বাজারে ডলারের সংকট রয়েছে, বিনিময় হার আরও বাড়তে পারে—এমন আলোচনা যখন চলছে, তখন উল্টো চিত্র দেখা গেলো বাংলাদেশ ব্যাংকের ডলার নিলামে। বাজারে ডলারের চাহিদা কতটা রয়েছে এবং প্রকৃত বিনিময় হার কোন পর্যায়ে আছে, তা যাচাই করতে ২ কোটি মার্কিন ডলার বিক্রির ঘোষণা দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছয়টি ব্যাংক মিলে কিনেছে ১ কোটি ১৫ লাখ ডলার। অর্থাৎ বিক্রির জন্য রাখা ৮৫ লাখ ডলার অবিক্রীতই থেকে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, এই নিলামের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল— বাজারের প্রকৃত চাহিদা বোঝা। নিলামে সব ব্যাংককে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলেও সীমিত সংখ্যক ব্যাংক আগ্রহ দেখিয়েছে। ফলে বাজারে ডলারের সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে—এমন দাবির সঙ্গে নিলামের ফলাফল সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সোমবার অনুষ্ঠিত নিলামের তথ্য মঙ্গলবার প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে দেখা যায়, ছয়টি ব্যাংক ১ কোটি ১৫ লাখ ডলার কেনার প্রস্তাব দেয় এবং তাদের সব প্রস্তাবই গ্রহণ করা হয়। ডলার বিক্রির দর ছিল ১২২ টাকা ৮০ পয়সা থেকে ১২৩ টাকা ৩৫ পয়সা। গড় দর ছিল ১২৩ টাকা ২২ পয়সা। কাট-অফ রেট ছিল ১২২ টাকা ৮০ পয়সা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘‘বাংলাদেশ ব্যাংক বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) কোনও ডলার বিক্রি করতে পারেনি।’’ ব্যাংকের কাছে পর্যাপ্ত ডলার আছে বলে জানান তিনি। এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করা আপাতত প্রয়োজন পড়ছে না। তিনি বলেন, ‘‘বাজারে ডলারের আদৌ কোনও অতিরিক্ত চাহিদা আছে কিনা, প্রকৃত বিনিময় হার কত হতে পারে, তা দেখে থাকে বাংলাদেশ ব্যাংক। নিলামের মাধ্যমে একটি দর ব্যাংক দিয়েছে।’’
তিনি বলেন, ‘‘বাজারে ডলারের কোনও ঘাটতি নেই। আমরা সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) ২ কোটি ডলার বিক্রির ঘোষণা দিয়ে দেখলাম, ছয়টির বেশি ব্যাংক আগ্রহ দেখায়নি। ফলে ২ কোটি ডলারের পুরোটা বিক্রি করা সম্ভব হয়নি।’’
ব্যাংকগুলো চাইলে আরও ৮৫ লাখ ডলার নিতে পারতো
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা না প্রকাশ না করে বলেন, ‘‘কিছু মহল থেকে বলা হচ্ছিল— ব্যাংকগুলোতে ডলারের সংকট রয়েছে এবং সামনে ডলারের দাম আরও বাড়তে পারে। এসব আলোচনা বাস্তবে কতটা সত্য, তা যাচাই করতেই নিলামের আয়োজন করা হয়।’’
তিনি বলেন, ‘মোট ২ কোটি ডলার বিক্রির জন্য ছাড়া হয়েছিল। সব ব্যাংককে বিষয়টি জানানো হয়। কিন্তু মাত্র ছয়টি ব্যাংক ১ কোটি ১৫ লাখ ডলার কেনার প্রস্তাব দেয়। তাদের সব প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে। তারা চাইলে আরও ৮৫ লাখ ডলার নিতে পারতো।’’
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, নিলামের ফলাফল থেকে অন্তত এটুকু বোঝা যাচ্ছে, ব্যাংকিং খাতে ডলারের চাহিদা এমন পর্যায়ে নেই যে বাজারে ব্যাপক সংকট তৈরি হয়েছে। বরং প্রয়োজনের তুলনায় অনেক ব্যাংকের হাতে পর্যাপ্ত ডলার রয়েছে।’’
১৪ মাস পর ডলার বিক্রিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক
ডলারের এই নিলাম আরও একটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ ১৪ মাস পর আবারও বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে ডলার বিক্রিতে ফিরেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আগে ২০২৫ সালের জুলাই থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনছিল। কারণ তখন বাজারে ডলারের সরবরাহ বাড়ছিল এবং বিনিময় হারের ওপর চাপ কমে এসেছিল।
গত ১৪ মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে প্রায় ৬০০ কোটি ডলার কিনেছে। এর ফলে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে, অপরদিকে ব্যাংকগুলোর হাতে ডলারের তারল্যও বৃদ্ধি পেয়েছে।
সর্বশেষ গত ১ সেপ্টেম্বর বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ৫ কোটি ডলার কিনেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ওই নিলামে কাট-অফ রেট ছিল ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা। অর্থাৎ, মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অবস্থানে কিছুটা পরিবর্তন দেখা গেল। আগে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ডলার কিনছিল, এখন প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার বিক্রি করছে। তবে প্রথম বিক্রির নিলামেই পুরো ২ কোটি ডলার বিক্রি না হওয়া বাজারের চাহিদা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা দিচ্ছে।
ডলারের দর বেড়েছে, কিন্তু সংকট কতটা?
সাম্প্রতিক সময়ে আন্তব্যাংক বাজারে ডলারের দর কিছুটা বেড়েছে। ১৫ সেপ্টেম্বর আন্তব্যাংক বাজারে ডলারের গড় দর ছিল ১২৩ টাকা ৩৫ পয়সা। আগের দিন ছিল ১২৩ টাকা ২০ পয়সা। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় আমদানি ব্যয়ও বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাইয়ে দেশের আমদানি ব্যয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ৬৪৪ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য আমদানির ব্যয় বেড়েছে ৮৩ দশমিক ৩ শতাংশ, যা এক মাসে ১৩৭ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।
অপরদিকে জুলাইয়ে রফতানি আয় ১ দশমিক ৬ শতাংশ কমে ৪৩৫ কোটি ডলারে নেমেছে। ফলে আমদানি ব্যয় ও রফতানি আয়ের ব্যবধান বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে কিছুটা বাড়তি চাহিদা তৈরি করতে পারে।
তবে আমদানির চাপ বাড়লেই যে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ডলারের সংকট তৈরি হয়েছে, এমনটি ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ রেমিট্যান্স, রফতানি আয়, ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা অবস্থান এবং আমদানি দায় পরিশোধের সক্ষমতা—সবকিছু মিলিয়েই বাজারের প্রকৃত তারল্য বোঝা যায়।
রিজার্ভেও স্বস্তি
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম৬ পদ্ধতিতে গত ১০ সেপ্টেম্বর দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩১ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার। এক বছর আগে একই সময়ে এই রিজার্ভ ছিল ২৫ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রিজার্ভ বেড়েছে প্রায় ৫ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থানে আগের তুলনায় বড় ধরনের উন্নতি হয়েছে।
এ অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ২ কোটি ডলার বিক্রির উদ্যোগকে শুধু ‘ডলারের সংকট মোকাবিলায়’ নেওয়া পদক্ষেপ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। বরং নিলামের মাধ্যমে বাজারের প্রকৃত চাহিদা, ব্যাংকগুলোর ডলার ধারণক্ষমতা এবং প্রচলিত বিনিময় হারের যৌক্তিকতা যাচাই করাও এর গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য।
বাজারের জন্য কী বার্তা?
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিলামে ২ কোটি ডলার বিক্রির সুযোগ তৈরি করেও ৮৫ লাখ ডলার বিক্রি করতে না পারার ঘটনা বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। এতে বোঝা যাচ্ছে, বাজারে ডলারের দাম নিয়ে আলোচনা থাকলেও ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ডলারের সরবরাহ একেবারে সংকুচিত হয়ে যায়নি।
বরং কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজন অনুযায়ী বাজারে ডলার দিতে সক্ষম এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোরও নিজস্ব বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থান রয়েছে। ফলে ডলারের দাম আরও বাড়বে—এমন প্রত্যাশা বা গুজবের ভিত্তিতে বাজারে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে কিনা, সেটিও এখন নজরে রাখবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
তবে আমদানি ব্যয়, বিশেষ করে জ্বালানি আমদানির চাপ বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে ডলারের চাহিদা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে রফতানি ও রেমিট্যান্সের প্রবাহও গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। তাই একটি নিলামের ফলাফল দিয়ে পুরো বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ না করে ধারাবাহিকভাবে ব্যাংকগুলোর চাহিদা ও লেনদেনের প্রবণতা পর্যবেক্ষণ করাই হবে গুরুত্বপূর্ণ।
এই মুহূর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিলামের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বার্তাটি হলো—ডলারের দাম নিয়ে চাপ থাকলেও ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তীব্র ডলার সংকটের চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না। ২ কোটি ডলার বিক্রির সুযোগ দিয়েও ৮৫ লাখ ডলার বিক্রি করতে না পারাই তার একটি বাস্তব উদাহরণ।