শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩
শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩

শার্শায় জাল সনদে চাকরি, এক শিক্ষক কারাগারে, তিনজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬, ৭:৫৪ অপরাহ্ণ
শার্শায় জাল সনদে চাকরি, এক শিক্ষক কারাগারে, তিনজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

বাগআঁচড়া (শার্শা) প্রতিনিধি: যশোরের শার্শায় জাল সনদে চাকরি করা মামলায় আত্মসমর্পণকারী সহকারী শিক্ষক ইদ্রিস আলীকে কারাগারে পাঠিয়েছে আদালত। একই সাথে মামলার অপর দুই সহকারী শিক্ষক ও সাবেক চেয়ারম্যানসহ মোট তিনজন আসামীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

গত (৯ জুলাই) বৃহস্পতিবার যশোরের অতিরিক্ত চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আছাদুল ইসলাম শুনানি শেষে এ আদেশ দেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বাদীর আইনজীবী রুহিন বালুজ।

আসামিরা হলেন, সহকারী শিক্ষক ইদ্রিস আলী, তিনি ঝিকরগাছা উপজেলার পাঁচপোতা গ্রামের শুকুর আলীর ছেলে। সহকারী শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ, সহকারী শিক্ষিকা (কৃষি) সালেহা খাতুন, এবং কায়বা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান হাসান ফিরোজ আহম্মেদ টিংকু।

মামলা সূত্রে জানা যায়, যশোরের শার্শা উপজেলার ৭নং কায়বা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি হাসান ফিরোজ আহম্মেদ টিংকু চালতাবাড়িয়া আর ডি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি থাকাকালীন তার সহযোগিতায় সহকারী শিক্ষক পদে তিনজন চাকরি করার সুযোগ করে দেন।

তৎকালীন কায়বা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা রুহুল কুদ্দুস চেয়ারম্যান থাকাকালীন স্কুল পরিদর্শনে গিয়ে জাল সনদে তিনজন সহকারী শিক্ষক চাকরি করছেন বলে অভিযোগ পান। পরে উক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও কায়বা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি হাসান ফিরোজ আহমেদ টিংকুসহ ১০/১৫ জন অজ্ঞতনামা ব্যক্তি রুহুল কুদ্দুসের বাড়িতে গিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি না করতে খুন জখমের হুমকি ধামকি দেন বলে বাদী মামলার অভিযোগে উল্লেখ করেন।

গত ৫ আগস্ট বাংলাদেশের সরকার পরিবর্তনের পর সাবেক চেয়ারম্যান রুহুল কুদ্দুস বাদী হয়ে যশোর আদালতে মামলা দায়ের করেন। মামলা তদন্ত শেষে সিআইডি পুলিশ যশোরের এসআই বখতিয়ার রহমান ওই তিন শিক্ষকের সনদপত্র জাল ও সাবেক চেয়ারম্যানের সহযোগিতার প্রমাণ পাওয়ায় আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। প্রতিবেদনের উপর শুনানি শেষে বিচারক আসামিদের প্রতি সমন জারির আদেশ দিয়েছিলেন।

গত বৃহস্পতিবার মামলার ধার্য দিনে ইদ্রিস আলী আদালতে হাজির হয়ে জামিন আবেদন করেন। বিচারক জামিন আবেদনের শুনানি শেষে নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে আদালতে উপস্থিত না হওয়ায় অন্য তিন আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।

 

 

Ads small one

বর্ষার পানিতে ভাসে দুর্ভোগ, মুক্তি মিলবে কবে ?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬, ১১:২১ অপরাহ্ণ
বর্ষার পানিতে ভাসে দুর্ভোগ, মুক্তি মিলবে কবে ?

