কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা: সৌভাগ্যের আরাধনা
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
দুর্গাপূজার ঢাক থেমেছে, প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে উৎসবের উচ্ছ্বাস। বিদায়ের বিষাদ কাটতে না কাটতেই বাঙালির ঘরে ঘরে আসে আরেক উৎসব—কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা। অন্ন, সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধির প্রতীক দেবী লক্ষ্মীর আরাধনায় জ্বলে ওঠে প্রদীপ, উঠানে আঁকা হয় আলপনা। তবে লক্ষ্মী কি কেবল ধনসম্পদের দেবী? যে সমাজে কৃষক ফসলের ন্যায্য দাম পান না, শ্রমজীবী মানুষ সংসার চালাতে হিমশিম খান, সেখানে লক্ষ্মী আরাধনার প্রকৃত তাৎপর্য কোথায়? এই প্রশ্ন সামনে রেখেই ফিরে আসে কোজাগরী পূর্ণিমা।
আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে পালিত হয় কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা। ‘কোজাগরী’ শব্দের অর্থ ‘কে জেগে আছ?’ প্রচলিত হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এ রাতে দেবী লক্ষ্মী মর্ত্যে নেমে ভক্তদের খোঁজ নেন। যাঁরা জেগে থেকে তাঁর আরাধনা করেন, তাঁদের গৃহে দেবীর আশীর্বাদ আসে বলে বিশ্বাস করা হয়। ধন, সম্পদ, সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধির প্রতীক দেবী লক্ষ্মীর পূজা বাংলার বহু পরিবারে প্রতি বৃহস্পতিবারও করা হয়।
দুর্গাপূজা যেখানে সর্বজনীন উৎসবের আবহে মানুষকে একত্র করে, সেখানে লক্ষ্মীপূজার প্রধান আয়োজন হয় ঘরে ঘরে। পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে পূজার প্রস্তুতি নেন, আলপনা আঁকেন, প্রদীপ জ্বালান এবং ভোগ নিবেদন করেন। অঞ্চল ও পারিবারিক রীতিভেদে খিচুড়ি, লুচি, পায়েস, নারকেলের নাড়ু, ফলমূল ও নানা মিষ্টির আয়োজন করা হয়। এসব আচার শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রকাশ নয়; পারিবারিক বন্ধন ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধরে রাখারও মাধ্যম।
দেবী লক্ষ্মীর সঙ্গে বাংলার কৃষিজীবনের সম্পর্ক গভীর। প্রাচীন বাংলার অর্থনীতি ছিল কৃষিনির্ভর। ধান ও খাদ্যশস্য ছিল মানুষের জীবন ও জীবিকার প্রধান অবলম্বন। তাই গোলাভরা ধানকে সচ্ছলতা ও নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে দেখা হতো। লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ, ধানের শিষ ও শস্যের ছবি দিয়ে আলপনা আঁকার রীতিতেও সেই ঐতিহ্যের প্রতিফলন রয়েছে। কোথাও মাটির সরা বা পটচিত্রে দেবীর প্রতীক স্থাপন করা হয়, আবার কোথাও সপ্ততরী সাজিয়ে পূজার আয়োজন করা হয়। এসব লোকজ উপকরণ বাংলার শিল্প, কৃষি ও সংস্কৃতির সঙ্গে ধর্মীয় বিশ্বাসের নিবিড় সম্পর্ক তুলে ধরে।
দেবী লক্ষ্মীর বাহন পেঁচাও প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের প্রতীক। পেঁচা ইঁদুর খেয়ে শস্যের ক্ষতি কমাতে সাহায্য করে। কৃষিজীবনের এই বাস্তব অভিজ্ঞতা ধর্মীয় কল্পনার সঙ্গে মিশে পেঁচাকে দেবীর বাহন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এর মধ্য দিয়ে প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবনযাত্রার পারস্পরিক নির্ভরতার কথাও স্মরণ করা যায়।
তবে ‘কে জেগে আছ’—এই প্রশ্নের সামাজিক তাৎপর্যও রয়েছে। আমরা কি সমাজের দরিদ্র, অসহায় ও বঞ্চিত মানুষের কষ্ট সম্পর্কে সচেতন? তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য কি আমরা জেগে আছি? পূজার রাতে প্রদীপ জ্বালানোর পাশাপাশি সমাজের অন্ধকার দূর করার অঙ্গীকারও জরুরি।
আজ কৃষক উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও বাজারের অনিশ্চয়তায় সংকটে পড়েন। অথচ তাঁদের শ্রমেই ঘরে ঘরে অন্ন পৌঁছায়। যাঁদের শ্রমে খাদ্য উৎপাদিত হয়, তাঁদের জীবন অনিশ্চিত থাকলে সমৃদ্ধির ধারণা পূর্ণতা পায় না। তাই লক্ষ্মীপূজার শিক্ষা হতে পারে কৃষকের শ্রমের মর্যাদা দেওয়া, খাদ্যের অপচয় বন্ধ করা এবং উৎপাদককে তাঁর ফসলের ন্যায্য মূল্য দেওয়ার দাবি জোরালো করা। যে সমাজে খাদ্য নষ্ট হয়, অথচ মানুষ অনাহারে থাকে, সেখানে অন্নের প্রতি শ্রদ্ধা ও সামাজিক ন্যায়বোধের প্রয়োজন আরও বেশি।
লক্ষ্মীকে সৌভাগ্যের প্রতীক বলা হলেও সৌভাগ্য কেবল টাকা-পয়সা, সোনা-গয়না কিংবা বিলাসী জীবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পরিবারের সুস্থতা, শান্তি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সৎ উপার্জন ও নিরাপদ জীবনও সমৃদ্ধির অংশ। একইভাবে জাতীয় আয় বাড়লেই সবার জীবনমান উন্নত হয় না। সম্পদের সুষম বণ্টন ও ন্যায্য সুযোগ নিশ্চিত না হলে প্রকৃত সমৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়।
মানুষের সামর্থ্য অনুযায়ী অসহায় প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়ানো, ক্ষুধার্তকে খাবার দেওয়া, সৎ পথে উপার্জন করা এবং অন্যের অধিকার রক্ষা করা মানবিক সমৃদ্ধির পরিচয়। ধর্মীয় আচার তখনই জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়, যখন তা মানুষের আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে।
দুর্গাপূজা আমাদের শুভশক্তির জয় ও সম্প্রীতির বার্তা দেয়। অন্যদিকে কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা মনে করিয়ে দেয় অন্ন, শান্তি ও সমৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা। তাই এ উৎসব শুধু বাহ্যিক আড়ম্বরের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দরিদ্র মানুষের মুখে খাবার তুলে দেওয়া, অসহায় পরিবারের পাশে দাঁড়ানো, খাদ্য অপচয় রোধ এবং কৃষকের শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারে পরিণত করা প্রয়োজন।
কোজাগরী পূর্ণিমার চাঁদ যখন বাংলার আকাশ আলোকিত করে, তখন ঘরে ঘরে জ্বলে ওঠা প্রদীপ আমাদের মনে করিয়ে দিক—প্রকৃত সৌভাগ্য শুধু ব্যক্তিগত সম্পদে নয়; মানুষের মর্যাদা, নিরাপত্তা, শান্তি ও পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্যেও নিহিত। দেবী লক্ষ্মীর কাছে প্রার্থনা, প্রতিটি ঘরে থাকুক অন্ন, প্রতিটি পরিবারে আসুক শান্তি, কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষ পান তাঁদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য এবং সমাজ থেকে দূর হোক অভাব, বঞ্চনা ও বৈষম্য।
কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা হয়ে উঠুক সৌভাগ্যের আরাধনার পাশাপাশি মানবিকতা, সৎ জীবন ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার প্রত্যয়।
লেখক: সংবাদকর্মী, আশাশুনি, সাতক্ষীরা









