সচ্চিদানন্দ দে সদয়
৩১ ভাদ্র এলেই হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে আসে দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার আরাধনার দিন। কারখানা, কর্মশালা, গ্যারেজ, স্বর্ণকারের দোকান, কাঠমিস্ত্রির ঘর কিংবা বিভিন্ন কারিগরি প্রতিষ্ঠানে এদিন যন্ত্রপাতি পরিষ্কার করে পূজা করা হয়। কোথাও ঘুড়ি ওড়ানো, কোথাও বিশেষ খাবারের আয়োজনÑসব মিলিয়ে বিশ্বকর্মা পূজা ধর্মীয় আচারের পাশাপাশি একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসবেও পরিণত হয়েছে। দুর্গাপূজার আগমনী আবহও যেন এই উৎসবের মধ্য দিয়ে অনুভূত হয়। কিন্তু বিশ্বকর্মা কে? কেন তাঁকে দেবশিল্পী বলা হয়? আর কেন তাঁর পূজার সঙ্গে জ্ঞান, যন্ত্র, শ্রম ও কর্মের সম্পর্ক এত গভীর? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হয় বৈদিক ও পুরাণের ঐতিহ্যে। ঋগ্বেদের দশম ম-লের ৮১ ও ৮২ সূক্তে বিশ্বকর্মার উল্লেখ রয়েছে।
সেখানে তাঁকে বিশ্বসৃষ্টি, সৃষ্টির পরিকল্পনা ও নির্মাণশক্তির সঙ্গে যুক্ত এক মহাশক্তি হিসেবে দেখা যায়। পরবর্তী পুরাণসাহিত্যে সেই ধারণাই আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠেÑবিশ্বকর্মা হয়ে ওঠেন দেবতাদের স্থপতি, কারিগর ও নির্মাতা। ‘বিশ্বকর্মা’ নামের মধ্যেই যেন তাঁর পরিচয়ের একটি ব্যাখ্যা রয়েছেÑবিশ্বের কর্ম, বিশ্বের নির্মাণ, বিশ্বের সৃজন। তাই তিনি শুধু কোনো একটি শিল্পের দেবতা নন; শিল্প, স্থাপত্য, কারিগরি জ্ঞান ও সৃষ্টিশীল কর্মের প্রতীক। পুরাণের বিভিন্ন আখ্যান অনুযায়ী দেবতাদের প্রাসাদ, রথ, অলংকার ও অস্ত্র নির্মাণের সঙ্গে তাঁর নাম যুক্ত। স্বর্ণলঙ্কা, দ্বারকা ও ইন্দ্রপ্রস্থের মতো পৌরাণিক স্থাপত্যকীর্তিও তাঁর নির্মাণ হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। বিষ্ণুর সুদর্শন চক্র, শিবের ত্রিশূল, ইন্দ্রের বজ্রসহ নানা ঐশ্বরিক অস্ত্রের নির্মাতা হিসেবেও তাঁকে স্মরণ করা হয়।
জগন্নাথের বিগ্রহ নির্মাণের সঙ্গেও বিশ্বকর্মার নাম লোকবিশ্বাস ও পুরাণকথায় জড়িয়ে আছে। এসব কাহিনি ইতিহাসের দলিল নয়; এগুলো ভারতীয় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। কিন্তু এসব আখ্যানের অন্তর্নিহিত দর্শন গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ যে শুধু প্রার্থনা করে না, নিজের জ্ঞান ও শ্রম দিয়ে পৃথিবীকে নির্মাণও করেÑবিশ্বকর্মার ধারণায় সেই সত্যটি প্রতিফলিত হয়। বিশ্বকর্মার প্রতীকী রূপেও রয়েছে জ্ঞান ও কর্মের সমন্বয়। তাঁর হাতে দেখা যায় বিভিন্ন নির্মাণযন্ত্র। কোথাও দাঁড়িপাল্লা জ্ঞান ও কর্মের ভারসাম্যের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। আবার হাতুড়ি, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য উপকরণ তাঁর শিল্পীসত্তা ও নির্মাণশক্তির প্রতীক। বাহন হাতি শক্তি, শ্রম ও কর্মক্ষমতার প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত। এখানেই বিশ্বকর্মা পূজার ধর্মীয় তাৎপর্য আরও গভীর হয়ে ওঠে। এই পূজা যেন মানুষকে মনে করিয়ে দেয়Ñশুধু জ্ঞান থাকলেই হবে না, সেই জ্ঞানকে কাজে প্রয়োগ করতে হবে। আবার শ্রম থাকলেই হবে না, শ্রমকে সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য প্রয়োজন জ্ঞান ও দক্ষতা। অর্থাৎ জ্ঞান পথ দেখায়, কর্ম সেই পথকে বাস্তবে রূপ দেয়। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। একটি ভবনের নকশা তৈরি করেন স্থপতি বা প্রকৌশলী; কিন্তু সেটিকে বাস্তবে দাঁড় করান রাজমিস্ত্রি, রডমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি, ইলেকট্রিশিয়ান ও নির্মাণশ্রমিক। কৃষিযন্ত্র সচল রাখেন মেকানিক, নৌযানের ইঞ্জিন মেরামত করেন কারিগর, কারখানার উৎপাদনব্যবস্থা সচল রাখেন দক্ষ প্রযুক্তিকর্মী। তাঁদের শ্রম ছাড়া কোনো পরিকল্পনাই পূর্ণতা পায় না। সাতক্ষীরার মতো উপকূলীয় অঞ্চলে এর বাস্তবতা আরও স্পষ্ট। নদী, খাল, বাঁধ, সড়ক, ঘরবাড়ি, নৌযান ও কৃষি অবকাঠামোর সঙ্গে স্থানীয় কারিগর ও নির্মাণশ্রমিকের জীবন ও দক্ষতা ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ঘর মেরামত থেকে শুরু করে কৃষিযন্ত্র ও নৌযান সচল রাখাÑমানুষের দৈনন্দিন জীবন অনেকাংশেই তাঁদের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই শ্রমের যথাযথ মর্যাদা দিই? বিশ্বকর্মা পূজার দিনে যন্ত্রপাতিতে ফুল দেওয়া হয়, কর্মস্থলে পূজা হয়। কিন্তু যে শ্রমিক সেই যন্ত্র ব্যবহার করেন, তাঁর নিরাপত্তা কি নিশ্চিত? যিনি ভবনের ওপর দাঁড়িয়ে কাজ করেন, তাঁর মাথায় নিরাপত্তা সরঞ্জাম আছে কি? যিনি বৈদ্যুতিক কাজ করেন, তাঁর পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা আছে কি? একজন দক্ষ কারিগর তাঁর শ্রমের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন কি? বিশ্বকর্মা পূজার আধুনিক ধর্মীয় ব্যাখ্যা খুঁজতে গেলে এসব প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না। কারণ শ্রমের প্রতি শ্রদ্ধা শুধু পূজার আনুষ্ঠানিকতায় প্রকাশ পেলে তার পূর্ণতা আসে না। শ্রমিকের নিরাপত্তা, ন্যায্য মজুরি, কর্মপরিবেশ এবং সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করার মধ্যেই শ্রমের প্রকৃত সম্মান। বিশ্বকর্মার আরেকটি বড় শিক্ষা হলো দক্ষতা।
বর্তমান পৃথিবীতে শুধু সাধারণ শিক্ষা নয়, কারিগরি ও ব্যবহারিক জ্ঞানের গুরুত্বও ক্রমেই বাড়ছে। বাংলাদেশেও তরুণদের কর্মসংস্থানের জন্য কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একজন দক্ষ ইলেকট্রিশিয়ান, ওয়েল্ডার, মেকানিক, নির্মাণশ্রমিক কিংবা কারিগর তাঁর অভিজ্ঞতা ও ব্যবহারিক জ্ঞান দিয়ে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন পূরণ করেন। আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন প্রয়োজন। শিক্ষিত মানুষ মানেই শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদধারী নয়। হাতে-কলমে কাজের দক্ষতাও এক ধরনের জ্ঞান। একজন অভিজ্ঞ কারিগরের জ্ঞান বইয়ের পাতায় সবসময় পাওয়া যায় না; তা তৈরি হয় দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ ও অনুশীলনের মধ্য দিয়ে। এই জায়গায় বিশ্বকর্মা পূজা একটি বড় সামাজিক বার্তা বহন করেÑকর্মকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।
