সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬, ১ আষাঢ় ১৪৩৩
সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬, ১ আষাঢ় ১৪৩৩

দালাল নয়, জীবনযোদ্ধা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬, ১২:১১ পূর্বাহ্ণ
দালাল নয়, জীবনযোদ্ধা

সচ্চিদানন্দ দে সদয়
বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোর করিডোরে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের ভিড় জমে। কেউ এসেছেন অসুস্থ সন্তানের চিকিৎসা করাতে, কেউ বৃদ্ধ বাবাকে নিয়ে দৌড়াচ্ছেন এক ওয়ার্ড থেকে আরেক ওয়ার্ডে, কেউবা রিপোর্ট হাতে দাঁড়িয়ে আছেন দীর্ঘ লাইনে। এই ব্যস্ততা, উদ্বেগ আর অস্থিরতার মাঝেই কিছু পরিচিত মুখ প্রতিদিন ঘুরে বেড়ায়Ñকাঁধে ব্যাগ, হাতে ফাইল, মুখে ক্লান্তি, তবু বিনয়ী হাসি। তারা মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভ। এই মানুষগুলোর দিকে সমাজের একাংশ এমনভাবে তাকায়, যেন তারা স্বাস্থ্যব্যবস্থার অবাঞ্ছিত কোনো চরিত্র।

 

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ, অপমান আর “দালাল” শব্দের নির্বিচার ব্যবহার সেই বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। অথচ একটু গভীরভাবে দেখলেই বোঝা যায়Ñএই মানুষগুলো আসলে বাংলাদেশের শ্রমজীবী শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত অংশগুলোর একটি।একজন মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভের দিন শুরু হয় খুব ভোরে। শহর কিংবা জেলাÑযেখানেই হোক, সকাল আটটার আগেই তাকে প্রস্তুত হতে হয়। কারণ তার সামনে অপেক্ষা করে দীর্ঘ এক কর্মদিবস। হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ফার্মেসিÑএক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছুটতে ছুটতেই কেটে যায় পুরো দিন। অনেক সময় দুপুরের খাবার খাওয়ারও সুযোগ হয় না। কখনো সিঁড়ির কোণে দাঁড়িয়ে বিস্কুট খেয়ে, কখনো চায়ের দোকানে দুই মিনিট বসে আবার ছুটতে হয়। এই ছুটে চলা কোনো শখের নয়। এর পেছনে থাকে চাকরি টিকিয়ে রাখার লড়াই। থাকে মাস শেষে পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার তাগিদ। বাংলাদেশের চাকরির বাজারে আজ সবচেয়ে বড় বাস্তবতার নাম বেকারত্ব। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নিয়ে বের হওয়া হাজার হাজার তরুণ বছরের পর বছর চাকরির পেছনে ঘুরছেন। কেউ বিসিএসের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, কেউ ব্যাংকের পরীক্ষার জন্য কোচিং করছেন, কেউ আবার হতাশ হয়ে বাড়িতে বসে আছেন। এই বাস্তবতায় মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভের চাকরি অনেকের কাছে বেঁচে থাকার শেষ ভরসা হয়ে আসে।এ পেশার অধিকাংশ কর্মীই অনার্স বা মাস্টার্স পাস। অনেকে বিজ্ঞানভিত্তিক বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। তাদের অনেকেরই স্বপ্ন ছিল শিক্ষক হওয়ার, গবেষক হওয়ার, সরকারি কর্মকর্তা হওয়ার। কিন্তু বাস্তবতা সব সময় স্বপ্নের মতো হয় না। পরিবার চালানোর প্রয়োজন, বাবার অবসর, ছোট ভাইবোনের পড়াশোনা, সংসারের দায়িত্বÑসব মিলিয়ে অনেকেই বাধ্য হয়ে এই পেশায় আসেন। এটা এমন একটি চাকরি, যেখানে চাকরির নিরাপত্তা কম, চাপ বেশি, আর সম্মান সবচেয়ে কম। একজন মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভকে প্রতিদিন টার্গেট পূরণ করতে হয়। মাস শেষে কত বিক্রি হলো, কোন চিকিৎসক কোন ওষুধ লিখলেন, কোন ফার্মেসিতে ওষুধ পাওয়া যাচ্ছেÑসবকিছুর হিসাব দিতে হয়। কোম্পানির চাপ, মার্কেটের প্রতিযোগিতা, চিকিৎসকের সময়ের অভাবÑসবকিছু সামলাতে হয় একসঙ্গে।তবু তারা কাজ করে যান। কারণ তাদের পেছনে থাকে পরিবার।একজন মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভ হয়তো রাতে বাসায় ফিরছেন ক্লান্ত শরীরে। কিন্তু বাসায় ঢুকতেই ছোট্ট সন্তান দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে। স্ত্রী অপেক্ষা করে থাকেন রাতের খাবার নিয়ে। বৃদ্ধ মা হয়তো জিজ্ঞেস করেন, “বাবা, খেয়েছিস?” এই মানুষগুলোর জীবনও তো অন্য সবার মতোই। কিন্তু সমাজ তাদের দেখার সময় যেন মানবিকতা ভুলে যায়।বিশেষ করে হাসপাতালে প্রেসক্রিপশনের ছবি তোলার বিষয়টি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ আছে। রোগীর গোপনীয়তার বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ।