এম.এম হায়দার আলী

প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম এলেই দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও গ্রামীণ জনপদে একই চিত্র দেখা যায়। কয়েক ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতেই রাস্তা-ঘাট, বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বসতবাড়ি ও কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে যায়। সৃষ্টি হয় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চরমভাবে ব্যাহত হয় এবং অর্থনৈতিক কর্মকা-েও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

 

গত দুই দিনের প্রায় ১০ ঘণ্টা ভারী বর্ষন-ই তার বাস্তব প্রমাণ। ছয় ঋতুর এদেশে বর্ষা মৌসুমে বর্ষা হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু জলাবদ্ধতার অন্যতম প্রধান কারণ হলো অপরিকল্পিতভাবে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বাড়িঘর, সড়ক-মহাসড়ক ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ। অনেক ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক খাল, জলাধার, নালা ও পানি চলাচলের পথ ভরাট করে স্থাপনা গড়ে তোলা হচ্ছে। আবার নতুন সড়ক নির্মাণের সময় পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় সংখ্যক কালভার্ট নির্মাণ না করায় বৃষ্টির পানি স্বাভাবিকভাবে নিষ্কাশিত হতে পারে না। বহু পুরোনো কালভার্ট ভেঙে গেলেও বছরের পর বছর সংস্কার হয় না।

 

ড্রেনগুলো নিয়মিত পরিষ্কার না করায় ময়লা-আবর্জনায় ভরে গিয়ে পানি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে অল্প সময়ের বৃষ্টিতেই বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন কৃষক, সবজি চাষি ও মৎস্য চাষীরা। মাঠের সবজি কয়েক দিন পানির নিচে থাকলেই নষ্ট হয়ে যায়। মাছের ঘের ও পুকুর প্লাবিত হয়ে মাছ ভেসে যায় অথবা মারা যায়। এতে কৃষক ও মৎস্য চাষীদের লাখ লাখ টাকার ক্ষতি হয়।

 

অনেক পরিবার ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং নতুন করে উৎপাদনে ফিরতে হিমশিম খায়। অন্যদিকে কৃষিপণ্যের উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাজারে সবজি, মাছসহ নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের সরবরাহ কমে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বাজারদরে। সবজি ও মাছের দাম বেড়ে যায়, ফলে সীমিত আয়ের সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েন। অর্থাৎ জলাবদ্ধতার ক্ষতি শুধু কৃষকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এর প্রভাব পুরো বাজার ব্যবস্থা ও সাধারণ ভোক্তার জীবনেও পড়ে।

জলাবদ্ধতার কারণে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে যেতে পারে না, রোগীদের হাসপাতালে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, কর্মজীবীরা সময় মতো কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারেন না। রাস্তা-ঘাট দ্রুত নষ্ট হয়ে সরকারের কোটি কোটি টাকা পানিতে মিশে যায়। যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয় এবং জলাবদ্ধ পানিতে ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়। শুধু কি তাই, প্রত্যেক বছর বর্ষা মৌসুমে হাজার হাজার পরিবার তাদের বসতভিটা ফেলে বিবাহ যোগ্য মেয়েকে নিয়ে থাকতে হয় বিভিন্ন সাইক্লোন সেন্টার, স্কুল কলেজে ও উচু কোন সড়ক মহাসড়কের উপর খোলা আকাশের নিচে। তবে সমাধানের পথ হিসেবে,জলাবদ্ধতা নিরসনে স্বল্প মেয়াদি নয়, দীর্ঘ মেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। এজন্য, পরিকল্পিত নগরায়ণ ও অবকাঠামো নির্মাণ নিশ্চিত করতে হবে।

 

প্রাকৃতিক খাল, জলাধার ও পানি প্রবাহের পথ দখলমুক্ত করে পুনরুদ্ধার করতে হবে।সড়ক ও মহাসড়ক নির্মাণের সময় পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক কালভার্ট নির্মাণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। নষ্ট ও অকার্যকর কালভার্ট দ্রুত সংস্কার বা পুনর্র্নিমাণ করতে হবে। ড্রেন ও নালা নিয়মিত পরিষ্কার এবং রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। পানি চলাচলের পথ দখল ও অবৈধ ভরাটের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।

নতুন ভবন ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নির্মাণের আগে পরিবেশ সম্মত ড্রেনেজ পরিকল্পনা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি ও মৎস্য খাতের ক্ষতি গ্রস্থদের জন্য দ্রুত ক্ষতিপূরণ, সহজ শর্তে ঋণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

