১৭ সেপ্টেম্বর : শিক্ষা দিবসের রক্তঋণ ও আমাদের শিক্ষার ভবিষ্যৎ
শেখ সিদ্দিকুর রহমান
শিক্ষা কেবল পরীক্ষায় পাস করার নাম নয়, শিক্ষা কেবল একটি সনদ অর্জনের নামও নয়। শিক্ষা মানুষের চোখ খুলে দেয়, প্রশ্ন করতে শেখায়, সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে শেখায়, অন্যায়কে অন্যায় হিসেবে চিহ্নিত করার সাহস দেয় এবং মানুষকে নিজের জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্র সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। তাই শিক্ষা যখন সংকুচিত হয়, তখন শুধু বিদ্যালয়ের দরজা সংকুচিত হয় না-সংকুচিত হয় মানুষের সম্ভাবনা, চিন্তার স্বাধীনতা এবং একটি জাতির ভবিষ্যৎ। এই কারণেই ১৭ সেপ্টেম্বর আমাদের ইতিহাসে একটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ১৯৬২ সালের এই দিনটি শিক্ষা আন্দোলনের রক্তাক্ত স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পরবর্তীকালে শিক্ষা দিবস হিসেবে পরিচিত হয়েছে।
১৯৬২ সালের প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন।
পাকিস্তানি শাসনব্যবস্থার অধীনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে যে নীতিগত পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়। আইয়ুব খানের সামরিক শাসনামলে এস এম শরীফের নেতৃত্বে গঠিত শিক্ষা কমিশন ১৯৫৯ সালে প্রতিবেদন দেয়। প্রতিবেদনে শিক্ষার বিভিন্ন স্তর, প্রশাসন, অর্থায়ন, পাঠ্যক্রম ও উচ্চশিক্ষা নিয়ে নানা সুপারিশ ছিল; এর মধ্যে শিক্ষা ব্যয় ও ছাত্রবেতন বাড়ানোর প্রস্তাবও ছিল। ১৯৬২ সালে এসব সুপারিশ বাস্তবায়নের উদ্যোগ শুরু হলে ছাত্রসমাজ প্রতিবাদে রাজপথে নামে।
আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৭ সেপ্টেম্বর দেশব্যাপী হরতাল পালিত হয়। ঢাকায় ছাত্র-জনতার মিছিলের ওপর পুলিশ লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস ও গুলি চালায়। এতে মোস্তফা, বাবুল ও ওয়াজিউল্লাহসহ কয়েকজন প্রাণ হারান। টঙ্গীতেও ছাত্র-শ্রমিক মিছিলে গুলিতে সুন্দর আলী নামে একজন শ্রমিক নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।
এই রক্তপাতের কারণেই ১৭ সেপ্টেম্বর নিছক একটি তারিখ নয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়-শিক্ষার প্রশ্ন কখনো কেবল শ্রেণিকক্ষের প্রশ্ন নয়। শিক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের অধিকার, সামাজিক ন্যায়, অর্থনৈতিক সাম্য এবং একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রশ্ন।
কিন্তু ১৯৬২ থেকে ২০২৬-সময়ের ব্যবধান পেরিয়ে এসে আমাদের নিজেদের কাছেই প্রশ্ন রাখতে হয়, আমরা কি সেই শিক্ষা আন্দোলনের মূল আকাঙ্খা ধারণ করতে পেরেছি?