 

এ নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে। কিন্তু এটাও বোঝা দরকার যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রেসক্রিপশন সার্ভের উদ্দেশ্য রোগীর ব্যক্তিগত তথ্য জানা নয়; বরং বাজারে ওষুধের উপস্থিতি নিশ্চিত করা।ধরা যাক, একজন চিকিৎসক নতুন একটি ওষুধ লিখলেন। কিন্তু আশপাশের কোনো ফার্মেসিতে সেটি পাওয়া গেল না। তখন সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়বেন রোগীই। এই ব্যবস্থাপনাটিই মূলত সমন্বয় করেন মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভরা। তারা চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন বিশ্লেষণ করে কোম্পানিকে জানান কোন এলাকায় কোন ওষুধের চাহিদা বাড়ছে। এরপর সেই অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত হয়। এখানে রোগীর রোগ নিয়ে কৌতূহল নয়, বরং বাজার ব্যবস্থাপনার বিষয়টিই মুখ্য। তবু যদি কোথাও রোগীর গোপনীয়তা লঙ্ঘিত হয়, তবে অবশ্যই সেটি নিয়ে নীতিমালা হওয়া উচিত। সচেতনতা বাড়ানো উচিত। কিন্তু সেটির সমাধান অপমান হতে পারে না। আজকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খুব সহজে মানুষকে ছোট করা যায়। কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও, কিছু কটূক্তি, কিছু ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্যÑআর মুহূর্তেই একজন মানুষকে “খলনায়ক” বানিয়ে দেওয়া সম্ভব। মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভরাও সেই নির্মম ট্রলের শিকার হয়েছেন। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, অনেকেই তাদের “দালাল” বলেন। কিন্তু প্রশ্ন হলোÑকোন অর্থে তারা দালাল? তারা কি কারও কাছ থেকে ঘুষ নেয়?তারা কি সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করে?তারা কি মানুষের জমি দখল করে? তারা কি ব্যাংকের টাকা লুট করে বিদেশে পালিয়ে যায়?না।তারা মূলত একটি কোম্পানির পণ্য সম্পর্কে তথ্য চিকিৎসকদের কাছে পৌঁছে দেন। পৃথিবীর সব দেশেই এই ব্যবস্থা রয়েছে। আন্তর্জাতিক ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পের একটি স্বীকৃত অংশ এটি। বাংলাদেশের ওষুধশিল্প আজ দেশের অন্যতম সফল খাত। দেশের চাহিদার বড় অংশ পূরণ করার পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে। এই শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজার হাজার শ্রমিক, কর্মকর্তা, গবেষক, ফার্মাসিস্ট, বিপণনকর্মী ও মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভ। একটি ওষুধ গবেষণা থেকে বাজার পর্যন্ত পৌঁছাতে বিশাল একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। নতুন ওষুধের কার্যকারিতা, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, ব্যবহারবিধিÑএসব তথ্য চিকিৎসকদের কাছে পৌঁছে দিতে হয়। এই কাজটিই করেন মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভরা। চিকিৎসকেরাও তাদের গুরুত্ব বোঝেন। তাই ব্যস্ততার মাঝেও দুই-তিন মিনিট সময় দেন। কারণ নতুন ওষুধ সম্পর্কে আপডেট তথ্য জানা চিকিৎসাব্যবস্থারই অংশ।অথচ সাধারণ মানুষের চোখে এই পুরো প্রক্রিয়াটি অনেক সময় ভুলভাবে উপস্থাপিত হয়। সমস্যা হলো, আমরা পেশাকে বিচার করি বাইরে থেকে। একজন মানুষ সারাদিন কী কষ্ট করে, কী অপমান সহ্য করে, কী চাপের মধ্যে থাকেÑসেগুলো আমরা দেখি না।একজন মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভকে দিনের পর দিন দাঁড়িয়ে থাকতে হয় চিকিৎসকের চেম্বারের বাইরে। কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়।

 

অনেক সময় অপমানও সহ্য করতে হয়। তবু তিনি হাসিমুখে কথা বলেন। কারণ তার পেশাই তাকে ধৈর্য শিখিয়েছে। এমনও হয়, একজন প্রতিনিধি সারাদিন কাজ করে রাতে বাড়ি ফিরলেন, কিন্তু কোম্পানির টার্গেট পূরণ হয়নি। পরদিন আবার জবাবদিহি। চাকরি হারানোর ভয়। এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই জীবন কাটে।বাংলাদেশে লাখ লাখ তরুণ এই পেশায় কাজ করছেন। তাদের বড় অংশই মধ্যবিত্ত বা নি¤œমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। তারা চাকরি না করলে হয়তো পরিবার চলবে না। বৃদ্ধ বাবার ওষুধ কেনা হবে না। ছোট ভাইয়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি দেওয়া যাবে না। মেয়ের স্কুলের বেতন বাকি পড়ে যাবে। তাই যখন সমাজ তাদের “দালাল” বলে অপমান করে, তখন সেটা শুধু একটি পেশাকে নয়, বরং সংগ্রামী মধ্যবিত্ত জীবনের মর্যাদাকেই আঘাত করে।আমাদের সমাজে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য আছে। আমরা বড় দুর্নীতিবাজদের অনেক সময় সম্মান করি, কিন্তু সৎভাবে পরিশ্রম করা মানুষকে ছোট করি।যে তরুণ সারাদিন ঘুরে, ঘাম ঝরিয়ে, হালাল উপার্জন করে পরিবার চালায়Ñতার প্রতি সহানুভূতির বদলে আমরা বিদ্রƒপ ছুড়ে দিই। অথচ সমাজের আসল শক্তি তারাই। এ কথা ঠিক, সব মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভই ফেরেশতা নন। কোনো পেশাতেই সবাই নিখুঁত নয়। কোথাও অনৈতিকতা থাকলে সেটির সমালোচনা হওয়া উচিত। কিন্তু সমালোচনা আর অপমান এক জিনিস নয়।কোনো ব্যক্তি ভুল করলে তার দায় ব্যক্তির। পুরো পেশার নয়। একইভাবে, কোনো চিকিৎসক ভুল করলে আমরা কি সব চিকিৎসককে অপরাধী বলি? কোনো সাংবাদিক অনৈতিক কাজ করলে কি সব সাংবাদিককে দোষ দিই? তাহলে মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভদের ক্ষেত্রে এই সামষ্টিক অপমান কেন? আসলে আমাদের সমাজে শ্রমের মর্যাদা নিয়ে এখনো সংকট আছে।আমরা চাকরিকে সম্মান করি বেতনের অঙ্ক দেখে, পদবি দেখে, ক্ষমতা দেখে। কিন্তু একজন মানুষ কত কষ্ট করে সৎভাবে উপার্জন করছেন, সেটিকে মূল্য দিই কম। একজন মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভ হয়তো মাসে খুব বেশি আয় করেন না। কিন্তু তিনি নিজের শ্রম বিক্রি করেন, বিবেক নয়। এই জায়গাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।আজকের বাংলাদেশে যেখানে দুর্নীতি, প্রতারণা, কমিশনবাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে প্রতিদিন খবর বের হয়, সেখানে যারা কঠোর পরিশ্রম করে সৎভাবে বাঁচতে চান, তাদের উৎসাহিত করা উচিত ছিল। কিন্তু বাস্তবে তারা অবহেলা আর অপমানই বেশি পান। এই পেশার মানুষের মানসিক চাপও কম নয়। সারাক্ষণ লক্ষ্য পূরণের চাপ, চাকরি হারানোর ভয়, মানুষের অবজ্ঞাÑসব মিলিয়ে তারা এক অদৃশ্য মানসিক যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যান।তবু তারা হাল ছাড়েন না। কারণ তারা জানেন, তাদের পেছনে একটি পরিবার আছে। সন্তানের ভবিষ্যৎ আছে। বৃদ্ধ মা-বাবার ভরসা আছে।আমরা যখন হাসপাতালে যাই, তখন নিজের কষ্টটাই বড় মনে হয়। সেটি স্বাভাবিক। অসুস্থতার সময় মানুষের ধৈর্য কমে যায়। কিন্তু সেই সময়টাতে যারা কাজ করছেন, তারাও তো মানুষ। তাদেরও ক্লান্তি আছে, কষ্ট আছে, অপমানবোধ আছে। একজন মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভকে হয়তো কেউ রাগ করে কিছু বলে ফেললেন। তিনি প্রতিবাদও করতে পারেন না। কারণ তিনি জানেন, সামান্য ভুল বোঝাবুঝিতেই চাকরি ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এই নীরব সহনশীলতার গল্পগুলো কখনো খবর হয় না। খবর হয় কেবল বিতর্ক।আমাদের গণমাধ্যমেরও দায়িত্ব আছে। একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো একটি পেশাকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা হতে পারে না। কারণ এর প্রভাব পড়ে লাখো মানুষের জীবনে। বাংলাদেশে স্বাস্থ্যব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতা আছে। চিকিৎসক কম, রোগী বেশি, হাসপাতালের চাপ বেশি। এই পুরো ব্যবস্থার মধ্যে মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভরা একধরনের “মধ্যবর্তী কর্মী” হিসেবে কাজ করেন। তাদের কাজ হয়তো সবার চোখে পড়ে না, কিন্তু তাদের অনুপস্থিতি টের পাওয়া যাবে খুব দ্রুত।

যদি কোনো এলাকায় প্রয়োজনীয় ওষুধ না পৌঁছায়, তার প্রভাব সরাসরি রোগীর ওপর পড়ে। তাই ওষুধ সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখাও জনস্বাস্থ্যের অংশ। একজন মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভ হয়তো দিনের শেষে খুব ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফেরেন। কিন্তু মাস শেষে বেতন হাতে পেয়ে যখন মায়ের হাতে বাজারের টাকা তুলে দেন, সন্তানের জন্য নতুন জামা কেনেন, স্ত্রীর ওষুধ কিনে আনেনÑসেই মুহূর্তে তার শ্রমের মর্যাদা তৈরি হয়। এই মর্যাদাটুকু সমাজের কাছ থেকেও তিনি প্রাপ্য।আমাদের মনে রাখতে হবে, মানুষকে সম্মান করা মানে শুধু বড় পদধারীদের সম্মান করা নয়। বরং যারা নীরবে পরিশ্রম করে সমাজকে সচল রাখছেন, তাদের সম্মান করাও সভ্যতার পরিচয়।মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভরা নিখুঁত নন। তাদের কাজের ধরন নিয়েও আলোচনা হতে পারে। নীতিমালা হতে পারে। রোগীর গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়েও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু তাদের অমানুষ বানিয়ে ফেলা, “দালাল” বলে অপমান করা কিংবা সামাজিকভাবে হেয় করা কোনো সমাধান নয়।আমরা যদি সত্যিই মানবিক সমাজ চাই, তাহলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। কারণ একজন মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভও এই দেশেরই সন্তান। তিনি কারও ভাই, কারও স্বামী, কারও বাবা। তিনি প্রতিদিন হালাল উপার্জনের জন্য লড়াই করছেন। তার ঘাম, তার পরিশ্রম, তার আত্মসম্মানÑএসবও মূল্যবান। সমাজের প্রতিটি সৎ শ্রমজীবী মানুষ সম্মান পাওয়ার অধিকার রাখেন।মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভরাও তার ব্যতিক্রম নন। লেখক: সংবাদ কর্মী

Ads small one

লাঙ্গলদাড়িয়ায় মৎস্য ঘের জবরদখলের চেষ্টার অভিযোগ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬, ১১:৪৭ অপরাহ্ণ
লাঙ্গলদাড়িয়ায় মৎস্য ঘের জবরদখলের চেষ্টার অভিযোগ

আশাশুনি প্রতিনিধি: আশাশুনির শ্রীউলা ইউনিয়নের লাঙ্গলদাড়িয়া মৌজায় ডিডকৃত (চুক্তিভিত্তিক লিজ) ও পৈতৃক সম্পত্তির একটি মৎস্য ঘের জবরদখলের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ দায়েরের পর পুলিশ উভয় পক্ষকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ থানায় হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
ঘের ব্যবসায়ী ইউসুফ আলী জানান, তিনি লাঙ্গলদাড়িয়া মৌজায় পৈতৃক ও ডিডকৃত ২১০ বিঘা জমিতে ২০২১ সাল থেকে শান্তিপূর্ণভাবে মৎস্য চাষ করে আসছেন। ২০২৬ সালে হিসাব অনুযায়ী নির্দিষ্ট কিছু অংশ বাদ দিয়ে ১৭৬.৫৭ বিঘা জমি তার পাওনা হয়, যার মধ্যে ১৫৯ বিঘা জমি তিনি বুঝে পেয়ে গত ৬ মাস ধরে ভোগদখল করছেন। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে এই হিসাব চূড়ান্ত হয়েছিল। কিন্তু গত ১৪ জুন অধ্যাপক সিরাজুল কবির ঘেরের জমি নিজের দাবি করে আকস্মিক দখলের চেষ্টা চালান এবং ১৫ জুন শ্রমিক নিয়ে ঘেরে নামেন।
এই বিষয়ে শ্রীউলা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, অধ্যাপক সিরাজুল কবিরের জমি আগেই তাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে, ইউসুফের ঘেরে তার নতুন কোনো জমি নেই। দখলের চেষ্টা করা হয়ে থাকলে তা অন্যায় হয়েছে।
তবে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে অধ্যাপক সিরাজুল কবির জবরদখলের অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, এর আগে কোনো সালিস-মিমাংসা হয়নি বা কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তিনি ইউসুফের ঘের দখল করতে যাননি।

কপিলমুনিতে চাচার মামলা ও হুমকিতে নিরাপত্তাহীনতায় এতিম ভাই-বোন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬, ১১:৪৩ অপরাহ্ণ
কপিলমুনিতে চাচার মামলা ও হুমকিতে নিরাপত্তাহীনতায় এতিম ভাই-বোন

কপিলমুনি (খুলনা) প্রতিনিধি: খুলনার পাইকগাছা উপজেলার কপিলমুনিতে মায়ের হত্যাকারী ও আপন চাচার করা ‘মিথ্যা’ মামলা ও জীবননাশের হুমকিতে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন দুই এতিম ভাই-বোন। সোমবার সকালে কাশিমনগর বাজারে এক সংবাদ সম্মেলনে এই অভিযোগ করেন ইটভাটার শিশু শ্রমিক মো. রিফাত গাজী।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে রিফাত গাজী বলেন, ২০২১ সালে তাদের বাবা এনামুল গাজী মারা যান। এরপর ২০১৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর তার মা রাশিদা বেগমকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় রিফাত বাদী হয়ে চাচা মহিদুল গাজীকে আসামি করে পাইকগাছা থানায় হত্যা মামলা করেন। পুলিশ সেদিনই মহিদুলকে গ্রেপ্তার করে। কিন্তু গত ২১ এপ্রিল জামিনে মুক্তি পেয়েই মহিদুল মামলা তুলে নেওয়ার জন্য রিফাত ও তার ছোট বোন তাসমিরা খাতুনসহ (১৪) সাক্ষীদের নানাভাবে হুমকি দিচ্ছেন। এ বিষয়ে জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে গত ১১ জুন থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন রিফাত।
রিফাত আরও অভিযোগ করেন, মায়ের হত্যা মামলা থেকে বাঁচতে চাচা মহিদুল গাজী উল্টো তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন। সম্প্রতি তিনি পাইকগাছা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে রিফাতসহ ৭ স্বজনের নাম উল্লেখ করে একটি ‘মিথ্যা’ মামলা (সিআর-৪০৪/২৬) দায়ের করেছেন। মামলায় দাবি করা হয়েছে—তার মা আত্মহত্যা করেছেন এবং রিফাত ও অন্যরা মিলে চাচার ঘরের আসবাবপত্র, স্বর্ণালঙ্কার, পুকুরের মাছ ও কলাসহ প্রায় ৩২ লাখ টাকার মালামাল চুরি ও ক্ষতিসাধন করেছে। রিফাত এই দাবিকে সম্পূর্ণ বানোয়াট ও ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত ৩১ জানুয়ারি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের সূত্র ধরে পুলিশ জানায়, রাশিদা বেগম আত্মহত্যা করেছেন। ফলে মামলাটি হত্যা (৩০২ ধারা) থেকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার (৩০৬ ধারা) অপরাধে রূপ নেয়।
রিফাত গাজীর দাবি, তার বাবার মৃত্যুর পর থেকে চাচা মহিদুল তার মাকে নানাভাবে যৌন হয়রানি ও কুপ্রস্তাব দিয়ে আসছিলেন। এ নিয়ে এলাকায় একাধিকবার সালিস হলেও মহিদুল উপস্থিত হননি। ঘটনার রাতে তার মাকে বাইরে ডেকে নেওয়া হয়েছিল এবং ঘরের বাইরে থেকে শিকল আটকে দেওয়া হয়েছিল। পরদিন সকালে লিচু গাছ থেকে মায়ের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। ময়নাতদন্তে আত্মহত্যার কথা বলা হলেও সুরতহাল রিপোর্টে শরীরের নানা অসঙ্গতি ছিল। তাই মায়ের মৃত্যুর সঠিক রহস্য উদঘাটনে পুনরায় ময়নাতদন্তের দাবি জানিয়ে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এই এতিম তরুণ।

 

 

সম্পাদকীয়:প্রসঙ্গ: নাগরিক দুর্ভোগের অবসান হবে কবে?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬, ১১:৪৩ অপরাহ্ণ
সম্পাদকীয়:প্রসঙ্গ: নাগরিক দুর্ভোগের অবসান হবে কবে?

