্দর্য ও পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। পার্কের চারপাশে যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা, ড্রেনে জমে থাকা বর্জ্য এবং দুর্গন্ধে অনেক দর্শনার্থী বিব্রত হচ্ছেন। বর্তমানে সুলতানপুর, মুনজিতপুর, রসুলপুর, কামালনগর, পুরাতন সাতক্ষীরাসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার মানুষের অন্যতম মিলনস্থল এই পার্ক। শিশুদের খেলাধুলা, কিশোর-কিশোরীদের আড্ডা, শিক্ষার্থীদের অবসর সময় কাটানো এবং বয়স্কদের হাঁটাহাঁটির জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে বিবেচিত। বিকেল হলেই পার্কে মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। শিশু-কিশোররা মাঠে ক্রিকেট খেলায় মেতে ওঠে। শহীদ বেদির পাদদেশে বসে চলে আড্ডা, গল্পগুজব। অনেকে পরিবার নিয়ে সময় কাটাতে আসেন। শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্যও এই পার্ককে বেছে নেন। বদ্ধ শহুরে পরিবেশে একটু মুক্ত বাতাসের সন্ধান মেলে এখানেই। তবে দিনের বেলায় পার্কের চারপাশে হকারদের দোকান বসানো, ড্রেন থেকে ময়লা উপচে পড়া এবং ডাস্টবিনের দুর্গন্ধে পরিবেশ ক্রমেই অস্বাস্থ্যকর হয়ে উঠছে। অনেককে নাকে রুমাল চেপে চলাচল করতে দেখা যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশান্তির এই পার্কের পাশে অশান্তির ডাস্টবিন থাকায় বিনোদনের পরিবেশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সচেতন নাগরিকদের দাবি, দ্রুত ডাস্টবিন স্থানান্তর, উন্মুক্ত শৌচাগারের আধুনিকায়ন, নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ এবং পার্কসংলগ্ন এলাকার পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা হোক। অন্যথায় শহরের মানুষের একমাত্র উন্মুক্ত বিনোদনকেন্দ্রটি তার আকর্ষণ হারাবে এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়বে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন পার্কে আসা দর্শনার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
সাতক্ষীরা জেলা নাগরিক কমিটির নেতা ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সাতক্ষীরা ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক মাধব চন্দ্র দত্ত বলেন, শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্ক শুধু একটি পার্ক নয়, এটি সাতক্ষীরা শহরের মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও বিনোদন কেন্দ্র। প্রতিদিন শত শত মানুষ এখানে শরীরচর্চা, হাঁটাহাঁটি ও অবসর সময় কাটাতে আসেন। কিন্তু পার্কের পাশে ডাস্টবিন ও উন্মুক্ত শৌচাগারের কারণে পরিবেশ দূষণ সৃষ্টি হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্যও হুমকিস্বরূপ। একটি বিনোদনকেন্দ্রের পাশে এমন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ কোনোভাবেই কাম্য নয়।
তিনি আরও বলেন, পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে শহরের সৌন্দর্য যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। দ্রুত ডাস্টবিন স্থানান্তর, উন্মুক্ত শৌচাগারের আধুনিকায়ন এবং নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি পার্ক ও এর আশপাশের পরিবেশ রক্ষায় পৌরসভা, প্রশাসন এবং নাগরিক সমাজকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। শহরের একমাত্র বৃহৎ উন্মুক্ত বিনোদনকেন্দ্রকে রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি।
এ বিষয়ে সাতক্ষীরা পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আসাদুজ্জামান বলেন, শহরের দৈনন্দিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি চলমান প্রক্রিয়া। শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্ক সংলগ্ন ডাস্টবিন ও শৌচাগার নিয়ে নাগরিকদের অভিযোগের বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। পার্কে আগত দর্শনার্থীরা যাতে কোনো ধরনের ভোগান্তির শিকার না হন, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, ডাস্টবিন থেকে নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার এবং শৌচাগারের পরিবেশ উন্নয়নের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগকে নির্দেশনা দেওয়া হবে। পাশাপাশি পার্কের আশপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মত রাখতে পৌরসভার পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। নাগরিকদেরও নির্ধারিত স্থানে বর্জ্য ফেলা এবং পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে সচেতন ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, নাগরিকদের সহযোগিতা এবং পৌরসভার সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্ককে আরও পরিচ্ছন্ন, সুন্দর ও দর্শনার্থীবান্ধব পরিবেশে পরিণত করা সম্ভব হবে।










