সাকিবুর রহমান বাবলা
পরিবার মানবসমাজের আদি প্রতিষ্ঠান। আর এই সামাজিক প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি রচিত হয় বিবাহ বন্ধনের মাধ্যমে। বিবাহ কেবল দুই ব্যক্তির একত্রে বসবাসের বিষয় নয়; এটি পারস্পরিক দায়িত্ব, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটি সামাজিক ও নৈতিক বন্ধন। তাই সন্তানকে বিবাহ-উপযুক্ত করে গড়ে তোলা অভিভাবকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, যা শুধু আর্থিক প্রস্তুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং নৈতিক, মানসিক, সামাজিক ও মানবিক বিকাশের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
বর্তমান সমাজে আর্থিক ও শিক্ষার প্রসার ঘটলেও পারিবারিক মূল্যবোধ, সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও দায়িত্বশীলতার চর্চা অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে পড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে দাম্পত্য জীবনেও। অল্প সময়ের মধ্যে পারিবারিক কলহ, বিচ্ছেদ, পারস্পরিক অবিশ্বাস ও সামাজিক অস্থিরতার ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব সমস্যার একটি বড় কারণ হলো বিবাহের পূর্বে যথাযথ মানসিক ও সামাজিক প্রস্তুতির অভাব।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিবাহ একটি পবিত্র ও মর্যাদাপূর্ণ বন্ধন। পবিত্র কুরআনে দাম্পত্য জীবনকে শান্তি, ভালোবাসা ও মমতার ক্ষেত্র হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ইসলাম মানুষকে দায়িত্বশীল, চরিত্রবান ও নৈতিকতাসম্পন্ন হওয়ার শিক্ষা দেয়, যা একটি সফল বৈবাহিক জীবনের মৌলিক শর্ত। একইভাবে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ বিশ্বের অন্যান্য ধর্মেও বিবাহকে একটি দায়িত্বপূর্ণ সামাজিক ও আধ্যাত্মিক সম্পর্ক হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। সব ধর্মের মূল শিক্ষা হলো—মানুষকে মানবিক, ন্যায়পরায়ণ ও কর্তব্যপরায়ণ করে গড়ে তোলা।
সন্তানকে বিবাহ-উপযুক্ত করার ক্ষেত্রে অভিভাবকের প্রথম কাজ হলো চরিত্র গঠন। কেবল ডিগ্রি অর্জন বা চাকরি পাওয়া একজন মানুষকে পরিপূর্ণ করে না। সততা, আত্মসম্মানবোধ, সহনশীলতা, শৃঙ্খলা, পারিবারিক দায়িত্ববোধ এবং অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাÑএসব গুণই একজন মানুষকে প্রকৃত অর্থে পরিণত করে। যে সন্তান ছোটবেলা থেকেই পরিবারে মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা পায়, সে ভবিষ্যতে একজন দায়িত্বশীল জীবনসঙ্গী ও সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
একই সঙ্গে সন্তানকে আত্মনির্ভরশীল করে তোলা অত্যন্ত জরুরি। পরমুখাপেক্ষী মানসিকতা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর। আত্মনির্ভরশীলতা কেবল অর্থ উপার্জনের সক্ষমতা নয়; বরং নিজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সমস্যা মোকাবিলা এবং জীবনের দায়িত্ব গ্রহণের সক্ষমতাও এর অন্তর্ভুক্ত। যে ব্যক্তি নিজের জীবনের দায়িত্ব নিতে শেখে, সে পারিবারিক জীবনেও অধিক সফল হয়।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—বিবাহের জন্য কেবল বয়স যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন মানসিক পরিপক্বতা। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সামাজিক চাপ, পারিবারিক প্রত্যাশা বা প্রচলিত রীতিনীতির কারণে যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়াই সন্তানদের বিবাহ দেওয়া হয়। এর ফলে পরবর্তী জীবনে নানা ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হয়। তাই অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের সঙ্গে আলোচনা করা, পারিবারিক জীবন সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান প্রদান করা এবং তাদের আবেগীয় ও সামাজিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সময় দেওয়া।
বাংলাদেশের প্রচলিত আইনও বিবাহের ক্ষেত্রে পরিপক্বতা ও দায়িত্ববোধকে গুরুত্ব দিয়েছে। শিশুবিবাহ প্রতিরোধ এবং বিবাহের ন্যূনতম বয়স নির্ধারণের মাধ্যমে রাষ্ট্র একটি সুস্থ ও নিরাপদ পারিবারিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়েছে। আইন কেবল শাস্তির বিষয় নয়; এটি সমাজের কল্যাণ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষার জন্য প্রণীত একটি সামাজিক অঙ্গীকার। তাই ধর্মীয় মূল্যবোধের পাশাপাশি আইন সম্পর্কে সচেতনতা ও শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তোলাও অভিভাবকদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
বর্তমান সময়ে সন্তানদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন অভিভাবকের সময় ও সঠিক দিকনির্দেশনা। প্রযুক্তিনির্ভর ব্যস্ত জীবনে অনেক পরিবারে পারস্পরিক যোগাযোগ কমে যাচ্ছে। অথচ সন্তানদের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা, তাদের মানসিক অবস্থা বোঝা, নৈতিক শিক্ষা প্রদান এবং বাস্তব জীবন সম্পর্কে সচেতন করে তোলাই তাদের ভবিষ্যৎ জীবনকে অধিক সুন্দর ও স্থিতিশীল করতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, সন্তানকে বিবাহ-উপযুক্ত করে গড়ে তোলা কোনো একক ঘটনার বিষয় নয়; এটি একটি দীর্ঘজীবনমেয়াদি পারিবারিক ও সামাজিক প্রক্রিয়া। ধর্মীয় নির্দেশনা, মানবিক মূল্যবোধ এবং দেশের প্রচলিত আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে সন্তানদের এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা শুধু একজন ভালো জীবনসঙ্গী নয়, বরং একজন দায়িত্বশীল মানুষ, সচেতন সুনাগরিক এবং মানবিক সমাজ নির্মাণের অংশীদার হতে পারে। একটি সুন্দর পরিবার থেকেই একটি সুন্দর সমাজের জন্ম হয়, আর সেই সুন্দর পরিবারের ভিত্তি নির্মাণের দায়িত্ব শুরু হয় সচেতন অভিভাবকের হাত ধরেই।