oppo_0

একটি আধুনিক ও প্রথম শ্রেণীর পৌরসভায় নাগরিকরা নিয়মিত কর পরিশোধ করবেন, আর বিনিময়ে পাবেন ন্যূনতম নাগরিক সুবিধাÑএটাই স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু সাতক্ষীরা পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডের মধ্যকাটিয়া এলাকার চিত্র দেখলে মনে হয়, সেখানকার বাসিন্দারা যেন কোনো পরিত্যক্ত জনপদে বসবাস করছেন। পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মধ্যকাটিয়ার একটি জনগুরুত্বপূর্ণ সড়ক দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাব এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার বেহাল দশার কারণে কার্যত একটি উন্মুক্ত নর্দমায় পরিণত হয়েছে। কাদা, প্লাস্টিক বর্জ্য এবং ড্রেনের উপচে পড়া কালো, দুর্গন্ধযুক্ত পানি মাড়িয়ে প্রতিদিন চলাচল করতে হচ্ছে হাজার হাজার মানুষকে। একই চিত্র সাতক্ষীরা তুফান কোম্পানীর মোড় থেকে পিএন স্কুল মোড় পর্যন্ত সড়টির। এ সড়কটির কোথাও আস্ত নেই।
একটি সভ্য সমাজে যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম সড়ক যদি এমন নরককু-ে পরিণত হয়, তবে তা অত্যন্ত দুঃখজনক ও লজ্জাজনক। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ড্রেনগুলো দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করায় পানি নিষ্কাশন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে সামান্য বৃষ্টি হলেই ড্রেনের ময়লা-আবর্জনা ও বিষাক্ত পানি উপচে রাস্তায় জমে থাকছে। রাস্তার বড় বড় গর্তগুলো এই নোংরা পানির নিচে লুকিয়ে থাকায় প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা। স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বৃদ্ধ ও নারীদের প্রতিদিন যে অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করতে হচ্ছে, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
ভোগান্তির এখানেই শেষ নয়; এই জমে থাকা নোংরা পানি ও আবর্জনার কারণে এলাকায় মশা-মাছির উপদ্রব মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে ডেঙ্গু, ডায়রিয়া ও চর্মরোগসহ বিভিন্ন প্রাণঘাতী স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে স্থানীয় বাসিন্দারা, বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা। এলাকার মানুষ ঘরের দরজা-জানালা পর্যন্ত খুলতে পারছেন না দুর্গন্ধের কারণে। অথচ নাগরিকরা নিয়মিত পৌরকর পরিশোধ করে যাচ্ছেন। ট্যাক্স দিয়েও কেন মানুষকে এমন আদিম ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের মধ্যে বাস করতে হবেÑএই প্রশ্ন এখন জোরালো হয়ে উঠেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, স্থানীয় বাসিন্দারা বারবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এই সমস্যার কথা জানালেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বর্ষা মৌসুম দরজায় কড়া নাড়ছে, এই অবস্থায় দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি যে আরও কতটা ভয়াবহ ও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়বে, তা সহজেই অনুমেয়।
পৌরসভার পক্ষ থেকে বরাবরের মতোই “বিষয়টি অবগত আছি এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে” ধরনের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমরা মনে করি, শুধু মুখের আশ্বাস বা আশ্বাসের চাদরে দুর্ভোগ ঢেকে রাখার সময় আর নেই। মধ্যকাটিয়াবাসীর এই দুর্ভোগ লাঘবে এখন প্রয়োজন তাৎক্ষণিক ও স্থায়ী সমাধান।
আমরা সাতক্ষীরা পৌরসভা কর্তৃপক্ষ ও জেলা প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই—অবিলম্বে মধ্যকাটিয়া এলাকার ড্রেনগুলো পরিষ্কার করে পানি নিষ্কাশনের স্থায়ী ব্যবস্থা করা হোক এবং ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাটি জরুরি ভিত্তিতে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হোক। নাগরিকদের সুস্থ ও নিরাপদভাবে বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করা পৌরসভার আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব। আশা করি, কর্তৃপক্ষ আর কালক্ষেপণ না করে দ্রুত মাঠে নামবেন এবং মধ্যকাটিয়াবাসীকে এই দুঃসহ নরকযন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেবেন।