চায়না দুয়ারী জালে বিপন্ন মিঠাপানির মৎস্যভান্ডার
মো. খলিলুর রহমান
আমরা মাছে ভাতে বাঙালি এই চিরন্তন পরিচয়টি আজ কেবলই ইতিহাসের পাতায় স্থান পাওয়া একটি নাম মাত্র। আমাদের নদী, নালা, খাল বিল আর উন্মুক্ত জলাশয়গুলো একসময় প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন সুস্বাদু দেশীয় মাছে ভরপুর ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এক শ্রেণির অতি লোভী অসাধু মৎস্য শিকারির নিষ্ঠুরতা এবং নিষিদ্ধ ‘চায়না দুয়ারী’ জালের অবাধ ও ধ্বংসাত্মক ব্যবহারের কারণে আমাদের জলজ জীববৈচিত্র্য আজ এক চরম বিপর্যয়ের মুখে।
অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো প্রশাসনের নাকের ডগায় এই নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার দিন দিন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। আর আমাদের চোখের সামনেই বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে শত শত প্রজাতির দেশীয় প্রজাতির মাছ। এখনই যদি এই মরণফাঁদের বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তবে আগামী প্রজন্ম দেশীয় মাছের স্বাদ তো দূরের কথা, কেবল বইয়ের পাতায় এর ছবি দেখবে। চায়না দুয়ারী জাল মুলত জলজ জীববৈচিত্র্যের জন্য এক নিষ্ঠুর ও আধুনিক ‘টাইম বোমা’ বলা যায়।
চায়না দুয়ারী জাল স্থানীয়ভাবে রিং জাল বা ঢোল জাল নামেও পরিচিত। মূলত চীন দেশ থেকে আমদানিকৃত অতি সূক্ষ্ম নাইলন সুতা এবং লোহার রিং দিয়ে তৈরি এক প্রকার বহুতল বিশিষ্ট ফাঁদ। এটি সাধারণ কোনো মাছ ধরার জাল নয়, বরং জলজ প্রাণীর জন্য তৈরি একটি নিখুঁত কসাইখানা। এই জালের বুনন এতই ঘন এবং সূক্ষ্ম যে, পানির আণুবীক্ষণিক পোকা ছাড়া আর কোনো জীবন্ত প্রাণী এর ভেতর থেকে বের হতে পারে না। জলাশয়ের একেবারে তলদেশে আড়াআড়িভাবে এই জাল পেতে রাখা হয়।
প্রবহমান পানির স্রোতে দেশীয় মাছের রেণু পোনা, ডিমওয়ালা মা মাছ, কাঁকড়া, কুঁচে, ব্যাঙ, এমনকি পানির সাপ ও কচ্ছপ পর্যন্ত একবার এই জালের সুড়ঙ্গে ঢুকলে আর বের হওয়ার কোনো পথ পায় না। জালের ভেতরে আটকা পড়া মাছগুলো অক্সিজেনের অভাবে ছটফট করতে করতে জালের ভেতরেই মারা যায় এবং পচে নষ্ট হয়। এই চরম নিষ্ঠুরতার কারণে পরিবেশবিদরা একে জলজ পরিবেশের জন্য ‘টাইম বোমা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
দেশীয় মৎস্যভা-ারে মহাশ্মশানের হাতছানি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের উন্মুক্ত জলাশয়গুলোতে এখন চায়না দুয়ারী জালের জয়জয়কার। এই জালের কারণে প্রাকৃতিকভাবে মাছের বংশবৃদ্ধি সম্পূর্ণ রুদ্ধ হয়ে গেছে। আষাঢ়-শ্রাবণ বা বর্ষার শুরুতে যখন দেশীয় মাছ ডিম ছাড়ে এবং নদী-নালা নতুন পোনা মাছে ভরে ওঠে, ঠিক তখনই অসাধু চক্র এই জালগুলো পেতে বসে। ফলে কোটি কোটি রেণু পোনা এবং ডিমভর্তি মা মাছ ডিম ছাড়ার আগেই এই জালে আটকা পড়ে মারা যায়। আমাদের চিরচেনা সুস্বাদু শিং, মাগুর, কই, টেংরা, পাবদা, বোয়াল, আইড়, চিতল, শোল, টাকি, গজার, বাইম, ফলই, খলিশা ও ভেদা মাছের মতো প্রজাতিগুলো আজ হারিয়ে যাওয়ার মূল কারণ এই জালের নির্বিচার ব্যবহার।