আজ দেশে বিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে, কলেজ বেড়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় বেড়েছে, শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। প্রযুক্তি শিক্ষার সুযোগ তৈরি করেছে, অনলাইন শিক্ষা এসেছে, ডিজিটাল কনটেন্ট এসেছে, বিশ্বের জ্ঞানভান্ডার হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। কিন্তু একই সঙ্গে শিক্ষার সামনে নতুন নতুন সংকটও তৈরি হয়েছে। অনেক পরিবারের কাছে সন্তানের শিক্ষা ক্রমেই একটি ব্যয়বহুল দায়িত্বে পরিণত হচ্ছে। শহর ও গ্রামের শিক্ষার সুযোগের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সুযোগ-সুবিধায় পার্থক্য আছে। সাধারণ শিক্ষা, মাদ্রাসা শিক্ষা ও ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে ব্যবধানও আলোচনার দাবি রাখে।
শিক্ষার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই শুধু কতজন শিক্ষার্থী স্কুলে যাচ্ছে—তা নয়; প্রশ্ন হলো তারা কী শিক্ষা পাচ্ছে, কীভাবে শিক্ষা পাচ্ছে এবং সেই শিক্ষা তাদের মানুষ হিসেবে কতটা গড়ে তুলছে।
আমরা পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে দীর্ঘদিন ধরে এগিয়ে চলেছি। পরীক্ষার ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ফলাফলই যদি শিক্ষার একমাত্র লক্ষ্য হয়ে যায়, তাহলে শিক্ষার গভীর উদ্দেশ্য হারিয়ে যায়। একজন শিক্ষার্থী হয়তো অনেক তথ্য মুখস্থ করতে পারে, পরীক্ষায় ভালো নম্বরও পেতে পারে; কিন্তু সে যদি প্রশ্ন করতে না শেখে, যুক্তি দিয়ে ভাবতে না শেখে, ভিন্নমতকে সম্মান করতে না শেখে, প্রকৃতি ও মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল না হয়-তাহলে তার শিক্ষার একটি বড় অংশ অপূর্ণ থেকে যায়।
একটি শিক্ষিত সমাজে শুধু ডাক্তার, প্রকৌশলী, আমলা, আইনজীবী কিংবা শিক্ষক তৈরি হবে-এমন নয়। তৈরি হবে সৎ কৃষিবিদ, দক্ষ কারিগর, বিজ্ঞানী, গবেষক, সাহিত্যিক, শিল্পী, উদ্যোক্তা, সাংবাদিক এবং দায়িত্বশীল নাগরিক। একজন কৃষকও জ্ঞানী হতে পারেন, একজন কারিগরও সৃজনশীল হতে পারেন, একজন সাহিত্যিকও বিজ্ঞানমনস্ক হতে পারেন। শিক্ষার উদ্দেশ্য পেশার শ্রেণিবিন্যাস তৈরি করা নয়; শিক্ষার উদ্দেশ্য মানুষের সম্ভাবনাকে বিকশিত করা।
এই জায়গায় শিক্ষকতার মর্যাদার প্রশ্নটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন ভালো শিক্ষক শুধু পাঠ্যবই পড়ান না; তিনি শিক্ষার্থীর চিন্তার দরজা খুলে দেন। অথচ শিক্ষক যদি নিজেই নানা প্রশাসনিক চাপ, আর্থিক অনিশ্চয়তা ও সামাজিক অবমূল্যায়নের মধ্যে থাকেন, তাহলে শিক্ষার পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিক্ষকের মর্যাদা শুধু বেতন বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তাঁকে জ্ঞানচর্চার স্বাধীনতা, প্রশিক্ষণ, গবেষণার সুযোগ এবং সম্মানজনক কর্মপরিবেশ দিতে হবে।
একই সঙ্গে শিক্ষার্থীকেও কেবল পরীক্ষার্থী হিসেবে দেখা যাবে না। শিক্ষার্থী একটি পূর্ণ মানুষ, তার প্রশ্ন আছে, কৌতূহল আছে, স্বপ্ন আছে, ভুল করার অধিকার আছে। শিক্ষাঙ্গন এমন একটি জায়গা হওয়া প্রয়োজন যেখানে সে প্রশ্ন করতে পারবে, বিতর্ক করতে পারবে, যুক্তি দিয়ে মত প্রকাশ করতে পারবে এবং নিজের ভুল সংশোধন করতে পারবে।
১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনের একটি বড় শিক্ষা এখানেই-শিক্ষার্থীর কণ্ঠকে অবজ্ঞা করা যায় না। ইতিহাসে দেখা যায়, শিক্ষা নিয়ে ছাত্রসমাজের প্রতিবাদ শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক চেতনার বিকাশেও ভূমিকা রেখেছে। ১৯৬২ সালের আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের স্বাধিকার ও স্বাধীনতার আন্দোলনের ইতিহাসে ছাত্রসমাজের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আজকের বাংলাদেশে তাই ১৭ সেপ্টেম্বরকে কেবল অতীতের শহীদদের স্মরণ করার দিন বানালে চলবে না। এই দিন হওয়া উচিত নিজেদের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আত্মসমালোচনার দিন।
আমরা কি গ্রামের একটি দরিদ্র পরিবারের সন্তান এবং শহরের একটি সচ্ছল পরিবারের সন্তানের জন্য মোটামুটি সমান মানের শিক্ষার সুযোগ তৈরি করতে পেরেছি? আমরা কি এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করতে পেরেছি যেখানে অর্থের অভাবে কোনো মেধাবী সন্তান পিছিয়ে পড়বে না? আমরা কি শিক্ষার সঙ্গে গবেষণার যথেষ্ট সম্পর্ক তৈরি করতে পেরেছি? আমাদের শিক্ষার্থীরা কি শুধু চাকরির জন্য পড়াশোনা করছে, নাকি জ্ঞান সৃষ্টি ও সমাজ পরিবর্তনের জন্যও প্রস্তুত হচ্ছে?
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো-শিক্ষার সঙ্গে প্রযুক্তির সম্পর্ক আমরা কীভাবে নির্ধারণ করব?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিকস, জৈবপ্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা, তথ্যপ্রযুক্তি ও স্বয়ংক্রিয় উৎপাদনের পৃথিবীতে আগামী দিনের শিক্ষার্থীকে শুধু পুরোনো তথ্য মুখস্থ করিয়ে প্রস্তুত করা যাবে না। তাকে এমনভাবে প্রস্তুত করতে হবে যাতে সে নতুন সমস্যার সমাধান করতে পারে, নতুন জ্ঞান অর্জন করতে পারে এবং প্রযুক্তিকে মানবকল্যাণে ব্যবহার করতে পারে। প্রযুক্তি শিক্ষককে প্রতিস্থাপন করবে না; বরং ভালো শিক্ষক ও প্রযুক্তির সমন্বয় শিক্ষাকে আরও কার্যকর করে তুলতে পারে।
তবে প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে নতুন বৈষম্যও তৈরি হতে পারে। যার কাছে ভালো যন্ত্র আছে, দ্রুতগতির ইন্টারনেট আছে, প্রশিক্ষিত শিক্ষক আছে, সে যদি এগিয়ে যায় আর যার এসব নেই সে পিছিয়ে পড়ে, তাহলে ডিজিটাল শিক্ষা নিজেই বৈষম্যের নতুন দেয়াল হয়ে দাঁড়াবে। তাই প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা অবশ্যই অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে হবে।
শিক্ষার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-মানবিকতা। জ্ঞান যদি মানুষকে মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল না করে, তাহলে সেই জ্ঞানের সামাজিক মূল্য নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। একজন বিজ্ঞানী যেমন গবেষণায় সত্য অনুসন্ধান করবেন, একজন সাহিত্যিক যেমন মানুষের হৃদয়ের কথা বলবেন, তেমনি একজন শিক্ষার্থীও যেন অন্য মানুষের দুঃখ বুঝতে শেখে। শিক্ষা মানুষের মধ্যে কেবল প্রতিযোগিতা নয়, সহযোগিতার চেতনা সৃষ্টি করবে-এটাই প্রত্যাশিত।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় মুখস্থনির্ভরতার পাশাপাশি সৃজনশীলতা, গবেষণা, পাঠাভ্যাস, সাহিত্য, শিল্প, সংগীত, বিজ্ঞানচর্চা, বিতর্ক ও খেলাধুলার জায়গা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। একটি শিশু শুধু পরীক্ষার খাতায় নয়, তার কল্পনায়ও বেড়ে ওঠে। তার হাতে শুধু বই নয়, বইয়ের বাইরের পৃথিবীটিও তুলে দিতে হবে।
এখানে পরিবার ও সমাজের দায়িত্বও কম নয়। সন্তানকে শুধু ভালো ফল করার জন্য চাপ দিলে সে হয়তো পরীক্ষায় সফল হবে, কিন্তু জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হতে পারে। তাকে বই পড়তে দিতে হবে, প্রশ্ন করতে দিতে হবে, প্রকৃতির কাছে যেতে দিতে হবে, মানুষের সঙ্গে মিশতে দিতে হবে। ভুল থেকে শেখার সুযোগ দিতে হবে।
১৭ সেপ্টেম্বরের শিক্ষা দিবস আমাদের আরও একটি কথা মনে করিয়ে দেয়-শিক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়। এটি মানুষের মৌলিক বিকাশের ভিত্তি। ১৯৪৮ সালের মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণার ২৬ অনুচ্ছেদেও শিক্ষার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে; প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করার কথা সেখানে বলা হয়েছে।
