বিশ্ব সুনামি সচেতনতা দিবস: ভয় নয়, প্রস্তুতিই হোক মূল জয়
সাকিবুর রহমান বাবলা
প্রকৃতির কিছু দুর্যোগ এতটাই আকস্মিক ও ভয়াবহ যে, মানুষকে প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগটুকুও দেয় না। সুনামি তেমনই এক বিধ্বংসী প্রাকৃতিক বিপর্যয়। সমুদ্রের গভীরে সৃষ্ট ভূমিকম্প কিংবা অন্যান্য ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের ফলে মুহূর্তের মধ্যে উত্তাল হয়ে ওঠে বিশাল জলরাশি। সেই ঢেউ উপকূলে আছড়ে পড়ে জনপদ, ঘরবাড়ি, অবকাঠামো ও জীবিকা ধ্বংস করে দিতে পারে। প্রাণহানির পাশাপাশি সৃষ্টি হয় দীর্ঘমেয়াদি মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকট। সুনামির ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা, আগাম সতর্কবার্তা ও দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতি বাড়াতে প্রতিবছর ৫ নভেম্বর পালিত হয় বিশ্ব সুনামি সচেতনতা দিবস।
‘সুনামি’ শব্দটি জাপানি ভাষার ‘সু’ ও ‘নামি’ শব্দ থেকে এসেছে। এর অর্থ যথাক্রমে বন্দর ও ঢেউ। সমুদ্রের তলদেশে আকস্মিক ভূমিকম্পের ফলে বিপুল পরিমাণ পানি স্থানচ্যুত হয়ে যে বিশাল ঢেউয়ের ধারাবাহিকতা সৃষ্টি করে, তাকে সুনামি বলে। এ ছাড়া আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, সমুদ্রতলের ভূমিধস, উপকূলীয় পাহাড় বা পাথরের বিশাল অংশ ধসে পড়া এবং সমুদ্রে বড় গ্রহাণুর আঘাত থেকেও সুনামি সৃষ্টি হতে পারে। গভীর সমুদ্রে এসব ঢেউ তুলনামূলক কম উচ্চতার হলেও অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ে। উপকূলের অগভীর পানিতে পৌঁছালে ঢেউয়ের উচ্চতা বেড়ে ভয়াবহ রূপ ধারণ করে।
সুনামির সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, প্রথম ঢেউটিই সব সময় সবচেয়ে বড় বা শক্তিশালী হয় না। দ্বিতীয়, তৃতীয় কিংবা পরবর্তী ঢেউ আরও বিধ্বংসী হতে পারে। একটি ঢেউ আঘাত হানার পর সমুদ্রের পানি হঠাৎ অনেক দূর পর্যন্ত সরে গিয়ে সমুদ্রতল দৃশ্যমান হতে পারে। এটি নিরাপদ হওয়ার লক্ষণ নয়; বরং পরবর্তী ঢেউ আসার পূর্বসংকেত হতে পারে। কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত সুনামির ঢেউ আঘাত হানতে পারে। আগের ঢেউয়ে ধ্বংস হওয়া স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ পরবর্তী ঢেউয়ের সঙ্গে ভেসে এসে ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়ায়। তাই একটি ঢেউ চলে যাওয়ার পরও সরকারি সতর্কবার্তা প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত নিরাপদ উঁচু স্থানে অবস্থান করা জরুরি।
২০১৫ সালের ২২ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৭০/২০৩ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে ৫ নভেম্বরকে বিশ্ব সুনামি সচেতনতা দিবস ঘোষণা করে। জাপানের উদ্যোগে দিবসটি পালনের ধারণা সামনে আসে। এর পেছনে রয়েছে ১৮৫৪ সালের ৫ নভেম্বরের একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। জাপানের ওয়াকায়ামা অঞ্চলে শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর সুনামির আশঙ্কা দেখা দিলে হামাগুচি গোরিও নামের এক ব্যক্তি গ্রামবাসীকে সতর্ক করতে নিজের সদ্য কাটা ধানের স্তূপে আগুন ধরিয়ে দেন। আগুনের আলো দেখে গ্রামবাসীরা উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়ে প্রাণে বেঁচে যান। ‘ইনামুরা-নো-হি’ নামে পরিচিত এই ঘটনা দুর্যোগের পূর্বলক্ষণ শনাক্ত করা ও দ্রুত সতর্ক করার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
দিবসটির মূল উদ্দেশ্য হলো সুনামির ঝুঁকি সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো, উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর আগাম প্রস্তুতি জোরদার করা এবং কার্যকর সতর্কীকরণ ও নিরাপদ স্থানান্তরব্যবস্থা গড়ে তোলা। ২০১৫–২০৩০ মেয়াদি সেনদাই দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস কাঠামো বাস্তবায়নেও দিবসটি গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য ‘সুনামির জন্য প্রস্তুত থাকুন: সহনশীলতা শুরু হোক আপনার থেকেই’। এর বার্তা হলো, দুর্যোগ মোকাবিলার দায়িত্ব শুধু সরকার বা প্রতিষ্ঠানের নয়; ব্যক্তি, পরিবার ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