মাছের পাশাপাশি খালের ইকোসিস্টেমের জন্য প্রয়োজনীয় অনুজীব ও উপকারী জলজ প্রাণীগুলো এই জালে মারা পড়ায় পানির স্বাভাবিক ফিল্টারিং ক্ষমতা নষ্ট হচ্ছে। ফলে খালের পানি দ্রুত দূষিত ও দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে পড়ছে। প্রশাসনের উদাসীনতা ও লোকদেখানো অভিযানের তামাশা বাংলাদেশ মৎস্য রক্ষা ও সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, সাড়ে চার সেন্টিমিটার বা তার কম ব্যাসের কারেন্ট জাল, চায়না দুয়ারীসহ সব ধরনের সুক্ষ্ম ফাঁদ তৈরি, আমদানি, বাজারজাতকরণ ও ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং এটি একটি অজামিনযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ।
আইন এত কড়া হওয়া সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে এর প্রতিফলন কেন শূন্য? মৎস্য বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসন মাঝেমধ্যে লোকদেখানো কিছু অভিযান চালায়, নদী বা খাল থেকে গুটিকয়েক জাল জব্দ করে পুড়িয়ে দিয়ে দায়িত্ব শেষ করে। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো, এই নিষিদ্ধ জাল আকাশ থেকে উড়ে আসে না। প্রতিটি স্থানীয় বাজারে, বিশেষ করে কাপড়ের দোকান বা মাছের আড়তের পেছনের গোপন গুদামে এই জাল দেদারসে বিক্রি হচ্ছে। আমদানিকারক ও বড় সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে, শুধুমাত্র প্রান্তিক জেলেদের পেছনে তাড়া করার এই ইঁদুর-বিড়াল খেলা দিয়ে এই জাতীয় অপরাধ বন্ধ করা সম্ভব নয়।
আইনের কঠোর প্রয়োগের অভাব এবং কিছু অসাধু মাঠকর্মীর গোপন যোগসাজশের কারণেই আজ চায়না দুয়ারী জালের ব্যবসা হাজার কোটি টাকার সিন্ডিকেটে পরিণত হয়েছে। আমাদের জাতীয় মৎস্য সম্পদকে চিরতরে ধ্বংস হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে হলে এখন আর শুধু আবেদন-নিবেদনে কাজ হবে না নিতে হবে কঠোর ও কড়া প্রশাসনিক অ্যাকশন। সীমান্ত দিয়ে কীভাবে এই নিষিদ্ধ জাল দেশে ঢুকছে তা খতিয়ে দেখতে হবে।
কাস্টমস ও শুল্ক বিভাগকে কঠোর হতে হবে। স্থানীয় হাট-বাজারের যেসব আড়তে বা দোকানে এই জাল বিক্রি হয়, সেগুলোতে সিলগালা করে মালিকদের জেলহাজতে পাঠাতে হবে। লোকদেখানো অভিযান বন্ধ করে প্রতি সপ্তাহে নদী ও উন্মুক্ত খালে ঝটিকা অভিযান চালাতে হবে। জাল যার কাছে পাওয়া যাবে, তাকে শুধু জরিমানা নয়, সরাসরি কারাদ- দিতে হবে। সামাজিক প্রতিরোধ ও যুব সমাজকে কাজে লাগিয়ে প্রতিটি ইউনিয়নে সচেতন নাগরিকদের নিয়ে ‘মৎস্য রক্ষা স্কোয়াড’ গঠন করতে হবে। কোনো খালে বা জলাশয়ে চায়না দুয়ারী জাল দেখলে তা সাথে সাথে প্রশাসনকে অবহিত করা বা সামাজিক উদ্যোগে তা ধ্বংস করার লাইসেন্স দিতে হবে।
প্রকৃতির দেওয়া অবাধ মৎস্যসম্পদ কোনো একক ব্যক্তির বা সিন্ডিকেটের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। সামান্য কিছু অর্থপিপাসু মানুষের লোভের বলি হতে পারে না কোটি কোটি মানুষের আমিষের উৎস ও দেশের জলজ পরিবেশ। চায়না দুয়ারী জালের বিরুদ্ধে এখনই যদি রাষ্ট্র এবং সমাজ সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা না করে, তবে অতি শীঘ্রই আমাদের মুক্ত জলাশয়গুলো মাছহীন মহাশ্মশানে পরিণত হবে। প্রশাসনকে অনুরোধÑআইওয়াশ বন্ধ করুন, কঠোর হস্তে চায়না দুয়ারী জাল উপড়ে ফেলুন, আমাদের দেশীয় মাছকে বাঁচতে দিন।











