আন্তর্জাতিক সংসদীয় দিবস: গণতন্ত্রের প্রাণকেন্দ্র ও জনগণের কণ্ঠস্বর
সাকিবুর রহমান বাবলা
৩০ জুন বিশ্বব্যাপী পালিত হয় আন্তর্জাতিক সংসদীয় দিবস (International Day of Parliamentarism)। ২০১৮ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ৭২/২৭৮ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে দিবসটির স্বীকৃতি দেয়। ১৮৮৯ সালের এই দিনে প্রতিষ্ঠিত হয় Inter-Parliamentary Union, যা আজ বিশ্বের জাতীয় সংসদগুলোর বৃহত্তম আন্তর্জাতিক সংগঠন। বর্তমানে আইপিইউ’র সদস্য ১৮৩টি জাতীয় সংসদ, যা বিশ্বের অধিকাংশ জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে।
সংসদ গণতন্ত্রের প্রাণকেন্দ্র। জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা এখানে আইন প্রণয়ন, সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং জাতীয় নীতিনির্ধারণ করেন। জাতিসংঘের মতে; ঐক্যবদ্ধ, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও প্রতিনিধিত্বশীল সংসদ গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখার অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
বিশ্বে অধিকাংশ দেশেই কোনো না কোনো ধরনের সংসদীয় বা প্রতিনিধিত্বমূলক আইনসভা রয়েছে। তবে সব দেশ সমানভাবে গণতান্ত্রিক চর্চা নেই; কোথাও সংসদ কার্যকর, কোথাও তা সীমিত ক্ষমতাসম্পন্ন, এরমধ্যে হাতে গোনা দু-একটি দেশে গণতন্ত্র শুন্য হলেও সংসদ গঠন করা হয়। তবুও জনগণের মতামতকে রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে সংসদীয় ব্যবস্থা আজও সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক কাঠামো হিসেবে বিবেচিত।
আন্তর্জাতিক সংসদীয় দিবসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিপাদ্য হলো সংসদে নারী ও তরুণদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি। বিশ্বব্যাপী নারীদের প্রতিনিধিত্ব আগের তুলনায় বাড়লেও এখনো তা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। একইভাবে তরুণ জনগোষ্ঠী বিশ্বের মোট জনসংখ্যার বড় অংশ হলেও অধিকাংশ দেশের সংসদে তাদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম। অথচ বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন, আধুনিক প্রযুক্তি, কর্মসংস্থান ও শিক্ষা সম্পর্কিত ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে তরুণ প্রজন্মের ওপর। তাই সংসদে তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ানো শুধু প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন নয়, ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র গঠনেরও অপরিহার্য শর্ত।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিষয়টি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। জাতীয় সংসদ দেশের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণতন্ত্রের ভিত্তিকে শক্তিশালী করার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে। সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর কার্যকারিতা বৃদ্ধি, গঠনমূলক বিতর্কের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা, তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তৃত ব্যবহার এবং নাগরিক সম্পৃক্ততা বাড়ানোর মাধ্যমে সংসদকে আরও কার্যকর করা সম্ভব।
সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রধান সুফল হলো জনগণের অংশগ্রহণ, ক্ষমতার ভারসাম্য, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং শান্তিপূর্ণভাবে নেতৃত্ব পরিবর্তনের সুযোগ। তবে দলীয়করণ, রাজনৈতিক অচলাবস্থা, দুর্নীতি বা প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি এর কিছু চ্যালেঞ্জ। ইসলামের শূরা বা পরামর্শভিত্তিক শাসনব্যবস্থার সঙ্গে আধুনিক সংসদীয় গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ মিল হলোÑজনস্বার্থে আলোচনা, মতবিনিময় ও সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের নীতি।
বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর সংবিধানে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। জাতীয় সংসদ দেশের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর দায়িত্ব পালন করে।
প্রতি বছর আন্তর্জাতিক সংসদীয় দিবস নাগরিকদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন নয়; এটি অংশগ্রহণ, জবাবদিহি, অন্তর্ভুক্তি এবং জনগণের কণ্ঠস্বরকে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত করার একটি চলমান প্রক্রিয়া। তরুণ ও নারীদের অধিক অংশগ্রহণ, প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক সংসদ এবং মানবাধিকারের প্রতি অঙ্গীকার-ই ভবিষ্যতের সংসদীয় গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করে তুলবে।