স্থানীয় সরকার, পানি উন্নয়ন বোর্ড, সড়ক বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। জলাবদ্ধতা কোনো অনিবার্য নিয়তি নয়; অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি অপরিকল্পিত উন্নয়ন, অবহেলা ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার ফল। পরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ, কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে প্রতি বর্ষায় মানুষের দুর্ভোগ, কৃষকের লোকসান এবং বাজারে মূল্যবৃদ্ধি সবই উল্লেখযোগ্য ভাবে কমানো সম্ভব। উন্নয়নের প্রকৃত লক্ষ্য তখনই সফল হবে, যখন সেই উন্নয়ন মানুষের জীবনকে নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক এবং টেকসই করবে। লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

 

 

জনসংখ্যাকে নতুন চোখে দেখার সময় এসেছে

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬, ১১:১৫ অপরাহ্ণ
জনসংখ্যাকে নতুন চোখে দেখার সময় এসেছে

আখলাকুর রহমান

সাতক্ষীরার একটি শিশু জন্মায় ঠিক ততটাই সম্ভাবনা নিয়ে, যতটা নিয়ে জন্মায় ঢাকা কিংবা টোকিওর কোনো শিশু। তফাৎ শুধু সুযোগে।

আজ ১১ জুলাই, বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস। প্রতি বছর এই দিনে আমরা একটি সংখ্যার দিকে তাকাই, পৃথিবীতে মানুষ কত বাড়ল, বাংলাদেশে কত বাড়ল, সাতক্ষীরায় কত বাড়ল। খবরের কাগজে ছাপা হয় গ্রাফ আর পরিসংখ্যান, সেমিনারে পঠিত হয় প্রবন্ধ, তারপর দিনটি চলে যায় আরেকটি সাধারণ দিনের মতো। কিন্তু সত্যি বলতে, জনসংখ্যা কোনো সমস্যা নয়; সমস্যা হলো আমরা সেই জনসংখ্যাকে কতটা সম্পদে রূপান্তর করতে পারছি, তার হিসাব না রাখা।

দীর্ঘদিন ধরে আমাদের সমাজে একটি ভয় গেঁথে আছে যে মানুষ বাড়লেই নাকি সংকট বাড়ে। খাদ্য কমে যাবে, জমি কমে যাবে, বেকারত্ব বাড়বে, রাস্তায় মানুষের ভিড়ে শ্বাস নেওয়াই দায় হয়ে যাবে। এই ধারণা এসেছে এক শতাব্দী আগের চিন্তা থেকে, যখন প্রযুক্তি বা উৎপাদনশীলতার আজকের অগ্রগতি কারো কল্পনাতেও ছিল না। অথচ বাস্তবতা হলো, পৃথিবীর যে দেশগুলো আজ সবচেয়ে সমৃদ্ধ, তাদের অনেকেই একসময় ঘন জনবসতিপূর্ণ ছিল। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা নেদারল্যান্ডসের মতো দেশ প্রমাণ করেছে, ঘনবসতি কোনো অভিশাপ নয়, বরং সঠিক পরিকল্পনা থাকলে সেটাই হয়ে ওঠে অগ্রগতির চালিকাশক্তি। তাই বলা যায়, জনসংখ্যা সমস্যা নয়, বরং অব্যবস্থাপনা আর সুযোগের অভাবই আসল সংকট।

সাতক্ষীরার দিকে তাকালে বিষয়টা আরও স্পষ্ট হয়। উপকূলীয় এই জেলা জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা এলাকাগুলোর একটি। নদীভাঙন, লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড়ের পুনরাবৃত্তি এখানকার মানুষের জীবনযাত্রার নিত্যসঙ্গী। এমন এক পরিবেশে প্রতি বছর অসংখ্য তরুণ তরুণী কর্মক্ষম বয়সে পা রাখছে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি তাদের জন্য দক্ষতা তৈরির সুযোগ, শিক্ষা আর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারছি? নাকি শুধু সংখ্যা গোনায় ব্যস্ত থেকে প্রকৃত সম্ভাবনাকে হারিয়ে ফেলছি? একজন তরুণ যদি সঠিক প্রশিক্ষণ না পায়, তাহলে সেই একই তরুণ যে দেশের সম্পদ হতে পারত, সে হয়ে ওঠে বেকারত্বের পরিসংখ্যানের আরেকটি সংখ্যা মাত্র।

জনসংখ্যা দিবসের প্রকৃত বার্তা আসলে দুটি জায়গায়। একটি হলো নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার, অন্যটি পরিবার পরিকল্পনায় সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা। এটি কোনো জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণের কথা বলে না; বরং প্রতিটি মানুষকে তার নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলে। সাতক্ষীরার মতো জেলায়, যেখানে বাল্যবিবাহের হার এখনো উদ্বেগজনক, সেখানে এই বার্তা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একটি মেয়ে যখন আঠারো বছর বয়সের আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে বাধ্য হয়, তখন তার শিক্ষা থমকে যায়, স্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়ে, আর পরবর্তী প্রজন্মের জন্যও একই দারিদ্র্যের চক্র তৈরি হয়। একজন কিশোরী মেয়ে যখন শিক্ষা শেষ করে, নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবার সুযোগ পায়, তখনই প্রকৃত অর্থে জনসংখ্যা ‘নিয়ন্ত্রণ’ হয়, জোর করে নয়, সচেতনতা দিয়ে।

আমাদের চিন্তার ধরন বদলাতে হবে। জনসংখ্যাকে বোঝা না ভেবে বিনিয়োগের ক্ষেত্র হিসেবে দেখতে হবে। একটি তরুণ জনগোষ্ঠী সঠিক প্রশিক্ষণ পেলে দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হতে পারে। সাতক্ষীরার মৎস্য চাষ, কৃষি আর ক্ষুদ্র ব্যবসায় যদি আধুনিক প্রযুক্তি আর দক্ষতা যুক্ত করা যায়, তাহলে এই জনসংখ্যাই হয়ে উঠতে পারে জেলার সবচেয়ে বড় শক্তি। চিংড়ি চাষের সঙ্গে যুক্ত হাজারো পরিবার, ছোট ছোট কুটির শিল্প, হস্তশিল্প কিংবা তথ্যপ্রযুক্তি ভিত্তিক ফ্রিল্যান্স কাজ, সবকিছুতেই দরকার একটু সঠিক দিকনির্দেশনা আর বিনিয়োগ। তরুণদের হাতে দক্ষতা থাকলে তারা শুধু নিজেদের নয়, পুরো পরিবার আর সমাজের ভাগ্যও বদলে দিতে পারে।

স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত এই দিনটিকে শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দেওয়া। ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা, স্কুলগুলোতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো, আর বাল্যবিবাহ রোধে সামাজিক আন্দোলন জোরদার করা, এসবই এখন সময়ের দাবি। শুধু সরকারি উদ্যোগেই এই কাজ সম্ভব নয়, স্থানীয় সাংবাদিক, শিক্ষক, ইমাম, পুরোহিত, সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষকেই এগিয়ে আসতে হবে। কারণ সচেতনতা তৈরি হয় প্রতিদিনের কথোপকথনে, একটি বক্তৃতায় নয়।

গণমাধ্যমের ভূমিকাও এখানে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সাতক্ষীরার মতো জেলার স্থানীয় পত্রিকাগুলো যদি প্রতিনিয়ত এই বিষয়গুলো নিয়ে লেখালেখি করে, গল্প বলে, বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরে, তাহলে মানুষের মানসিকতায় পরিবর্তন আসবে ধীরে হলেও স্থায়ীভাবে। একটি সফল উদ্যোক্তার গল্প, একটি মেয়ের বাল্যবিবাহ ঠেকিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার গল্প, এসব গল্পই পারে মানুষের চিন্তাভাবনাকে বদলে দিতে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা এখানেই দাঁড়ায়, আমরা কি জনসংখ্যাকে ভয় পাব, নাকি তাকে সম্ভাবনায় রূপান্তরের পথ খুঁজব? সাতক্ষীরার প্রতিটি নবজাতক একটি নতুন সম্ভাবনা নিয়ে আসে, একটি নতুন গল্পের শুরু নিয়ে আসে। আমাদের দায়িত্ব সেই সম্ভাবনাকে সঠিক পথে পরিচালিত করা, সংখ্যা কমানো নয়, সক্ষমতা বাড়ানো। এই বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসে আসুন, আমরা ভয়ের চশমা খুলে সম্ভাবনার চশমা পরি, আর প্রতিজ্ঞা করি, প্রতিটি মানুষকে শুধু সংখ্যা নয়, সম্পদ হিসেবে দেখব।

লেখক : উদ্যোক্তা ও স্বপ্নদ্রষ্টা : আসিফা

 

 

 

মুক্তমত: জলাবদ্ধতার নগরীতে পরিণত হচ্ছে সাতক্ষীরা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬, ১১:০৭ অপরাহ্ণ
মুক্তমত: জলাবদ্ধতার নগরীতে পরিণত হচ্ছে সাতক্ষীরা

গাজী হাবিব

শেষ আষাঢ়ে বৃষ্টিপাত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১০টা থেকে শুরু। কখনও মুষলধারে, কখনও টিপটিপ, আবার কখনও ইলিশেগুঁড়ি বৃষ্টিতে টানা প্রায় দেড় দিনের বেশি সময় ভিজেছে সাতক্ষীরা। প্রকৃতির এই বর্ষণ নতুন কিছু নয়। বর্ষাকালে বৃষ্টি হবেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো- প্রতিবার বৃষ্টির পর কেন সাতক্ষীরা শহর যেন ছোট ছোট জলাশয়ে পরিণত হয়? কেন সরকারি অফিস, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সড়ক এমনকি মানুষের বসতবাড়িও পানির নিচে চলে যায়?

শুক্রবার বেলা ১১টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় সাতক্ষীরায় ২২৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে স্থানীয় আবহাওয়া অফিস। এটি নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃষ্টি। কিন্তু শুধুমাত্র বৃষ্টিপাতকে দায়ী করলে বাস্তবতার বড় অংশ আড়াল করা হবে। কারণ প্রকৃত সমস্যা হচ্ছে- পানি দ্রুত নিষ্কাশনের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই।

শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ মাঠ, সদর হাসপাতাল চত্বর, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আঙিনা পানিতে ডুবে গেছে। সরকারি কলেজ-মাছখোলা সড়কে হাঁটুসমান পানি জমে থাকায় শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, রোগী ও সাধারণ মানুষের চলাচল চরমভাবে ব্যাহত হয়েছে। বহু বাড়ির উঠান, টয়লেট ও নলকূপ পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও রান্নাঘর পর্যন্ত পানিতে ডুবে যাওয়ায় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন দিনমজুর, রিকশাচালক, ভ্যানচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও নি¤œ আয়ের মানুষ। বৃষ্টির কারণে মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছে না। ফলে শ্রমজীবী মানুষের আয় প্রায় বন্ধ। অনেকেই বলছেন, “আজ কাজ নেই, আয় নেই; সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।”

অন্যদিকে কৃষকদের অবস্থাও সুখকর নয়। নি¤œাঞ্চলের ফসলের জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক ক্ষেতেই সবজি ও আমনের বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হলে কৃষির ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব আরও বাড়বে।

শুধু ব্যক্তিগত ভোগান্তিই নয়, জনস্বাস্থ্যও এখন বড় ঝুঁকির মুখে। সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল চত্বরে পানি জমে থাকায় রোগীদের যাতায়াত কষ্টকর হয়ে উঠেছে। নোংরা পানি জমে থাকায় ডেঙ্গু, ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

জলাবদ্ধতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মধ্যে রয়েছে রসুলপুর, কাটিয়া, সুলতানপুর, ইটাগাছা, গদাইবিল, রাজারবাগান, ডাইয়ের বিল, কামালনগর, মাছখোলা এবং শহরের আরও কয়েকটি নি¤œাঞ্চল। এসব এলাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে যায়। স্থানীয়দের ভাষায়, বর্ষা এলেই মনে হয় আমরা শহরে নয়, জলাবদ্ধতার মধ্যে বসবাস করছি।
প্রশ্ন উঠছে- প্রতিবছর একই চিত্র কেন?

স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পৌর এলাকার ভেতরে ও আশপাশে গড়ে ওঠা অপরিকল্পিত মাছের ঘের, সংকুচিত ও দখল হয়ে যাওয়া খাল, দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার না করার কারণেই পানি নামতে পারছে না। বছরের পর বছর ধরে খাল-নালা ভরাট হয়েছে, কোথাও অবৈধ স্থাপনা হয়েছে, কোথাও ময়লা-আবর্জনায় পানি চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে সামান্য অতিবৃষ্টিতেই পুরো শহর অচল হয়ে পড়ে।

বাস্তবতা হলো, সাতক্ষীরা একটি নি¤œভূমির জেলা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এখানকার বৃষ্টিপাতের ধরনও বদলাচ্ছে। স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনা। তাই পুরোনো ড্রেনেজ ব্যবস্থা দিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। অথচ শহর সম্প্রসারণ হয়েছে, নতুন নতুন ভবন তৈরি হয়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে ড্রেন, খাল কিংবা পানি নিষ্কাশনের অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি।

দুঃখজনক হলেও সত্য, জলাবদ্ধতা নিরসনের নামে বিভিন্ন সময়ে প্রকল্প নেওয়া হলেও দীর্ঘমেয়াদি সুফল খুব একটা চোখে পড়ে না। বরং পৌরবাসীদের অভিযোগ, প্রকল্পের কাজের মান, তদারকি এবং রক্ষণাবেক্ষণে নানা ধরনের অনিয়ম রয়েছে। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পরও যদি প্রতিবছর একই দুর্ভোগে মানুষকে পড়তে হয়, তাহলে প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।

সাতক্ষীরা আবহাওয়া কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জুলফিকার আলী রিপন জানিয়েছেন, শুক্রবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় ২২৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আগামী কয়েকদিনও বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে।

অন্যদিকে সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অর্নব দত্ত জানিয়েছেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল খননের কাজ চলছে। পাশাপাশি শহরের স্লুইস গেট খুলে দেওয়া হবে এবং বিভিন্ন ড্রেন সচল করে প্রাণসায়ের খালের সঙ্গে সংযুক্ত করা হচ্ছে। এসব কার্যক্রম শেষ হলে জলাবদ্ধতা অনেকাংশে কমে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।

এই উদ্যোগ অবশ্যই ইতিবাচক। তবে প্রশ্ন হলো- এগুলো কি কেবল সাময়িক সমাধান, নাকি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ? কারণ নাগরিকরা প্রতি বর্ষায় একই আশ্বাস শুনতে শুনতে ক্লান্ত।

জলাবদ্ধতা এখন সাতক্ষীরায় পৌর ব্যবস্থাপনার সক্ষমতার একটি পরীক্ষাও বটে। প্রয়োজন একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান। শহরের সব খাল উদ্ধার, ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক আধুনিকীকরণ, নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, পানি প্রবাহের স্বাভাবিক পথ ফিরিয়ে আনা এবং ভবিষ্যৎ নগরায়ণকে পরিকল্পনার আওতায় আনা ছাড়া এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

প্রকৃতিকে দোষ দিয়ে দায় এড়ানো সহজ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রকৃতি তার নিয়মেই চলছে; আমাদের নগর ব্যবস্থাপনাই সেই বাস্তবতার সঙ্গে তাল মেলাতে ব্যর্থ হচ্ছে। সাতক্ষীরার মানুষ আর আশ্বাস নয়, টেকসই সমাধান চায়। তারা এমন একটি পরিচ্ছন্ন শহর চায়, যেখানে বর্ষা আনন্দের বার্তা বয়ে আনবে- দুর্ভোগের নয়। লেখক: সাংবাদিক, সমাজকর্মী