বাংলাদেশের সংবিধানেও শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে একটি অভিন্ন, গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাই শিক্ষার মান, সুযোগের সমতা, বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তা এবং নাগরিক মূল্যবোধ-এসব কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়; রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্মাণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
আজ ১৭ সেপ্টেম্বর যখন আমরা শিক্ষা দিবস পালন করি, তখন ১৯৬২ সালের সেই তরুণদের কথা স্মরণ করা প্রয়োজন, যারা শিক্ষার প্রশ্নে রাজপথে নেমেছিলেন এবং জীবন দিয়েছিলেন। তাঁদের প্রত্যাশা হয়তো আজকের প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীর মতো ছিল না। কিন্তু তাঁদের মৌলিক আকাঙ্ক্ষা ছিল-শিক্ষা যেন মানুষের অধিকার হয়, বৈষম্যের হাতিয়ার না হয়।
সেই আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে আজকের বাস্তবতার মিল কতটুকু-তার উত্তর আমাদেরই খুঁজতে হবে।
শিক্ষার জন্য বড় বড় ভবন প্রয়োজন, আধুনিক ল্যাবরেটরি প্রয়োজন, প্রযুক্তি প্রয়োজন, পর্যাপ্ত অর্থ প্রয়োজন; কিন্তু তার চেয়েও প্রয়োজন একটি সুস্পষ্ট শিক্ষা-দর্শন। আমরা কেমন মানুষ তৈরি করতে চাই-এই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে কেবল পাঠ্যক্রম বদলালে শিক্ষার কাঙ্খিত পরিবর্তন আসবে না।
আমরা এমন মানুষ চাই, যে বিজ্ঞান জানে কিন্তু মানবিক; প্রযুক্তি জানে কিন্তু বিবেকবান; নিজের অধিকার বোঝে কিন্তু অন্যের অধিকারকেও সম্মান করে; নিজের ইতিহাস জানে কিন্তু অন্য জাতির ইতিহাসকেও শ্রদ্ধা করে; ধর্মকে সম্মান করে কিন্তু অন্ধতার কাছে যুক্তিকে বিসর্জন দেয় না; দেশকে ভালোবাসে কিন্তু মানুষকে ঘৃণা করতে শেখে না।
এই শিক্ষাই একটি জাতিকে সত্যিকার অর্থে সমৃদ্ধ করে।
১৭ সেপ্টেম্বর তাই শুধু শহীদ মোস্তফা, বাবুল, ওয়াজিউল্লাহসহ আন্দোলনে প্রাণ হারানো মানুষদের স্মরণ করার দিন নয়; এটি আমাদের নিজেদের শিক্ষাব্যবস্থাকে আয়নায় দেখার দিন। সেই আয়নায় যদি কোনো দুর্বলতা দেখা যায়, তা ঢেকে রাখার প্রয়োজন নেই। বরং স্বীকার করে সংশোধনের পথ খুঁজতে হবে।
শিক্ষা দিবসের রক্তঋণ তখনই কিছুটা পরিশোধ হবে, যখন কোনো শিশুকে দারিদ্র্যের কারণে বিদ্যালয় ছাড়তে হবে না; কোনো মেধাবী তরুণ অর্থের অভাবে উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে না; কোনো শিক্ষক জ্ঞানচর্চার পরিবেশের অভাবে হতাশ হবেন না; কোনো শিক্ষার্থী শুধু পরীক্ষার নম্বরের জন্য বই পড়বে না; আর শিক্ষিত হওয়ার অর্থ শুধু চাকরি পাওয়া নয়-মানুষ হওয়া, সত্যকে ভালোবাসা এবং সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল হয়ে ওঠা।
১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বরের রাজপথ থেকে আজকের শ্রেণিকক্ষ পর্যন্ত আমাদের পথ দীর্ঘ। কিন্তু প্রশ্নটি এখনও একই-শিক্ষা কাদের জন্য, কীসের জন্য এবং কেমন মানুষ তৈরির জন্য?
এই প্রশ্নের উত্তর যতদিন আমরা খুঁজব, ততদিন ১৭ সেপ্টেম্বর কেবল ক্যালেন্ডারের একটি দিন হয়ে থাকবে না। এটি হয়ে থাকবে আমাদের শিক্ষার বিবেক জাগানোর একটি দিন।
শিক্ষা হোক অধিকার, শিক্ষা হোক মুক্ত চিন্তার আলো; শিক্ষা হোক বৈষম্যহীন, বিজ্ঞানমনস্ক ও মানবিক সমাজ নির্মাণের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি।
লেখক : সাবেক ব্যাংকার, কবি, লেখক।











