এম. এম হায়দার আলী
বাংলাদেশের কৃষি ভিত্তিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি ধান। কৃষকের ঘাম, শ্রম ও ত্যাগের ফসল এই ধান। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, বাজারে ধানের দাম কমে গেলেও তার কোনো ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে না চালের বাজারে। বরং চালের দাম কমার পরিবর্তে ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। এতে একদিকে কৃষক তার ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে সাধারণ ভোক্তাদের গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত মূল্য। লাভবান হচ্ছে কেবল মধ্যস্বত্বভোগী ও অসাধু ব্যবসায়ীদের একটি অংশ।
বর্তমান বাজারে এক মণ ২৮ জাতের ধান বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১,১০০ থেকে ১,১৫০ টাকায় এবং এক মণ মোটা ধানের দাম ৯০০ থেকে ৯৫০ টাকার মধ্যে। হিসাব করলে দেখা যায়, ধান সিদ্ধ, শুকানো, মিলিং ও অন্যান্য খরচ বাদ দিয়েও প্রতি কেজি চিকন চালের উৎপাদন ব্যয় প্রায় ৪১ টাকা এবং মোটা চালের ক্ষেত্রে প্রায় ৩৫ টাকার কাছাকাছি দাঁড়ায়। অথচ একই চাল পাইকারি বাজারে বিক্রি হচ্ছে চিকন চালের ক্ষেত্রে প্রতি কেজি ৬০ থেকে ৭০ টাকা এবং মোটা চাল ৩৫ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত।
এই বিশাল মূল্য ব্যবধানের যৌক্তিক ব্যাখ্যা সাধারণ মানুষের কাছে নেই। প্রশ্ন উঠছে, ধানের দাম কমলে চালের দাম কেন কমে না ? বাজার ব্যবস্থাপনার কোথায় এই অসামঞ্জস্য ? উৎপাদন খরচের তুলনায় অতিরিক্ত মুনাফা কারা করছে ? বাস্তবতা হলো, কৃষক তার উৎপাদিত ধানের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। অপরদিকে ভোক্তারা বাধ্য হয়ে উচ্চমূল্যে চাল কিনছেন। অর্থাৎ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন উৎপাদক ও ভোক্তা উভয় পক্ষই।
মাঝখানে লাভের বড় অংশ চলে যাচ্ছে কিছু মিল মালিক, মজুতদার ও অসাধু ব্যবসায়ীর হাতে। বাজারে কার্যকর নজরদারির অভাব, অস্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণ এবং কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করার প্রবণতা এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। শুধু কি চাল ? প্রতিদিন ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে দেশের হাজারো মানুষ ছুটে যান কাঁচা বাজারে। উদ্দেশ্য একটাই,পরিবারের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী কেনা। কিন্তু বাজারে ঢুকেই যেন তাদের মুখে নেমে আসে হতাশার ছাপ। গত সপ্তাহে যে দামে চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ কিংবা সবজি কেনা গেছে, এক সপ্তাহ পরই সেই একই পণ্যের দাম আরও বেড়ে গেছে। যেন নিত্যপণ্যের বাজারে ঊর্ধ্বমুখী দামের কোনো শেষ নেই।
সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নি¤œ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ। সীমিত আয়ে সংসার চালাতে গিয়ে অনেক পরিবার এখন প্রয়োজনীয় খাবারের তালিকা ছোট করতে বাধ্য হচ্ছে। কেউ মাছ-মাংস বাদ দিচ্ছেন, কেউ ডিম কেনাও কমিয়ে দিয়েছেন। অনেকের কাছে তিন বেলা খাবারের ব্যবস্থা করাও এখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে। বাজারে প্রতিটি পণ্যের দাম বাড়লেও সেই অনুপাতে বাড়ছে না মানুষের আয়। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় ও আয়ের মধ্যে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের বৈষম্য।
তবে নিত্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। যেমন আন্তর্জাতিক বাজারে কিছু পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের পরিবর্তন,এসব বাস্তব কারণের পাশাপাশি রয়েছে বাজারে অসাধু সিন্ডিকেট, মজুতদারি, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি এবং দুর্বল বাজার তদারকি। এসব কারণে অনেক সময় প্রকৃত চাহিদার তুলনায় অযৌক্তিক ভাবে দাম বেড়ে যায়। কৃষকরাও এই পরিস্থিতিতে স্বস্তিতে নেই।
ধান, সবজি কিংবা অন্যান্য কৃষিপণ্য উৎপাদনে তাদের খরচ বাড়ছে। কিন্তু ফসল বিক্রির সময় তারা অনেক ক্ষেত্রেই ন্যায্য মূল্য পান না। অন্যদিকে সেই একই পণ্য একাধিক হাত ঘুরে শহরের বাজারে পৌঁছাতে পৌঁছাতে কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি হয়। ফলে কৃষক যেমন বঞ্চিত হন, তেমনি ভোক্তাকেও অতিরিক্ত মূল্য গুনতে হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, বাজারে নিয়মিত ও কার্যকর তদারকি, মূল্যতালিকা প্রদর্শন নিশ্চিত করা, মজুতদারি ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ করা ছাড়া এই সংকট থেকে সহজে উত্তরণ সম্ভব নয়। পাশাপাশি সরকারের খাদ্য মজুত শক্তিশালী করা, কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি পণ্য সংগ্রহ বৃদ্ধি, প্রয়োজন অনুযায়ী সময় মতো আমদানি এবং ন্যায্য মূল্যের বিক্রয় কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করা জরুরি।
একই সঙ্গে দরিদ্র ও নি¤œ আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি বাড়ানোও সময়ের দাবি। নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমুখী বাজার শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়; এটি একটি সামাজিক ও মানবিক সংকটও। যখন একজন বাবা সন্তানের পছন্দের খাবার কিনে দিতে পারেন না, একজন মা সংসারের ব্যয় মেটাতে নিজের প্রয়োজন বিসর্জন দেন, তখন মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকে না,তা ছড়িয়ে পড়ে প্রতিটি পরিবারের জীবনে।
দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা তখনই অর্থবহ হবে, যখন সাধারণ মানুষ স্বস্তিতে বাজার করতে পারবেন, কৃষক তার উৎপাদনের ন্যায্য মূল্য পাবেন এবং প্রতিটি পরিবার ন্যূনতম খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে। নিত্যপণ্যের বাজারকে স্থিতিশীল রাখা তাই শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; ব্যবসায়ী, উৎপাদক, বাজার তদারকি সংস্থা এবং সচেতন ভোক্তা সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। কারণ, একটি দেশের উন্নয়নের প্রকৃত মানদ- নির্ধারিত হয় সাধারণ মানুষের ভাতের থালা কতটা নিরাপদ ও পরিপূর্ণ, তার ওপরই…।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট