প্রেসক্লাবের সংখ্যা নয়, বাড়ুক সাংবাদিকতার মান
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
একটি ঘর, কয়েকটি চেয়ার, একটি সাইনবোর্ডÑএগুলো দিয়ে একটি প্রেসক্লাবের অবকাঠামো তৈরি হতে পারে। কিন্তু সাংবাদিকতা তৈরি হয় না সেখানে। সাংবাদিকতা তৈরি হয় মানুষের মধ্যে, তাঁর চিন্তায়, তাঁর অনুসন্ধানে, তাঁর কলমে এবং সত্য প্রকাশের সাহসে। অথচ বর্তমানে বাংলাদেশের অনেক এলাকায় প্রেসক্লাবের সংখ্যা বাড়লেও সাংবাদিকতার মান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। একসময় প্রেসক্লাব ছিল সাংবাদিকদের প্রাণের ঠিকানা। দিনের সংবাদ সংগ্রহ শেষে সাংবাদিকরা সেখানে বসে অভিজ্ঞতা বিনিময় করতেন, সংবাদ নিয়ে আলোচনা করতেন, পেশাগত সংকটে একে অন্যের পাশে দাঁড়াতেন। প্রেসক্লাব ছিল সাংবাদিক ঐক্যের প্রতীক। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেক জায়গায় সেই চিত্র বদলে গেছে।
এখন কোথাও কোথাও প্রেসক্লাব যেন সাংবাদিকতার চর্চাকেন্দ্র না হয়ে পরিচয়ের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। একটি উপজেলায় একাধিক প্রেসক্লাব থাকা নতুন কোনো ঘটনা নয়। কোথাও ব্যক্তিগত মতবিরোধ, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, পদ-পদবি নিয়ে বিরোধ কিংবা সাংগঠনিক বিভাজনের কারণে নতুন নতুন প্রেসক্লাব তৈরি হচ্ছে। এতে সাংবাদিকতার প্রকৃত উদ্দেশ্য কতটা পূরণ হচ্ছে, সেই প্রশ্ন উঠছে। কারণ সাংবাদিকদের শক্তি বিভক্তিতে নয়, ঐক্যে।প্রেসক্লাবের মূল উদ্দেশ্য কখনোই ছিল না পরিচয়পত্র বিতরণ করা। এটি ছিল সাংবাদিকদের পেশাগত সংগঠন। কিন্তু দুঃখ জনক ভাবে কিছু ক্ষেত্রে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে, প্রেসক্লাবের সদস্য হলেই সাংবাদিক হওয়া যায়। অথচ বাস্তবতা হলো, সাংবাদিকতা কোনো সদস্যপদ নয়, এটি একটি অর্জন।
একজন সাংবাদিক প্রতিদিন মানুষের কাছে যান। তিনি কৃষকের মাঠে যান, শ্রমজীবী মানুষের কথা শোনেন, সাধারণ মানুষের সমস্যাকে তুলে ধরেন। তিনি সরকারি দপ্তরে তথ্য খোঁজেন, ঘটনার সত্যতা যাচাই করেন, বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য নেন। তাঁর লেখা যখন সমাজে পরিবর্তনের প্রশ্ন তোলে, তখনই তিনি সাংবাদিক হিসেবে পরিচিতি পান।একটি পরিচয়পত্র কখনো একজন সাংবাদিকের বিকল্প হতে পারে না। যেমন গলায় স্টেথোস্কোপ ঝুলিয়ে কেউ চিকিৎসক হয়ে যান না, তেমনি গলায় প্রেস কার্ড ঝুলালেই কেউ সাংবাদিক হয়ে যান না। একজন চিকিৎসকের পরিচয় তাঁর চিকিৎসাসেবা, একজন শিক্ষকের পরিচয় তাঁর জ্ঞান বিতরণ, আর একজন সাংবাদিকের পরিচয় তাঁর সংবাদ ও সততা।উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকতায় এই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গ্রামের মানুষের সমস্যা, দুর্নীতি, অনিয়ম, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, পরিবেশসহ নানা বিষয় প্রথমে স্থানীয় সাংবাদিকদের হাত ধরেই সামনে আসে।
একজন দায়িত্বশীল স্থানীয় সাংবাদিক একটি এলাকার মানুষের চোখ ও কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন।কিন্তু যখন সাংবাদিকতার জায়গায় পরিচয়ের প্রতিযোগিতা শুরু হয়, তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষ। কারণ সংবাদ মাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হয়। কিছু ব্যক্তি সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করলে পুরো সাংবাদিক সমাজকেই তার দায় বহন করতে হয়। তাই এখন প্রয়োজন প্রেসক্লাবের সংখ্যা বাড়ানোর চেয়ে সাংবাদিকতার গুণগত মান বাড়ানো। প্রেসক্লাবগুলোকে হতে হবে পেশাগত উন্নয়নের জায়গা। সেখানে নতুন সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ, সংবাদ লেখার কৌশল, তথ্য যাচাই, সাংবাদিকতার নৈতিকতা এবং জনস্বার্থের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে হবে।একই সঙ্গে সাংবাদিক সংগঠনগুলোর উচিত সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে আরও দায়িত্বশীল হওয়া।
শুধু পরিচিতি বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে নয়, একজনের কাজ, দক্ষতা ও পেশাগত আচরণ বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ একটি প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা নির্ভর করে তার সদস্যদের মানের ওপর। আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি শক্তিশালী প্রেসক্লাব গড়ে ওঠে শক্তিশালী সাংবাদিকদের নিয়ে। উল্টোভাবে কোনো দুর্বল পেশাগত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে একটি সাইনবোর্ড একটি প্রতিষ্ঠানকে মর্যাদাপূর্ণ করতে পারে না।
সাংবাদিকতা হলো মানুষের আস্থা অর্জনের পেশা। এখানে সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস অর্জন করতে হয় সত্য, সাহস ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে। কোনো কার্ড, পদবি বা সাইনবোর্ড সেই বিশ্বাস কিনে দিতে পারে না। তাই সময় এসেছে সাংবাদিকতার মূল চেতনায় ফিরে যাওয়ার। প্রেসক্লাব থাকবে, সংগঠন থাকবে, পরিচয় থাকবেÑকিন্তু সবার আগে থাকতে হবে সাংবাদিকতা। কারণ প্রেসক্লাব একটি জায়গা হতে পারে, একটি প্রতিষ্ঠান হতে পারে; কিন্তু সাংবাদিকতা হলো একজন মানুষের বিবেক, দায়িত্ব এবং সত্যের প্রতি অঙ্গীকার। প্রেসক্লাবের সংখ্যা নয়, বাড়ুক প্রকৃত সাংবাদিকের সংখ্যা। তাহলেই শক্তিশালী হবে গণমাধ্যম, সমৃদ্ধ হবে সমাজ এবং প্রতিষ্ঠিত হবে মানুষের আস্থা। লেখক-সংবাদকর্মী












