বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩ আশ্বিন ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩ আশ্বিন ১৪৩৩

বিশ্বকর্মা: জ্ঞান ও কর্মের প্রতীক/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৪:১৬ অপরাহ্ণ
বিশ্বকর্মা: জ্ঞান ও কর্মের প্রতীক/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

৩১ ভাদ্র এলেই হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে আসে দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার আরাধনার দিন। কারখানা, কর্মশালা, গ্যারেজ, স্বর্ণকারের দোকান, কাঠমিস্ত্রির ঘর কিংবা বিভিন্ন কারিগরি প্রতিষ্ঠানে এদিন যন্ত্রপাতি পরিষ্কার করে পূজা করা হয়। কোথাও ঘুড়ি ওড়ানো, কোথাও বিশেষ খাবারের আয়োজনÑসব মিলিয়ে বিশ্বকর্মা পূজা ধর্মীয় আচারের পাশাপাশি একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসবেও পরিণত হয়েছে। দুর্গাপূজার আগমনী আবহও যেন এই উৎসবের মধ্য দিয়ে অনুভূত হয়। কিন্তু বিশ্বকর্মা কে? কেন তাঁকে দেবশিল্পী বলা হয়? আর কেন তাঁর পূজার সঙ্গে জ্ঞান, যন্ত্র, শ্রম ও কর্মের সম্পর্ক এত গভীর? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হয় বৈদিক ও পুরাণের ঐতিহ্যে। ঋগ্বেদের দশম ম-লের ৮১ ও ৮২ সূক্তে বিশ্বকর্মার উল্লেখ রয়েছে।

 

সেখানে তাঁকে বিশ্বসৃষ্টি, সৃষ্টির পরিকল্পনা ও নির্মাণশক্তির সঙ্গে যুক্ত এক মহাশক্তি হিসেবে দেখা যায়। পরবর্তী পুরাণসাহিত্যে সেই ধারণাই আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠেÑবিশ্বকর্মা হয়ে ওঠেন দেবতাদের স্থপতি, কারিগর ও নির্মাতা। ‘বিশ্বকর্মা’ নামের মধ্যেই যেন তাঁর পরিচয়ের একটি ব্যাখ্যা রয়েছেÑবিশ্বের কর্ম, বিশ্বের নির্মাণ, বিশ্বের সৃজন। তাই তিনি শুধু কোনো একটি শিল্পের দেবতা নন; শিল্প, স্থাপত্য, কারিগরি জ্ঞান ও সৃষ্টিশীল কর্মের প্রতীক। পুরাণের বিভিন্ন আখ্যান অনুযায়ী দেবতাদের প্রাসাদ, রথ, অলংকার ও অস্ত্র নির্মাণের সঙ্গে তাঁর নাম যুক্ত। স্বর্ণলঙ্কা, দ্বারকা ও ইন্দ্রপ্রস্থের মতো পৌরাণিক স্থাপত্যকীর্তিও তাঁর নির্মাণ হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। বিষ্ণুর সুদর্শন চক্র, শিবের ত্রিশূল, ইন্দ্রের বজ্রসহ নানা ঐশ্বরিক অস্ত্রের নির্মাতা হিসেবেও তাঁকে স্মরণ করা হয়।

 

