মাদকে আসক্ত হওয়ার আগের কথা : যা কেউ বলে না
আখলাকুর রহমান
সাতক্ষীরার মাটিতে যে বিষবৃক্ষ শিকড় গেড়েছে, তাকে উপড়ে ফেলার সময় এখনই, নইলে আগামী প্রজন্ম শুধু ধ্বংসস্তূপ পাবে। ইতিহাস সাক্ষী, যে জাতি নেশার অন্ধকারে ডুবেছে, সে জাতি কখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেনি। উনিশ শতকে চীনের আফিম যুদ্ধের করুণ ইতিহাস আমাদের শেখায়, একটি জাতিকে ধ্বংস করতে বন্দুকের প্রয়োজন হয় না, শুধু কয়েক প্যাকেট মাদকই যথেষ্ট।
আজ সাতক্ষীরার আকাশে বাতাসেও সেই একই বিপদের ঘণ্টা বাজছে। সীমান্তবর্তী এই জনপদ দীর্ঘদিন ধরে মাদক পাচারের এক নীরব করিডোর হয়ে উঠেছে। যে হাত একদিন কলম ধরে ভবিষ্যৎ গড়ার কথা ছিল, সেই হাতেই আজ উঠে আসছে ধ্বংসের উপকরণ।
তবে আশার কথা এই যে, ঘুম ভাঙছে সাতক্ষীরাবাসীর। পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় মহল্লায় আজ যে সচেতনতামূলক মিছিল দেখা যাচ্ছে, তা নিছক প্রতীকী প্রতিবাদ নয়, এটি একটি জাতির আত্মরক্ষার প্রথম পদক্ষেপ। মায়েরা রাস্তায় নেমেছেন সন্তানকে বাঁচাতে, তরুণরা কণ্ঠ মিলিয়েছেন নিজেদের ভবিষ্যৎ রক্ষায়, এই দৃশ্য সত্যিই আশাব্যঞ্জক।
কিন্তু শুধু মিছিল আর স্লোগানেই এই যুদ্ধ জেতা যাবে না। প্রয়োজন সুসংগঠিত, ধারাবাহিক ও কার্যকর উদ্যোগ। এক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিস্তারিতভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
প্রথমত, পাড়া-মহল্লা ভিত্তিক প্রতিরোধ কমিটি গঠন : প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় গঠন করা প্রয়োজন একটি ‘মাদকবিরোধী প্রতিরোধ কমিটি’, যেখানে থাকবেন এলাকার সম্মানিত প্রবীণ, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সচেতন তরুণ সমাজ। এই কমিটি নিয়মিত বৈঠকের মাধ্যমে এলাকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করবে এবং সন্দেহভাজন কার্যকলাপের তথ্য দ্রুত প্রশাসনের কাছে পৌঁছে দেবে।
দ্বিতীয়ত, স্বেচ্ছাসেবী পাহারা দল : রাত্রিকালীন সময়ে তরুণদের সমন্বয়ে গঠিত হতে পারে স্বেচ্ছাসেবী পাহারা দল, যারা এলাকার সন্দেহভাজন গতিবিধির উপর নজর রাখবে এবং প্রশাসনকে তাৎক্ষণিক তথ্য দেবে। তবে এই পাহারা যেন কখনোই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার পর্যায়ে না যায়, এটি হতে হবে সম্পূর্ণভাবে আইনানুগ ও প্রশাসনের সহযোগী।
তৃতীয়ত, বিদ্যালয়ে সচেতনতামূলক সেমিনার: মাদকবিরোধী লড়াইয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো বিদ্যালয়। প্রতিটি স্কুলে নিয়মিত বিরতিতে আয়োজন করা প্রয়োজন সচেতনতামূলক সেমিনার। এই সেমিনারে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, চিকিৎসক, মনোবিজ্ঞানী বা যারা মাদক পুনর্বাসন বিষয়ে অভিজ্ঞ, তাদের সরাসরি উপস্থিত থেকে শিক্ষার্থীদের সহজ ভাষায় বোঝাতে হবে মাদক কীভাবে একটি জীবনকে ধ্বংস করে দেয়। শুধু ভয় দেখানো নয়, বরং বাস্তব উদাহরণ ও গল্পের মাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরলে তা শিশুদের মনে গভীর দাগ কাটে।