সমুদ্রের কাছাকাছি অবস্থানকালে তীব্র বা দীর্ঘস্থায়ী ভূমিকম্প অনুভূত হলে, সমুদ্রের পানি অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত সরে গেলে কিংবা সমুদ্রের দিক থেকে অস্বাভাবিক গর্জন শোনা গেলে সরকারি ঘোষণার অপেক্ষা না করে দ্রুত উঁচু স্থানে চলে যেতে হবে। এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে ২০২২ সালে জাতিসংঘের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসবিষয়ক দপ্তর ‘গেট টু হাই গ্রাউন্ড’ প্রচারাভিযান শুরু করে। এর আওতায় নিরাপদ স্থানে যাওয়ার নির্ধারিত পথে হাঁটা, দৌড়, স্থানান্তর মহড়া ও সচেতনতামূলক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। শিশু, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও পর্যটকসহ সমাজের সব শ্রেণির মানুষকে সম্পৃক্ত করাই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
গত এক শতকে ৫৮টি সুনামিতে ২ লাখ ৬০ হাজারেরও বেশি মানুষের প্রাণহানির তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে ২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর ভারত মহাসাগরে সংঘটিত সুনামিটি ছিল সবচেয়ে প্রাণঘাতী। ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপের কাছে ৯.১ মাত্রার ভূমিকম্পের ফলে সৃষ্ট ঢেউ ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, ভারত ও থাইল্যান্ডসহ ১৪টি দেশে আঘাত হানে। কোথাও কোথাও ঢেউয়ের উচ্চতা প্রায় ৩০ মিটার পর্যন্ত পৌঁছায়। এতে ২ লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারান এবং অসংখ্য মানুষ বাস্তুচ্যুত হন।
এই বিপর্যয়ের পর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দুর্যোগ মোকাবিলার উদ্যোগ জোরদার হয়। ২০০৫ সালে জাপানের কোবে শহরে অনুষ্ঠিত বিশ্ব সম্মেলনে গৃহীত হয় ‘হিয়োগো কর্মপরিকল্পনা কাঠামো’। একই সময়ে ভারত মহাসাগরীয় সুনামি সতর্কীকরণ ও প্রশমন ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ভূকম্পন পরিমাপক ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে দ্রুত সতর্ক করার ব্যবস্থা তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে ২০১৫ সালে গৃহীত সেনদাই কাঠামো দুর্যোগের ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতি কমানোর বৈশ্বিক অঙ্গীকারকে আরও সুসংহত করে। জাতিসংঘের ‘আর্লি ওয়ার্নিংস ফর অল’ উদ্যোগের লক্ষ্যও হলো ঝুঁকিপূর্ণ প্রত্যেক মানুষের কাছে কার্যকর আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া।
বাংলাদেশের জন্যও সুনামির ঝুঁকি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বঙ্গোপসাগরীয় উপকূল ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের পাশাপাশি ভূমিকম্পজনিত সামুদ্রিক বিপর্যয়ের ঝুঁকিও বহন করে। বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৭৬২ সালের ২ এপ্রিল সংঘটিত মহান আরাকান ভূমিকম্প বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। চট্টগ্রাম থেকে মিয়ানমারের আরাকান উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে আঘাত হানা এ ভূমিকম্পের মাত্রা আনুমানিক ৮.৫ থেকে ৮.৮ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। এতে উপকূলীয় ভূপ্রকৃতিতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। সেন্ট মার্টিন দ্বীপে প্রায় দুই মিটার ভূমি উত্থানের প্রমাণও ভূতাত্ত্বিক গবেষণায় পাওয়া গেছে।
২০০৪ সালের ভারত মহাসাগরের সুনামির প্রভাব বাংলাদেশ উপকূলেও কিছুটা পড়েছিল বলে বিভিন্ন বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। তবে ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা ও ভারতের মতো ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ বাংলাদেশে হয়নি। বঙ্গোপসাগরের মহীসোপের গঠন, উৎপত্তিস্থল থেকে দূরত্ব এবং ভূমিকম্পের ফাটলের অভিমুখসহ বিভিন্ন ভৌগোলিক কারণ এতে ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যদিকে, জাপান প্রশান্ত মহাসাগরের ভূমিকম্পপ্রবণ ‘রিং অব ফায়ার’ অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় বিশ্বের অন্যতম সুনামিপ্রবণ দেশ হিসেবে পরিচিত।
সুনামি প্রতিরোধ করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে সচেতনতা, বিজ্ঞানভিত্তিক আগাম সতর্কবার্তা ও পরিকল্পিত প্রস্তুতির মাধ্যমে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ঝুঁকি মূল্যায়ন, আধুনিক পর্যবেক্ষণব্যবস্থা, নিরাপদ আশ্রয়স্থল, স্থানান্তরের পথ নির্ধারণ এবং নিয়মিত মহড়ার আয়োজন জরুরি। মনে রাখতে হবে, সুনামির বিপদে কয়েক মিনিটের সচেতনতা ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্তই অসংখ্য মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে। তাই সুনামি মোকাবিলার প্রস্তুতি কোনো এক দিনের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের ধারাবাহিক দায়িত্ব।