জগন্নাথের বিগ্রহ নির্মাণের সঙ্গেও বিশ্বকর্মার নাম লোকবিশ্বাস ও পুরাণকথায় জড়িয়ে আছে। এসব কাহিনি ইতিহাসের দলিল নয়; এগুলো ভারতীয় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। কিন্তু এসব আখ্যানের অন্তর্নিহিত দর্শন গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ যে শুধু প্রার্থনা করে না, নিজের জ্ঞান ও শ্রম দিয়ে পৃথিবীকে নির্মাণও করেÑবিশ্বকর্মার ধারণায় সেই সত্যটি প্রতিফলিত হয়। বিশ্বকর্মার প্রতীকী রূপেও রয়েছে জ্ঞান ও কর্মের সমন্বয়। তাঁর হাতে দেখা যায় বিভিন্ন নির্মাণযন্ত্র। কোথাও দাঁড়িপাল্লা জ্ঞান ও কর্মের ভারসাম্যের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। আবার হাতুড়ি, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য উপকরণ তাঁর শিল্পীসত্তা ও নির্মাণশক্তির প্রতীক। বাহন হাতি শক্তি, শ্রম ও কর্মক্ষমতার প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত। এখানেই বিশ্বকর্মা পূজার ধর্মীয় তাৎপর্য আরও গভীর হয়ে ওঠে। এই পূজা যেন মানুষকে মনে করিয়ে দেয়Ñশুধু জ্ঞান থাকলেই হবে না, সেই জ্ঞানকে কাজে প্রয়োগ করতে হবে। আবার শ্রম থাকলেই হবে না, শ্রমকে সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য প্রয়োজন জ্ঞান ও দক্ষতা। অর্থাৎ জ্ঞান পথ দেখায়, কর্ম সেই পথকে বাস্তবে রূপ দেয়। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। একটি ভবনের নকশা তৈরি করেন স্থপতি বা প্রকৌশলী; কিন্তু সেটিকে বাস্তবে দাঁড় করান রাজমিস্ত্রি, রডমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি, ইলেকট্রিশিয়ান ও নির্মাণশ্রমিক। কৃষিযন্ত্র সচল রাখেন মেকানিক, নৌযানের ইঞ্জিন মেরামত করেন কারিগর, কারখানার উৎপাদনব্যবস্থা সচল রাখেন দক্ষ প্রযুক্তিকর্মী। তাঁদের শ্রম ছাড়া কোনো পরিকল্পনাই পূর্ণতা পায় না। সাতক্ষীরার মতো উপকূলীয় অঞ্চলে এর বাস্তবতা আরও স্পষ্ট। নদী, খাল, বাঁধ, সড়ক, ঘরবাড়ি, নৌযান ও কৃষি অবকাঠামোর সঙ্গে স্থানীয় কারিগর ও নির্মাণশ্রমিকের জীবন ও দক্ষতা ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

 

প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ঘর মেরামত থেকে শুরু করে কৃষিযন্ত্র ও নৌযান সচল রাখাÑমানুষের দৈনন্দিন জীবন অনেকাংশেই তাঁদের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই শ্রমের যথাযথ মর্যাদা দিই? বিশ্বকর্মা পূজার দিনে যন্ত্রপাতিতে ফুল দেওয়া হয়, কর্মস্থলে পূজা হয়। কিন্তু যে শ্রমিক সেই যন্ত্র ব্যবহার করেন, তাঁর নিরাপত্তা কি নিশ্চিত? যিনি ভবনের ওপর দাঁড়িয়ে কাজ করেন, তাঁর মাথায় নিরাপত্তা সরঞ্জাম আছে কি? যিনি বৈদ্যুতিক কাজ করেন, তাঁর পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা আছে কি? একজন দক্ষ কারিগর তাঁর শ্রমের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন কি? বিশ্বকর্মা পূজার আধুনিক ধর্মীয় ব্যাখ্যা খুঁজতে গেলে এসব প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না। কারণ শ্রমের প্রতি শ্রদ্ধা শুধু পূজার আনুষ্ঠানিকতায় প্রকাশ পেলে তার পূর্ণতা আসে না। শ্রমিকের নিরাপত্তা, ন্যায্য মজুরি, কর্মপরিবেশ এবং সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করার মধ্যেই শ্রমের প্রকৃত সম্মান। বিশ্বকর্মার আরেকটি বড় শিক্ষা হলো দক্ষতা।

 

বর্তমান পৃথিবীতে শুধু সাধারণ শিক্ষা নয়, কারিগরি ও ব্যবহারিক জ্ঞানের গুরুত্বও ক্রমেই বাড়ছে। বাংলাদেশেও তরুণদের কর্মসংস্থানের জন্য কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একজন দক্ষ ইলেকট্রিশিয়ান, ওয়েল্ডার, মেকানিক, নির্মাণশ্রমিক কিংবা কারিগর তাঁর অভিজ্ঞতা ও ব্যবহারিক জ্ঞান দিয়ে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন পূরণ করেন। আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন প্রয়োজন। শিক্ষিত মানুষ মানেই শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদধারী নয়। হাতে-কলমে কাজের দক্ষতাও এক ধরনের জ্ঞান। একজন অভিজ্ঞ কারিগরের জ্ঞান বইয়ের পাতায় সবসময় পাওয়া যায় না; তা তৈরি হয় দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ ও অনুশীলনের মধ্য দিয়ে। এই জায়গায় বিশ্বকর্মা পূজা একটি বড় সামাজিক বার্তা বহন করেÑকর্মকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।

 

বিশ্বকর্মাকে ‘দেবশিল্পী’ বলা হয়। কিন্তু তাঁর আরাধনার সবচেয়ে আধুনিক ব্যাখ্যা হতে পারেÑসৃষ্টিশীল মানুষকে সম্মান করা। যে মানুষ নিজের দক্ষতা দিয়ে কিছু নির্মাণ করেন, মেরামত করেন, উৎপাদন করেন কিংবা অন্যের জীবনকে সহজ করেন, তিনি সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। স্থাপত্যের ক্ষেত্রেও বিশ্বকর্মার ধারণা তাৎপর্যপূর্ণ। প্রাচীন ভারতীয় স্থাপত্যচিন্তায় জমি নির্বাচন, দিক নির্ণয়, মাপজোক, আলো-বাতাস, নির্মাণসামগ্রী, গৃহ, মন্দির, জলাধার ও নগর পরিকল্পনার মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা ছিল। অর্থাৎ নির্মাণকে শুধু সৌন্দর্যের বিষয় হিসেবে দেখা হয়নি; ব্যবহার, পরিবেশ ও মানুষের প্রয়োজনকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আজকের বাংলাদেশে দ্রুত নগরায়ণ ও অবকাঠামো নির্মাণের সময়ে এই দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।

 

শুধু দ্রুত নির্মাণ নয়, নিরাপদ ও টেকসই নির্মাণও জরুরি। একটি ভবন দাঁড়িয়ে গেলেই কাজ শেষ নয়; সেটি কতটা নিরাপদ, কতটা পরিবেশবান্ধব এবং কতদিন টিকে থাকবেÑসেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। তাই বিশ্বকর্মা পূজা আমাদের সামনে দুটি পথের কথা বলেÑজ্ঞান এবং কর্ম। জ্ঞানহীন কর্ম যেমন অন্ধ, তেমনি কর্মহীন জ্ঞানও অসম্পূর্ণ। পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন, মেধা ও শ্রম, প্রযুক্তি ও দক্ষতাÑসবকিছুর সমন্বয়েই সভ্যতা এগিয়ে যায়। ধর্মীয় বিশ্বাসের জায়গা থেকে বিশ্বকর্মা দেবশিল্পী। দর্শনের জায়গা থেকে তিনি সৃষ্টিশীলতার প্রতীক। আর সামাজিক জীবনের জায়গা থেকে তিনি শ্রম ও দক্ষতার মর্যাদার প্রতীক।

 

এই কারণেই বিশ্বকর্মা পূজা শুধু একটি দিনের ধর্মীয় উৎসব নয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়Ñমানুষের হাতে থাকা যন্ত্র কেবল লোহা নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের জ্ঞান, শ্রম ও স্বপ্ন। আসুন, দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার আরাধনায় আমরা জ্ঞান ও কর্মের মধ্যে ভারসাম্য কামনা করি। দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা করি, শ্রমজীবী মানুষের মর্যাদা দিই, কর্মক্ষেত্রকে নিরাপদ করি এবং মানুষের কল্যাণে জ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করি। বিশ্বকর্মার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা হয়তো সেখানেইÑজ্ঞানকে কর্মে রূপ দেওয়া এবং কর্মকে মর্যাদা দেওয়া।

সচ্চিদানন্দ দে সদয়, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী, আশাশুনি, সাতক্ষীরা
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

Ads small one

বৃষ্টি উপেক্ষা করে নৌকা বাইচ দেখতে চিত্রা নদীতে মানুষের ঢল

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:৩৯ অপরাহ্ণ
বৃষ্টি উপেক্ষা করে নৌকা বাইচ দেখতে চিত্রা নদীতে মানুষের ঢল

সৈয়দ অনুজ, ফকিরহাট (বাগেরহাট): বাগেরহাটের ফকিরহাটে উৎসবমূখর পরিবেশে মায়ারখালী চিত্রা নদীতে ৩৬তম বার্ষিক গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

নৌকাবাইচ দেখতে নদীর দুই পাড়ে হাজারো দর্শনার্থীদের ঢল নামে। বৃষ্টি উপেক্ষা করে বাঙালি সংস্কৃতির প্রাচীনতম এ উৎসব উপভোগ করতে শিশু-কিশোর ও নারী-পুরুষ সহ নানা বয়সের মানুষ আনন্দে মেঠে উঠে।

বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে এ প্রতিযোগিতা। এতে ১০টি নৌকা অংশগ্রহন করে। নৌকাবাইচ এর আয়োজন করে মায়ারখালী যুব সংঘ।

এসময় অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন আয়োজন কমিটির সভাপতি পরিতোষ বাগচী, সাধারন সম্পাদক রঞ্জন বালা ও মিল্টন শাখারীসহ কমিটির কিরন মন্ডল, পঞ্চানন বিশ্বাস, গৌতম বিশ্বাস, সঞ্জিত বিশ্বাস, মনোজ গাইন, মিলন মোহšসহ অন্যান্যরা। নৌকা বাইচ শেষে বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়।

সমান কাজের সমান মজুরি: ন্যায়বিচার ন্যায্যদাবি

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:০৯ অপরাহ্ণ
সমান কাজের সমান মজুরি: ন্যায়বিচার ন্যায্যদাবি

সাকিবুর রহমান বাবলা

একজন মানুষ নারী না পুরুষ-তার ভিত্তিতে শ্রমের মূল্য নির্ধারণ করা যায় না। কাজের ধরন, দক্ষতা, দায়িত্ব ও শ্রমের মূল্য যদি সমান হয়, তবে পারিশ্রমিকেও বৈষম্য থাকার কথা নয়। অথচ বাস্তবে বিশ্বের বহু কর্মক্ষেত্রে নারী এখনো পুরুষের তুলনায় কম মজুরি পান। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে নারীরা গড়ে পুরুষের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ কম পারিশ্রমিক পান। এই বাস্তবতা দূর করার আহ্বান জানিয়ে প্রতি বছর ১৮ সেপ্টেম্বর পালিত হয় আন্তর্জাতিক সমান মজুরি দিবস। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৪/১৪২ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে দিবসটির স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং ২০২০ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক সমান মজুরি দিবস পালিত হয়।

সমান মজুরি বলতে শুধু একই ধরনের কাজের জন্য একই টাকা বোঝায় না। সমান মূল্যের কাজের জন্য সমান পারিশ্রমিক-এই নীতিটি আরও বিস্তৃত। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ১০০ নম্বর কনভেনশনে নারী ও পুরুষের সমান মূল্যের কাজের জন্য লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য ছাড়া সমান পারিশ্রমিকের নীতি নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ১৯৯৮ সালে এই কনভেনশন অনুমোদন করেছে।

জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-এর ৮ নম্বর লক্ষ্যের ৮.৫ নম্বর লক্ষ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে নারী-পুরুষ সবার জন্য পূর্ণ ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান, শোভন কাজ এবং সমান মূল্যের কাজের জন্য সমান মজুরি নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি, লিঙ্গসমতা ও নারীর ক্ষমতায়নও এসডিজির গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। সমান মজুরি নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা, ইউএন উইমেনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা কাজ করছে। ইকুয়াল পে ইন্টারন্যাশনাল কোয়ালিশন-এর মাধ্যমে সরকার, নিয়োগকর্তা, শ্রমিক সংগঠন ও অন্যান্য অংশীজনকে সমান মজুরি বাস্তবায়নে সহযোগিতা করা হচ্ছে।

সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান। ২৮(১) অনুচ্ছেদে ধর্ম, বর্ণ, গোষ্ঠী, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে বৈষম্য না করার কথা বলা হয়েছে। ২৮(২) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে। আবার ২৯ অনুচ্ছেদে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের সুযোগের সমতার কথা বলা হয়েছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো সংবিধানের ২০ অনুচ্ছেদ। সেখানে কর্মকে অধিকার, কর্তব্য ও সম্মানের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করে যোগ্যতা ও কাজের ভিত্তিতে পারিশ্রমিকের নীতির কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ শ্রমের মর্যাদা এবং শ্রমের ন্যায্য মূল্য-দুটিই রাষ্ট্রের মৌলিক দর্শনের অংশ।

বাংলাদেশ শ্রম আইনেও সমান মজুরির বিষয়ে স্পষ্ট বিধান রয়েছে। শ্রম আইনের ৩৪৫ ধারায় একই প্রকৃতির বা একই মান বা মূল্যের কাজের জন্য পুরুষ, নারী ও প্রতিবন্ধী শ্রমিকদের সমান মজুরির নীতি অনুসরণের কথা বলা হয়েছে এবং এ বিষয়ে বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সংশোধিত আইনের ৩৪৫ক ধারায় জাতি, বর্ণ, লিঙ্গ, লিঙ্গ পরিচয়, ধর্ম, রাজনৈতিক মতামত, জাতীয়তা, সামাজিক অবস্থান, বংশ বা প্রতিবন্ধিতার কারণে বৈষম্যমূলক আচরণও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

তবে আইন থাকলেই বৈষম্য শেষ হয়ে যায় না। বাস্তব জীবনে অনেক নারী এখনো কৃষিকাজ, দিনমজুরি, গৃহস্থালি শ্রম, পোশাকশিল্প, নির্মাণকাজসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কম মজুরির মুখোমুখি হন। আইএলওর বাংলাদেশের তথ্যেও বিভিন্ন পেশায় নারী-পুরুষের মজুরি ব্যবধানের কথা উঠে এসেছে এবং অনানুষ্ঠানিক খাতে নারীর অংশগ্রহণ বেশি থাকার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

ধর্মীয় শিক্ষাতেও শ্রমের মর্যাদা ও ন্যায্য পারিশ্রমিকের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইসলামে শ্রমিকের পাওনা যথাসময়ে পরিশোধের শিক্ষা রয়েছে। কোরআনে মানুষের নিজ নিজ অর্জন ও প্রচেষ্টার কথা বলা হয়েছে। খ্রিস্টীয় শিক্ষাতেও শ্রমিক তার পারিশ্রমিকের যোগ্য-এই নীতি স্পষ্ট। সনাতন ধর্মীয় দর্শনেও কর্ম, কর্তব্য ও ন্যায়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ধর্মের ভাষা ভিন্ন হলেও শ্রমের ন্যায্য মূল্য এবং মানুষের মর্যাদার বিষয়টি বিভিন্ন ধর্মীয় শিক্ষায় গুরুত্ব পেয়েছে।

সমান মজুরি তাই শুধু নারীর অধিকার নয়; এটি ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক দায়িত্বের বিষয়। একজন নারী একই যোগ্যতা, সময়, শ্রম ও দায়িত্ব নিয়ে কাজ করলে শুধু নারী হওয়ার কারণে তার পারিশ্রমিক কমিয়ে দেওয়া তার শ্রমের মর্যাদাকে ছোট করা। আবার একজন পুরুষকে শুধু পুরুষ হওয়ার কারণে বেশি পারিশ্রমিক দেওয়াও ন্যায্যতার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

এই পরিবর্তন শুধু সরকার বা আদালতের মাধ্যমে সম্ভব নয়। একজন সচেতন নাগরিকেরও দায়িত্ব রয়েছে। পরিবারে গৃহস্থালি কাজকে শুধু নারীর দায়িত্ব মনে না করা, কর্মক্ষেত্রে স্বচ্ছ বেতন কাঠামো রাখা, একই কাজের জন্য বৈষম্যমূলক মজুরি না দেওয়া, শ্রমিককে তার অধিকার সম্পর্কে জানানো এবং কোথাও বৈষম্য দেখা গেলে প্রতিবাদ করা-এসবই নাগরিক দায়িত্বের অংশ।
নিয়োগকর্তাদেরও দায়িত্ব কম নয়। যোগ্যতা ও কাজের মূল্যায়নের ভিত্তিতে বেতন নির্ধারণ, পদোন্নতিতে সমান সুযোগ, কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ পরিবেশ এবং বেতন কাঠামোয় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। নারী শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ ও নেতৃত্বের সুযোগও বাড়াতে হবে।

সমান মজুরি দিবস আমাদের শুধু একটি আন্তর্জাতিক দিবসের কথা মনে করিয়ে দেয় না; এটি আমাদের চারপাশের শ্রমজীবী মানুষের দিকে নতুন করে তাকাতে শেখায়। একজন কৃষিশ্রমিক নারী, একজন পোশাকশ্রমিক, একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী, একজন শিক্ষক কিংবা একজন পেশাজীবী-প্রত্যেকের শ্রমের মূল্য আছে। কাজের মূল্য যেন মানুষের লিঙ্গ দিয়ে নির্ধারিত না হয়, সেটিই এই দিবসের মূল শিক্ষা।

সমান কাজের সমান মজুরি কোনো দয়া নয়, কোনো অনুগ্রহও নয়-এটি ন্যায়সঙ্গত অধিকার। আইন, সংবিধান, আন্তর্জাতিক শ্রমনীতি, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও মানবিক নৈতিকতা-সবকিছুর আলোকে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি কর্মসমাজ, যেখানে মানুষ তার পরিচয়ের কারণে নয়, তার কাজের ন্যায্য মূল্য অনুযায়ী পারিশ্রমিক পাবে। সেই সমাজ গড়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের যেমন, তেমনি নিয়োগকর্তা, শ্রমিক, পরিবার এবং প্রত্যেক সচেতন নাগরিকেরও।

সাতক্ষীরা সরকারি কলেজে মিয়াওয়াকি বনায়নের উদ্বোধন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:৫৯ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরা সরকারি কলেজে মিয়াওয়াকি বনায়নের উদ্বোধন

সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ প্রাঙ্গণে বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬) মিয়াওয়াকি বনায়নের উদ্বোধন ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর আবুল হাসেম। অনুষ্ঠানে উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর ড. নাসরিন আক্তারসহ কলেজের ১৬টি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান, উত্তরণ ও প্র্যাকটিক্যাল এ্যাকশন এর কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনের সহযোগিতায় উত্তরণ কর্তৃক বাস্তবায়িত জুরিখ ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স প্রোগ্রাম এর আওতায় কলেজ প্রাঙ্গণে এই মিয়াওয়াকি বন গড়ে তোলা হচ্ছে। কলেজের ৬৮ শতাংশ জমিতে বৃক্ষ, ভেষজ, গুল্ম, লতা এবং ঝোপ জাতীয় ১০০ প্রজাতির প্রায় ৮,০০০টি দেশীয় চারা রোপণের মাধ্যমে গড়ে উঠবে এই বন।

কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের তত্ত্বাবধানে এবং ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স ক্লাবের সদস্যদের অংশগ্রহণে পরিচালিত হবে এই উদ্যোগ। শিক্ষার্থীদের সক্রিয় সম্পৃক্ততার মাধ্যমে বনটির পরিচর্যা, সংরক্ষণ ও পরিবেশবিষয়ক বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হবে।

প্রকৃতি ভিত্তিক সমাধানের এই উদ্যোগ সাতক্ষীরা শহরে সবুজায়ন বৃদ্ধি, নগর তাপদাহের প্রভাব কমানো, পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখা এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে অবদান রাখবে।
একইসঙ্গে, এটি শিক্ষার্থীদের জন্য উদ্ভিদ পরিচিতি, পরিবেশ শিক্ষা, ব্যবহারিক জ্ঞান ও গবেষণার নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক এমন উদ্যোগ জলবায়ু সহনশীলতা গড়ে তোলার পাশাপাশি তরুণদের পরিবেশ সংরক্ষণে আরও সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনে উৎসাহিত করবে। প্রেসবিজ্ঞপ্তি