বিশেষভাবে লক্ষ রাখতে হবে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের প্রতি। এই বয়সটি একজন কিশোরের জীবনের সবচেয়ে স্পর্শকাতর সময়। কৌতূহল, বন্ধুদের প্রভাব আর নিজেকে বড় প্রমাণ করার তাড়না থেকে এই বয়সেই অনেকে প্রথমবার মাদকের সংস্পর্শে আসে। আর দুঃখজনক সত্য হলো, এই বয়সে একবার মাদকমুখী হয়ে গেলে তাকে ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তাই এই বয়সের শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদাভাবে, আরও ঘনঘন এবং আরও যতœ সহকারে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা জরুরি। শিক্ষক ও অভিভাবকদের উচিত এই বয়সী শিক্ষার্থীদের আচরণ, বন্ধু নির্বাচন ও দৈনন্দিন কার্যক্রমের প্রতি বাড়তি মনোযোগ দেওয়া।
চতুর্থত, সহপাঠীদের মাধ্যমে গোপন তথ্য প্রদানের ব্যবস্থা: একজন কিশোর নিজের সমবয়সী বন্ধুর আচরণ সবচেয়ে ভালো বুঝতে পারে, এমনকি অভিভাবক বা শিক্ষকের চেয়েও বেশি। তাই বিদ্যালয়ে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে কোনো শিক্ষার্থী যদি তার কোনো সহপাঠীর মধ্যে মাদকের প্রতি ঝোঁক বা সন্দেহজনক আচরণ লক্ষ করে, তবে সে নিজের পরিচয় গোপন রেখেই তা জানাতে পারে। এক্ষেত্রে কয়েকটি সহজ পদ্ধতি কাজে লাগানো যেতে পারে!
প্রতিটি বিদ্যালয়ে একটি ‘গোপন পরামর্শ বাক্স’ রাখা যেতে পারে, যেখানে শিক্ষার্থীরা নাম না লিখেই কাগজে তথ্য জমা দিতে পারবে। একজন নির্দিষ্ট শিক্ষক বা কাউন্সেলরকে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে, যার সাথে শিক্ষার্থীরা সরাসরি এবং বিশ্বস্তভাবে কথা বলতে পারবে, এবং তিনি সেই তথ্য কারো কাছে প্রকাশ করবেন না বলে নিশ্চয়তা দেবেন। একটি গোপন মোবাইল নম্বর বা হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর চালু করা যেতে পারে, যেখানে পরিচয় প্রকাশ না করেই বার্তা পাঠানো যাবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিক্ষার্থীদের এই বিশ্বাস দিতে হবে যে বন্ধুর কথা জানানো মানে বিশ্বাসঘাতকতা নয়, বরং সেই বন্ধুর জীবন বাঁচানোর একটি সাহসী পদক্ষেপ।
পঞ্চমত, তথ্যদাতার নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ: স্থানীয় থানা প্রশাসনের সাথে সরাসরি যোগাযোগের একটি হটলাইন ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি, যেখানে পরিচয় গোপন রেখেও তথ্য দেওয়া যাবে। ভয় বা প্রতিহিংসার আশঙ্কা দূর করতে না পারলে কেউই এগিয়ে আসবে না। তথ্যদাতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলেই সমাজের সাধারণ মানুষ সাহস করে এগিয়ে আসবে।
ষষ্ঠত, পুনর্বাসন ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি: শুধু প্রতিরোধ নয়, প্রয়োজন পুনর্বাসনও। যারা ইতিমধ্যে মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছে, তাদের ঘৃণা নয়, বরং চিকিৎসা ও সহানুভূতির মাধ্যমে সমাজে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। একজন আসক্ত মানুষ অপরাধী নয়, সে একজন রোগী, এই উপলব্ধি সমাজে গড়ে তুলতে হবে।
ইতিহাস বলে, যেখানে সমাজ ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, সেখানেই বড় পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, প্রতিটি সংগ্রামেই সাধারণ মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধই এনেছে চূড়ান্ত বিজয়। মাদকের বিরুদ্ধে এই লড়াইও ব্যতিক্রম নয়। সাতক্ষীরার মাটি বীরের মাটি, সংগ্রামের মাটি। এই মাটির সন্তানরা যদি আজ ঐক্যবদ্ধ হয়, বিদ্যালয়ে বিদ্যালয়ে সচেতনতা ছড়িয়ে দেয়, উঠতি বয়সী শিশুদের প্রতি বাড়তি যতœশীল হয়, আর প্রতিটি সহপাঠীকে নিজের ভাই-বোনের মতো আগলে রাখার শিক্ষা দেয়, তবে আগামীকাল এই জনপদ হয়ে উঠবে মাদকমুক্ত এক আদর্শ জনপদ।












