এম.এম হায়দার আলী
বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু কিছু মুহূর্ত আসে, যা কেবল একটি রাজনৈতিক দলের জন্য নয়, গোটা রাষ্ট্রের জন্যই তাৎপর্য বহন করে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণার সিদ্ধান্ত তেমনই একটি আলোচিত অধ্যায়। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা, নানা চড়াই-উতরাই এবং দুঃসময়ে দলের পাশে থাকার অভিজ্ঞতা পেরিয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক দায়িত্বে তার আসীন হওয়া নিঃসন্দেহে তার রাজনৈতিক জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শুধু বিএনপির মহাসচিব নন, তিনি বাংলাদেশের সমকালীন রাজনীতির একজন পরিচিত ও অভিজ্ঞ মুখ। ছাত্র জীবন থেকে রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা, শিক্ষকতা ও সরকারি চাকরির অভিজ্ঞতা এবং পরবর্তীতে সক্রিয় রাজনীতিতে সম্পৃক্ততা,সব মিলিয়ে তার রাজনৈতিক জীবন দীর্ঘ ও ঘটনা বহুল।
ঠাকুরগাঁওয়ের মাটিতে বেড়ে ওঠা এই রাজনীতিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিষয়ে অধ্যয়ন করতেন। কর্ম জীবনের শুরুতে শিক্ষকতা ও সরকারি চাকরিতে থাকলেও রাজনীতির প্রতি তার গভীর আকর্ষণ শেষ পর্যন্ত দেশ প্রেমিক এই মানুষটিকে সক্রিয় রাজনীতির অঙ্গনে নিয়ে আসে। সময়ের সঙ্গে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোর বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করে তিনি দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে উঠে আসেন।
বিএনপির মহাসচিব হিসেবে তার দীর্ঘ দায়িত্ব পালন রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দলের নানা সংকট, আন্দোলন-সংগ্রাম, মামলা-মোকদ্দমা ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার সময়ে তাকে সামনে থেকে দলের অবস্থান তুলে ধরতে দেখা গেছে। কখনো সংবাদ সম্মেলনে, কখনো রাজপথে, আবার কখনো দলীয় নেতাকর্মীদের পাশে, বিভিন্ন ভূমিকায় তিনি ছিলেন দৃশ্যমান। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক বক্তব্যে গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, আইনের শাসন ও জনগণের অধিকার বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে।
রাজনৈতিক মত-পার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ভিন্নমত, আলোচনা ও রাজনৈতিক সহাবস্থানের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে তার সামনে তাই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সংবিধান ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতা প্রদর্শন করা। এখানেই রাষ্ট্রপতির পদটি রাজনৈতিক দলের পদ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
মহাসচিব হিসেবে তিনি একটি দলের নেতৃত্বের অংশ ছিলেন, রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাকে হতে হবে সব দল, মত ও শ্রেণি-পেশার মানুষের রাষ্ট্রপতি। রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা যদি তিনি নিরপেক্ষতা, প্রজ্ঞা ও সাংবিধানিক দায়িত্ব বোধের সঙ্গে প্রয়োগ করতে পারেন, তাহলে সেটিই হবে তার সবচেয়ে বড় সাফল্য। দেশের স্বার্থে একজন অভিজ্ঞ ও পরীক্ষিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তকে তাই স্বাগত জানানো যায়।
বিএনপি সরকারের এই সিদ্ধান্তের জন্য তাদের ধন্যবাদ জানাতেই হয়,যদি এই সিদ্ধান্ত সত্যিই জাতীয় স্বার্থ, রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা এবং জনগণের প্রত্যাশাকে সামনে রেখে নেওয়া হয়ে থাকে। একই সাথে,সেই পদে বসে অতীতের রাজনৈতিক পরিচয়কে সম্মানের সঙ্গে ধারণ করলেও দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সংবিধানই হতে হবে প্রধান পথ নির্দেশক। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সামনে তাই এখন এক নতুন পরীক্ষা। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা ও অর্জনকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে কতটা সফল ভাবে কাজে লাগাতে পারেন,সেটিই হবে তার নতুন পরিচয়ের মূল মাপ কাঠি।
রাজপথের সংগ্রামী নেতা থেকে রাষ্ট্রপতির আসন, এই যাত্রা নিঃসন্দেহে দীর্ঘ পথের প্রাপ্তি। এখন প্রয়োজন অতীতের অভিজ্ঞতাকে ভবিষ্যতের দায়িত্বশীলতায় রূপ দেওয়া। কারণ রাষ্ট্রপতির আসনে বসে তিনি আর শুধু কোনো দলের নেতা নন, তিনি গোটা বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। কারন, দেশ তার কাছে প্রত্যাশা করবে, দল নয়, রাষ্ট্র হবে সবার আগে,রাজনীতি নয়, সংবিধান হবে পথের নির্দেশনা, আর ব্যক্তিগত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে জনগণের স্বার্থই হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। সর্বোপরি, আমি দেশ বরেণ্য এই মানুষটির পারিবারিক, চাকরি এবং রাজনৈতিক জীবনী ঘেটে যতটুকু জানতে পেরেছি তাতে উনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেশের মানুষের কাছে আরো একবার সুনাম অর্জন করবেন, আমার এমনটি প্রত্যাশা।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট