শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩
শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩

ঘুমানোর আগে স্ক্রিন নয়, বই

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬, ১০:২৩ অপরাহ্ণ
ঘুমানোর আগে স্ক্রিন নয়, বই

তারিক ইসলাম

‎আধুনিক প্রযুক্তির যুগে আমাদের দিন শুরু হয় স্মার্টফোনের স্ক্রিনে চোখ রেখে, আর দিন শেষও হয় অনবরত স্ক্রলিংয়ের মধ্য দিয়ে। রাতের খাবার শেষে বিছানায় শুয়ে সোশ্যাল মিডিয়ার নোটিফিকেশন চেক করা, ছোট ভিডিও দেখা কিংবা সংবাদের পাতায় চোখ বোলানো এখন দৈনন্দিন অভ্যাস। কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি, ঘুমানোর ঠিক আগের এই অভ্যাসটি আমাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের কতটা ক্ষতি করছে?

‎ডিজিটাল কোলাহল থেকে মুক্তি পেতে এবং একটি প্রশান্তিময় রাতের ঘুম নিশ্চিত করতে বিশেষজ্ঞরা এখন আবার পুরোনো কিন্তু সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বন্ধু—বইয়ের কাছে ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন।

‎‎ঘুমানোর আগে মোবাইলের পরিবর্তে বই পড়ার অভ্যাস কেন আমাদের জীবনের জন্য জরুরি, তা কিছু বৈজ্ঞানিক ও মানসিক দিক পর্যালোচনা করলেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

‎প্রাকৃতিক ঘুমের হরমোন উৎপাদন: ‎স্মার্টফোন বা যেকোনো ডিজিটাল ডিভাইসের পর্দা থেকে একধরনের নীল আলো (ব্লু লাইট) নির্গত হয়। এই আলো মস্তিষ্কে বিভ্রান্তি তৈরি করে ঘুম আনার হরমোন ‘মেলাটোনিন’ নিঃসরণে বাধা দেয়। ফলে সহজে ঘুম আসতে চায় না। স্ক্রিনের বদলে ছাপা বই হাতে নিলে মেলাটোনিন নিঃসরণে কোনো বাধা থাকে না; প্রাকৃতিকভাবেই চোখে নেমে আসে গাঢ় ঘুম।

‎দ্রুত মানসিক ও পেশির চাপ হ্রাস : ‎সারাদিনের কাজের পর শরীরের পাশাপাশি স্নায়ুরও বিশ্রামের প্রয়োজন হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ছয় মিনিট মনোযোগ দিয়ে বই পড়লে রক্তচাপ ও পেশির টান উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। এটি শরীরকে অন্যান্য যেকোনো পদ্ধতির চেয়ে দ্রুত শান্ত করে আরামদায়ক ঘুমের জন্য প্রস্তুত করে।

‎দুশ্চিন্তামুক্ত মন ও ‘কগনিটিভ শিফট’: ‎আগামীকালের কাজের চিন্তা বা সারাদিনের মানসিক ক্লান্তি মস্তিষ্ককে রাতে শান্ত হতে দেয় না। মন যখন কোনো নির্দিষ্ট দুশ্চিন্তার চক্রে আটকে থাকে, তখন বই চমৎকার বিকল্প হিসেবে কাজ করে। বইয়ের পাতা মনকে সুনির্দিষ্ট কোনো গল্প বা বিষয়ের গভীরে নিয়ে যায় (যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘কগনিটিভ শিফট’ বলা হয়)। ফলে মস্তিষ্ক অনাকাঙ্ক্ষিত উৎকণ্ঠা থেকে সাময়িক মুক্তি পায়।

‎ওভারস্টিমুলেশন বা অতি-উত্তেজনা রোধ: ‎সোশ্যাল মিডিয়ার একের পর এক নোটিফিকেশন বা রিলস আমাদের মস্তিষ্কে ডোপামিন হরমোনের অতিরিক্ত প্রবাহ ঘটায়। এটি মস্তিষ্ককে একধরনের অহেতুক উত্তেজনায় (ওভারস্টিমুলেশন) রাখে, যা ঘুমের পরিবেশ নষ্ট করে। অন্যদিকে বই পড়ার শ্লথ ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া এই উত্তেজনা কমিয়ে মনে গভীর প্রশান্তি আনে।
‎মনোযোগ ও স্মৃতির উন্নয়ন: ‎প্রতিনিয়ত ছোট ছোট কনটেন্ট স্ক্রলিংয়ের ফলে মানুষের মনোযোগের সময়সীমা (অ্যাটেনশন স্প্যান) মারাত্মকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। রাতে নিয়মিত ১৫ থেকে ৩০ মিনিট বই পড়ার অভ্যাস এক জায়গায় মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা পুনর্গঠনে সাহায্য করে। তাছাড়া ঘুমানোর ঠিক আগে যা পড়া হয়, ঘুমন্ত অবস্থায় মস্তিষ্ক তা স্থায়ী স্মৃতিতে রূপান্তর (কনসোলিডেট) করে।

চোখের সুরক্ষা ও সতেজ সকাল : ‎ডিজিটাল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখের পলক স্বাভাবিকের চেয়ে কম পড়ে, যা চোখ শুষ্ক করে ফেলে এবং মাথাব্যথার কারণ হয়। বইয়ের পাতা চোখের পেশির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে না। তা ছাড়া মোবাইল দেখে ঘুমালে ঘুমের মান খারাপ হয় এবং সকালে ক্লান্তি অনুভব হয়। বই পড়ে ঘুমালে গভীর ঘুম নিশ্চিত হয়, যা পরদিন সকালে পূর্ণ শক্তি ও প্রফুল্লতা নিয়ে জেগে উঠতে সাহায্য করে।

‎প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করার উপায় নেই, তবে প্রযুক্তির দাসত্ব থেকে নিজেকে মুক্ত রাখার কৌশল জানতে হবে। সুস্থ দেহ ও শান্ত মনের জন্য রাতে বিছানায় যাওয়ার অন্তত আধঘণ্টা আগে মোবাইল বা ল্যাপটপ দূরে সরিয়ে রাখুন। বালিশের পাশে পছন্দের একটি বই রাখুন। এই একটি ছোট অভ্যাস আপনার জীবনের সামগ্রিক মান ও প্রশান্তিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।

‎লেখক: ‎সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি

 

 

Ads small one

প্রযুক্তি, সাংবাদিকতা এবং একটি অস্তিত্বের প্রশ্ন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ৪:৩৪ অপরাহ্ণ
প্রযুক্তি, সাংবাদিকতা এবং একটি অস্তিত্বের প্রশ্ন

দীপঙ্কর বিশ্বাস

সংবাদপপত্রের প্রথম পাতা থেকে শুরু করে সামাজিকযোগাযোগ মাধ্যমের ‘নোটিফিকেশন ফিড’ সাংবাদিকতার রূপান্তর ঘটেছে চোখে পড়ার মতো গতিতে। হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্টফোন আর দ্রুতগতির ইন্টারনেট বদলে দিয়েছে তথ্য দেওয়া-নেওয়ার পুরো ব্যাকরণ। কিন্তু এই পরিবর্তনের স্্েরাতে ভেসে ওঠা বড় প্রশ্নটি হলো: প্রযুক্তি কি সাংবাদিকতাকে সমৃদ্ধ করেছে, নাকি এর পেশাদারিত্বকে ঠেলে দিয়েছে অবক্ষয়ের দিকে?

একদিক থেকে বিচার করলে, প্রযুক্তি সাংবাদিকতার জন্য নিয়ে এসেছে এক নতুন দিগন্ত। এখন আর কোনো ঘটনা ঘটলে পরদিনের খবরের কাগজের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না; মুহূর্তের মধ্যেই তথ্য পৌঁছে যায় কোটি কোটি মানুষের কাছে। মাঠপর্যায়ের জটিল ডেটা বিশ্লেষণ, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় ড্রোন ও স্যাটেলাইট কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে বিশাল নথিপত্র ঘেঁটে তথ্য বের করার কাজ প্রযুক্তি সংবাদকর্মীদের ক্ষমতা ও সক্ষমতা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

তথ্যের এই বাঁধভাঙা জোয়ারে সবচেয়ে বড় যে ক্ষতিটি হয়েছে, তা হলো বস্তুনিষ্ঠতা এবং সংবাদের নির্ভুলতার পরীক্ষা। ‘সবার আগে খবর দেওয়া’র এক প্রতিযোগিতায় সংবাদের যাচাই-বাছাই বা ‘ফ্যাক্ট-চেকিং’ এর স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটি গুরুত্ব হারাচ্ছে। সংবেদনশীলতা আর চটকদার শিরোনাম এখন গভীর ও মানসম্পন্ন অনুসন্ধানের জায়গা দখল করে নিয়েছে। অ্যালগরিদমের ফাঁদে পড়ে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের চেয়ে ভুয়া খবর এবং গুজব অনেক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, যা সাধারণ মানুষের মনে সংবাদমাধ্যমের প্রতি আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে আশঙ্কাজনকভাবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুগে এসে মৌলিক কনটেন্ট বা লেখালেখির ধরণে এক ধরনের যান্ত্রিকতা কাজ করছে। সাংবাদিকতা তো কেবল কিছু তথ্যের সমাহার নয়; এর পেছনে থাকে মানবিক আবেদন, সহমর্মিতা, নীতি-নৈতিকতা এবং সমাজকে বুঝতে পারার প্রজ্ঞা, যা কোনো প্রযুক্তির পক্ষে হুবহু তৈরি করা সম্ভব নয়। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে যখন কেবল পেজভিউ কিংবা রিচ বাড়ানোর প্রতিযোগিতা চলে, তখন সাংবাদিকতা তার মহৎ সামাজিক দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত হতে বাধ্য হয়।

সব মিলিয়ে বলা যায়, প্রযুক্তি নিজেই নিজের মধ্যে কোনো অবক্ষয় বয়ে আনে না; অবক্ষয় ঘটে তখন, যখন প্রযুক্তিকে পেশাগত নীতি ও নৈতিকতার উপরে স্থান দেওয়া হয়। প্রযুক্তিকে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করে যদি সংবাদের মূল ভিত্তি সত্যতা, দায়িত্বশীলতা এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিকে ধরে রাখা যায়, তবেই কেবল সাংবাদিকতা তার গৌরব বজায় রাখতে পারবে।

 

দিনশেষে, আধুনিকতম প্রযুক্তিও একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিকের বিবেক ও অনুসন্ধানী দৃষ্টির বিকল্প হতে পারে না।

 

 

পুতুল নাচে বেঁচে থাকে বাংলার লোকঐতিহ্য

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ৪:২৩ অপরাহ্ণ
পুতুল নাচে বেঁচে থাকে বাংলার লোকঐতিহ্য

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

একসময় গ্রামবাংলার সন্ধ্যা মানেই ছিল উৎসবের আমেজ। হাটের পাশে কিংবা গ্রামের খোলা মাঠে বাঁশের খুঁটি পুঁতে কাপড়ের পর্দা টাঙিয়ে তৈরি হতো ছোট্ট একটি মঞ্চ। সন্ধ্যা নামতেই ভিড় জমাতেন শিশু, কিশোর, তরুণ থেকে শুরু করে প্রবীণরাও। পর্দার আড়াল থেকে ভেসে আসত ঢোল, করতাল, বাঁশি কিংবা হারমোনিয়ামের সুর। তারপর শুরু হতো পুতুলের অভিনয়। সুতোয় বাঁধা কাঠের পুতুল কখনো রাজা, কখনো রানি, কখনো বীর যোদ্ধা, আবার কখনো হাস্যরসের চরিত্র হয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করত।

 

সেই পুতুল নাচ ছিল শুধু বিনোদন নয়, ছিল গ্রামীণ সমাজের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্যের এক অনন্য বাহক। বাংলার লোকসংস্কৃতির প্রাচীন শিল্পগুলোর মধ্যে পুতুল নাচ অন্যতম। বহু শতাব্দী ধরে এই শিল্প মানুষের আনন্দ, শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ধর্মীয় কাহিনি, রূপকথা, লোকগাঁথা, নৈতিক শিক্ষা কিংবা সামাজিক সমস্যার গল্পÑসবই উঠে আসত পুতুল নাচের মঞ্চে।

 

শিল্পীরা কণ্ঠস্বর বদলে একাই একাধিক চরিত্রের সংলাপ বলতেন, যা দর্শকদের বিস্মিত করত। পুতুল নাচের পুতুলগুলো তৈরি হতো কাঠ, কাপড়, রঙ ও সুতা দিয়ে। একজন দক্ষ কারিগর দিনের পর দিন পরিশ্রম করে একটি পুতুল তৈরি করতেন। এরপর সেই পুতুলে প্রাণ সঞ্চার করতেন শিল্পী। হাতের নিপুণ কৌশলে সুতো টেনে পুতুলকে হাঁটানো, নাচানো, হাসানো কিংবা কান্নার অভিনয় করানো ছিল এক অসাধারণ শিল্প।

 

একসময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পুতুল নাচের দল ছিল বেশ পরিচিত। শীতের মৌসুমে কিংবা গ্রামীণ মেলায় তাদের ব্যস্ততা থাকত সবচেয়ে বেশি। একটি দল কয়েক মাস ধরে এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় ঘুরে অনুষ্ঠান করত। দর্শকদের দেওয়া অর্থেই চলত তাদের সংসার। সেই সময় এই শিল্প শুধু বিনোদনের মাধ্যম ছিল না, ছিল অনেক পরিবারের জীবিকার উৎস। কালের পরিক্রমায় পরিস্থিতি বদলে গেছে।

 

টেলিভিশন, সিনেমা, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহজলভ্যতায় মানুষের বিনোদনের ধরন পাল্টে গেছে। গ্রামের মাঠে এখন আর আগের মতো পুতুল নাচের আসর বসে না। নতুন প্রজন্মের অনেকেই বাস্তবে পুতুল নাচ দেখেনি। ফলে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এই ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্প।শুধু দর্শক কমে যাওয়াই নয়, শিল্পীদের জীবনও হয়ে উঠেছে অনিশ্চিত। আয় কমে যাওয়ায় অনেকেই পেশা পরিবর্তন করেছেন।

 

কেউ দিনমজুর, কেউ কৃষিকাজ, কেউ আবার ছোটখাটো ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন। নতুন প্রজন্মের সদস্যরা আর এই শিল্পকে পেশা হিসেবে নিতে আগ্রহী নন। কারণ এতে নেই আর্থিক নিরাপত্তা কিংবা সামাজিক স্বীকৃতি। লোকসংস্কৃতি গবেষকদের মতে, পুতুল নাচ কেবল একটি বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবনধারার গুরুত্বপূর্ণ দলিল। একটি পুতুল নাচের প্রদর্শনীতে যেমন থাকে অভিনয়, তেমনি থাকে সংগীত, সাহিত্য, চিত্রকলা, কারুশিল্প ও নাট্যকলার সম্মিলন। অর্থাৎ এটি একটি সমন্বিত লোকশিল্প।

 

বর্তমান সময়ে কিছু সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান লোকজ সংস্কৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সীমিত। জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে নিয়মিত লোকজ উৎসব আয়োজন, পুতুল নাচের দলকে আর্থিক সহায়তা, শিল্পীদের প্রশিক্ষণ এবং বিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে এই শিল্পকে অন্তর্ভুক্ত করা গেলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি হতে পারে। পর্যটনের সঙ্গেও পুতুল নাচকে যুক্ত করা সম্ভব।

 

দেশের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র, ঐতিহ্যবাহী মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নিয়মিত পুতুল নাচের আয়োজন করলে শিল্পীরা নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীরাও বাংলার লোকঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন। ডিজিটাল যুগেও এই শিল্পের নতুন সম্ভাবনা রয়েছে। পুতুল নাচের ভিডিও ধারণ করে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রচার, শিশুদের জন্য অ্যানিমেশনধর্মী উপস্থাপনা কিংবা আধুনিক গল্পের সঙ্গে লোকজ উপাদানের সমন্বয় ঘটিয়ে নতুনভাবে এই শিল্পকে উপস্থাপন করা যেতে পারে।

 

এতে ঐতিহ্যও রক্ষা পাবে, আবার নতুন দর্শকও তৈরি হবে। একটি জাতির পরিচয় শুধু তার উন্নত ভবন, আধুনিক প্রযুক্তি কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নয়; তার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও লোকজ শিল্পেও নিহিত থাকে। পুতুল নাচ সেই পরিচয়েরই এক উজ্জ্বল অংশ। এই শিল্প হারিয়ে গেলে হারিয়ে যাবে আমাদের ইতিহাসের একটি জীবন্ত অধ্যায়, গ্রামীণ জীবনের এক টুকরো স্মৃতি এবং বহু শিল্পীর সৃষ্টিশীলতার উত্তরাধিকার।

 

তাই এখনই প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। সরকার, সাংস্কৃতিক সংগঠন, গবেষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পুতুল নাচকে আবার মানুষের কাছে ফিরিয়ে আনতে হবে। কারণ পুতুলের সুতোয় বাঁধা সেই ছোট্ট মঞ্চে লুকিয়ে আছে বাংলার লোকজ সংস্কৃতির এক বিশাল ইতিহাস। সেই ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার।

লেখক: সংবাদকর্মী

পাইকগাছায় নার্সারীতে গুটি কলম তৈরিতে ব্যস্ত শ্রমিক

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ২:১৯ অপরাহ্ণ
পাইকগাছায় নার্সারীতে গুটি কলম তৈরিতে ব্যস্ত শ্রমিক

প্রকাশ ঘোষ বিধান, পাইকগাছা (খুলনা): পাইকগাছার নার্সারী গুলিতে গুটি কলম তৈরীতে ব্যস্ত সময় পার করছে মালিক ও শ্রমিকরা। গুটি কলম তৈরীর উপযুক্ত সময় বর্ষাকাল। সাধারণত বৈশাখ-আষাঢ় গুটি কলম তৈরীর উপযুক্ত সময়। বর্ষার আর্দ্র আবহাওয়া ও মাটিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা থাকায় এই সময়ে কলমের ডালে খুব দ্রুত ও সফলভাবে শিকড় গজায়।

মাতৃগুণ বজায় রাখা, দ্রুত ফলন, রোগ প্রতিরোধে ক্ষমতা বাড়ানো এবং অধিক ফলন পেতে গুটিকলম ব্যবহার করা হয়। সম্পূর্ণ মাতৃগাছে গুণাগুন সমৃদ্ধ চারা করার জন্য গুটিকলম জনপ্রিয়। কাগজি লেবু, পেয়ারা, লিচু, জলপাই, ডালিম, করম চা, গোলাপ জামসহ বিভিন্ন গাছে গুটি কলম করা হয়।

উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ছোট-বড় প্রায় ৫ শতাধিত নার্সারী গড়ে উঠেছে। যার উল্লেখযোগ্য সংখ্যা রয়েছে গদাইপুর গ্রামে। বর্ষা মৌসুম শুরুতে চারা তৈরীর জন্য নার্সারী মালিক ও কর্মচারীরা গুটিকলম তৈরীতে ব্যস্ত হয়ে ওঠেছে। যে গাছের ডালে গুটি করা হবে সে ডালের বয়স কমপক্ষে ৬ মাস থেকে ২ বছর হতে হবে। গুটি কলম তৈরী করতে গাছের ডালের দুই ইঞ্চি মত ছাল পুরাটা গোল করে কেঁটে ফেলে জৈব সার মিশ্রিত মাটি দিয়ে কাঁটা অংশ ভাল করে বেঁধে গুটি করতে হবে। মাটির গুটি সবসময় ভিজা রাখতে হবে। মাটিতে পলিথিন দিয়ে শক্ত করে বেঁধে দিতে হবে। ১ মাসের মধ্যেই মাটির ভিতর থেকে শিকড় বেড় হয়।

হিতামপুর গ্রামে অবস্থিত রজনীগন্ধা নার্সারীর মালিক সুকনাথ পাল জানান, এ বছর তার নার্সারীতে ২৫ হাজার গুটি কলমের চারা তৈরী করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে মিস্টি জলপাই, মাল্টা, পেয়ারা ও লিচু।

গদাইপুর নার্সারি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কামাল সরদার জানান, তার নার্সারীতে বিভিন্ন জাতের প্রায় ৪৫ হাজার গুটি কলম তৈরী করছেন। শ্রমিকের অভাবে কলম তৈরী করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তবে কলম তৈরীর সময় পার হয়ে গেলে এ মৌসুমের আর গুটি কলম তৈরী করা যাবে না। সে কারনে কলম তৈরীতে অধিক পয়সা খরচ হচ্ছে। এছাড়া শামসুল, আক্তার, রওশনারা, মিজানুর, নাসির, নজরুল, বিল্লালসহ বিভিন্ন নার্সারি মালিক গুটি কলম তৈরি করছেন।

গদাইপুর গ্রামের গুটি কলমের অভিজ্ঞ কারিগর হামিদ মোড়ল জানান, প্রতিটি গুটি দুই টাকা দরে তৈরী করছি। গোপালপুর গ্রামের গুটি কলমের অভিজ্ঞ কারিগর মোক্তার ও সালাম বলেন, লেবু গুটি ২টাকা ও অন্য জাতের গুটি কলম ১ টাকা ৭০ পয়সা দরে তৈরী করছি।

পাইকগাছা উপজেলা নার্সারী মালিক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অশোক কুমার পাল জানান, কলম তৈরীর শ্রমিক ঠিকমত না পাওয়ায় কারণে উচ্চ মূল্যে শ্রমিক নিয়ে কলম তৈরী করতে হচ্ছে। গদাইপুর এলাকার তৈরী কলম বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, দিনাজপুর, রংপুর, সিলেট, বরিশাল, কুমিল্লা, রাজশাহী সহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ হচ্ছে। তবে ঠিকমত বাজার দর না পাওয়ায় নার্সারী মালিকরা আশানারুপ ব্যবসা করতে পারছে না।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোঃ একরামুল হোসেন জানান, পাইকগাছার নার্সারী শিল্প খুলনা জেলার শীর্ষ পর্যায়ে রয়েছে। নার্সারীতে উৎপাদিত চারা সবুজ বননায়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করছে তেমনি দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।