বিশ্ব বামনত্ব সচেতনতা দিবস: বামনরাও সমমর্যাদার মানুষ
সাকিবুর রহমান বাবলা
২৫ অক্টোবর বিশ্ব বামনত্ব সচেতনতা দিবস। বামনত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি, খর্বাকৃতির মানুষের অধিকার রক্ষা এবং সমাজে তাঁদের মর্যাদা ও অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করাই এ দিবসের মূল লক্ষ্য। শারীরিক উচ্চতা কখনোই মানুষের মেধা, যোগ্যতা কিংবা মানবিক মূল্যবোধের মাপকাঠি হতে পারে না। অথচ ভুল ধারণা, উপহাস ও বৈষম্যের কারণে খর্বাকৃতির অনেক মানুষকে প্রতিনিয়ত সামাজিক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়।
দিবসটির সূচনা হয় ২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংগঠন ‘লিটল পিপল অব আমেরিকা’র উদ্যোগে। ১৯২৪ সালের ২৫ অক্টোবর জন্মগ্রহণকারী খর্বাকৃতির মার্কিন অভিনেতা বিলি বার্টির স্মরণে দিনটি বেছে নেওয়া হয়। ১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত তাঁর সংগঠনটি খর্বাকৃতির মানুষের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে বামনত্ব বলতে সাধারণত প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের উচ্চতা ৪ ফুট ১০ ইঞ্চি বা ১৪৭ সেন্টিমিটার কিংবা তার কম হওয়ার অবস্থাকে বোঝায়। এর অন্যতম পরিচিত কারণ অ্যাকোন্ড্রোপ্লাসিয়া, যা জিনগত পরিবর্তনের ফলে ঘটে। এ ছাড়া হরমোনের ঘাটতি, কিছু দীর্ঘস্থায়ী রোগ ও পুষ্টিহীনতার কারণেও শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। তাই শিশুর বৃদ্ধির হার অস্বাভাবিক মনে হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
বামনত্বের বিভিন্ন ধরন ও সংশ্লিষ্ট জটিলতা মোকাবিলায় আধুনিক চিকিৎসায় অগ্রগতি হয়েছে। হরমোনের ঘাটতি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে হরমোন প্রতিস্থাপন করা হয়। অ্যাকোন্ড্রোপ্লাসিয়ায় আক্রান্ত নির্দিষ্ট বয়সের শিশুদের জন্যও বিশেষ ওষুধ রয়েছে, যা হাড়ের বৃদ্ধিতে সহায়তা করতে পারে। রোগের ধরন অনুযায়ী ফিজিওথেরাপি, অস্ত্রোপচার ও অন্যান্য চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। তবে চিকিৎসার ধরন ও প্রাপ্যতা রোগীর অবস্থা এবং দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
এ দিবসের অন্যতম তাৎপর্য হলো খর্বাকৃতির মানুষের জন্য সমান অধিকার ও সুযোগ নিশ্চিত করা। শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে তাঁদের যোগ্যতা ও দক্ষতাকে প্রাধান্য দিতে হবে। পাশাপাশি বিদ্যালয়, কর্মক্ষেত্র, গণপরিবহন ও সরকারি স্থাপনায় তাঁদের উপযোগী অবকাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি। উপহাস, বুলিং ও বৈষম্য বন্ধে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে আরও সচেতন হতে হবে।
বাংলাদেশে ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩’-এর আওতায় বামনত্বের কারণে প্রতিবন্ধিতার স্বীকৃতিযোগ্য অবস্থা থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচিত হয়। তাঁদের জন্য চিকিৎসাসেবা, উপযোগী পরিবেশ, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বামনত্ব কোনো অভিশাপ নয়, এটি একটি শারীরিক অবস্থা। খর্বাকৃতির মানুষ করুণা বা দয়ার পাত্র নন; তাঁরা সমান অধিকার ও মর্যাদার অধিকারী। শারীরিক উচ্চতা নয়, মানুষের মেধা, যোগ্যতা ও মানবিকতাই হোক মূল্যায়নের প্রকৃত মানদণ্ড। বিশ্ব বামনত্ব সচেতনতা দিবসে বৈষম্যহীন ও মানবিক সমাজ গড়ার অঙ্গীকার হোক সবার।