বিশ্বকর্মাকে ‘দেবশিল্পী’ বলা হয়। কিন্তু তাঁর আরাধনার সবচেয়ে আধুনিক ব্যাখ্যা হতে পারেÑসৃষ্টিশীল মানুষকে সম্মান করা। যে মানুষ নিজের দক্ষতা দিয়ে কিছু নির্মাণ করেন, মেরামত করেন, উৎপাদন করেন কিংবা অন্যের জীবনকে সহজ করেন, তিনি সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। স্থাপত্যের ক্ষেত্রেও বিশ্বকর্মার ধারণা তাৎপর্যপূর্ণ। প্রাচীন ভারতীয় স্থাপত্যচিন্তায় জমি নির্বাচন, দিক নির্ণয়, মাপজোক, আলো-বাতাস, নির্মাণসামগ্রী, গৃহ, মন্দির, জলাধার ও নগর পরিকল্পনার মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা ছিল। অর্থাৎ নির্মাণকে শুধু সৌন্দর্যের বিষয় হিসেবে দেখা হয়নি; ব্যবহার, পরিবেশ ও মানুষের প্রয়োজনকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আজকের বাংলাদেশে দ্রুত নগরায়ণ ও অবকাঠামো নির্মাণের সময়ে এই দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।
শুধু দ্রুত নির্মাণ নয়, নিরাপদ ও টেকসই নির্মাণও জরুরি। একটি ভবন দাঁড়িয়ে গেলেই কাজ শেষ নয়; সেটি কতটা নিরাপদ, কতটা পরিবেশবান্ধব এবং কতদিন টিকে থাকবেÑসেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। তাই বিশ্বকর্মা পূজা আমাদের সামনে দুটি পথের কথা বলেÑজ্ঞান এবং কর্ম। জ্ঞানহীন কর্ম যেমন অন্ধ, তেমনি কর্মহীন জ্ঞানও অসম্পূর্ণ। পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন, মেধা ও শ্রম, প্রযুক্তি ও দক্ষতাÑসবকিছুর সমন্বয়েই সভ্যতা এগিয়ে যায়। ধর্মীয় বিশ্বাসের জায়গা থেকে বিশ্বকর্মা দেবশিল্পী। দর্শনের জায়গা থেকে তিনি সৃষ্টিশীলতার প্রতীক। আর সামাজিক জীবনের জায়গা থেকে তিনি শ্রম ও দক্ষতার মর্যাদার প্রতীক।
এই কারণেই বিশ্বকর্মা পূজা শুধু একটি দিনের ধর্মীয় উৎসব নয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়Ñমানুষের হাতে থাকা যন্ত্র কেবল লোহা নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের জ্ঞান, শ্রম ও স্বপ্ন। আসুন, দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার আরাধনায় আমরা জ্ঞান ও কর্মের মধ্যে ভারসাম্য কামনা করি। দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা করি, শ্রমজীবী মানুষের মর্যাদা দিই, কর্মক্ষেত্রকে নিরাপদ করি এবং মানুষের কল্যাণে জ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করি। বিশ্বকর্মার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা হয়তো সেখানেইÑজ্ঞানকে কর্মে রূপ দেওয়া এবং কর্মকে মর্যাদা দেওয়া।
সচ্চিদানন্দ দে সদয়, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী, আশাশুনি, সাতক্ষীরা
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