সম্পাদকীয়/ ইটভাটার টানে উপকূলের শ্রমজীবী মানুষ: দরকার স্থানীয় কর্মসংস্থান
উপকূলীয় জনপদগুলোতে কাজের সংকট ও আকাশছোঁয়া নিত্যপণ্যের বাজারে টিকতে না পেরে প্রতি বছরই হাজারো শ্রমজীবী মানুষ ভিটেমাটি ছেড়ে দূরদূরান্তে পাড়ি জমাচ্ছেন। পাইকগাছা কিংবা সাতক্ষীরার উপকূলীয় ইউনিয়নগুলোতে বর্ষার শেষেই চোখে পড়ে এই বিষাদময় অভিবাসনের ছবি। কৃষি কাজ শেষ হওয়ার পরপরই জীবিকার তাগিদে পুরো পরিবার নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ইটভাটাগুলোতে গিয়ে ওঠার এ চিত্র কেবল এক উপজেলার নয়, বরং গোটা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এক নির্মম বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে আসে।
দাদন কিংবা অগ্রিম পারিশ্রমিকের সুদে-আসলে বাঁধা এ জীবন সহজ নয়। ভোর থেকে দুপুর এবং রাতভর দীর্ঘ দুই শিফটের হাড়ভাঙা খাটুনি, ধোঁয়া-ধুলার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং টিনের ঝুপড়ি ঘরে পশুর মতো দিনযাপন—এই রূপেই কাটে ইটভাটার শ্রমিকদের মাসগুলো। আরও মর্মান্তিক হলো, জীবনসংগ্রামে আয়ের পাল্লা ভারী করতে শ্রমজীবী মা-বাবারা সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছেন শিশুসন্তানদেরও। ফলে একদিকে যেমন চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে শ্রমিকের শরীর, অন্যদিকে বিদ্যালয়ের মুখ না দেখে অকালেই শিক্ষা থেকে ছিটকে পড়ছে এক সম্ভাবনাময় প্রজন্ম।
সাতক্ষীরাও এ বাস্তবতা থেকে মোটেই বিচ্ছিন্ন নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা, বারংবার প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কৃষি জমিতে লবণাক্ততার বিস্তার এবং শুষ্ক মৌসুমে স্থায়ী কর্মসংস্থানের অভাবের কারণে এ অঞ্চলের মানুষকে বাধ্য হয়েই বছরের একটা নির্দিষ্ট সময় ঘর ছাড়তে হয়। যদি স্থানীয় পর্যায়ে কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র শিল্প গড়ে তোলা যেত, নদী-খাল পুনখননের মতো সরকারি টিআর বা কাবিখা (কাজের বিনিময়ে খাদ্য) কর্মসূচিগুলোকে এই শুষ্ক মৌসুমে সমন্বিত ও বেগবান করা সম্ভব হতো, তবে হাজারো পরিবারকে এভাবে ভিটামাটি ছেড়ে যাযাবরের জীবন বেছে নিতে হতো না।
উন্নয়নের মহাসড়কে উপকূলের এই নিম্নআয়ের মানুষদের পেছনে ফেলে রাখা কোনোভাবেই কাম্য নয়। শ্রমজীবী মানুষদের জীবনের নিরাপত্তা, সন্তানদের নিয়মিত শিক্ষা এবং উপকূলীয় অঞ্চলে কাজের সুযোগ তৈরি করা জরুরি। স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সরকারের নীতিনির্ধারকদের উচিত দ্রুত এ বিষয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া—যাতে বেঁচে থাকার তাগিদে উপকূলের মানুষকে আর দূরদূরান্তে কঠিন প্রবাস জীবনযাপন করতে না হয়।









