রবিবার, ৯ আগস্ট ২০২৬, ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ৯ আগস্ট ২০২৬, ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩

হরিহর নদীতে নিখোঁজের ৩ ঘন্টা পর বৃদ্ধের মরদেহ উদ্ধার

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬, ৬:১৬ অপরাহ্ণ
হরিহর নদীতে নিখোঁজের ৩ ঘন্টা পর বৃদ্ধের মরদেহ উদ্ধার

এম এ রহমান, কেশবপুর (যশোর): যশোরের কেশবপুরে নদীতে গোসল করতে গিয়ে আমজাদ হোসেন (৬৫) নামে এক বৃদ্ধের করুন মৃত্যু হয়েছে। নিহত বৃদ্ধ উপজেলার আলতাপোল গ্রামের বাসিন্দা।

জানা গেছে, শনিবার (০৮-০৮-২৬) সকালে বৃদ্ধ আমজাদ হোসেন বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া হরিহর নদীতে গোসল করতে নামেন। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও তিনি বাড়িতে না ফেরায় পরিবারের লোকজন তাকে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। কিন্তু কোথাও তাকে না পেয়ে পরিবারের লোকজন একপর্যায়ে নিশ্চিত হন যে, তিনি পানিতে নিখোঁজ হয়েছেন।

 

নিখোঁজের সংবাদ মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে শত শত নারী-পুরুষ হরিহর নদের পাড়ে ভিড় জামায়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে নদীতে উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। দীর্ঘ প্রায় ৩ ঘণ্টা খোঁজাখুঁজির পর নদী থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে।

বৃদ্ধের মৃত্যুতে পরিবার ও এলাকাবাসীর মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এ ব্যাপারে কেশবপুর থনায় একটা অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে।

 

Ads small one

বিবেক ও মানুষ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ৯ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৪৬ অপরাহ্ণ
বিবেক ও মানুষ

সচ্চিদানন্দ দে সদয়
মানুষ নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী মনে করে। জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সভ্যতার অগ্রগতি তার সেই দাবিকে অনেকটাই প্রতিষ্ঠিত করেছে। মানুষ মহাকাশে পৌঁছেছে, সমুদ্রের গভীরতা মেপেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি করেছে। কিন্তু এত অর্জনের পরও একটি প্রশ্ন থেকেই যায়Ñনিজেকে বোঝার ক্ষেত্রে মানুষ কতটা এগিয়েছে?আমরা জানি কোনটি ভালো, কোনটি মন্দ। জানি সত্য বলা উচিত, অন্যায় করা উচিত নয়। জানি কাউকে অপমান করা ঠিক নয়, দুর্বল মানুষের সুযোগ নেওয়া অন্যায়। তারপরও বাস্তব জীবনে আমরা প্রায়ই জেনেশুনে তার বিপরীত কাজ করি। এখানেই মানুষের সবচেয়ে বড় স্ববিরোধিতা।অন্যের নিন্দা করার সময় আমরা প্রায়ই ভুলে যাই, যার সমালোচনা করছি তিনিও একজন মানুষ। তারও অনুভূতি আছে, সম্মান আছে, দুর্বলতা আছে। অথচ তার অনুপস্থিতিতে তাকে নিয়ে কথা বলতে আমাদের অনেকেরই দ্বিধা হয় না। সামনে প্রশংসা, পেছনে সমালোচনাÑএই দ্বৈত আচরণ এখন সামাজিক জীবনের পরিচিত চিত্র।কারও ভালো কাজের প্রশংসা করতে আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু সেই মানুষটি যখন আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন, তখন তার ভালো কাজও চোখে পড়ে না। ব্যক্তিগত স্বার্থ সামনে এলে বিচারবোধ বদলে যায়। যে গুণ অন্যের ক্ষেত্রে প্রশংসনীয়, নিজের পছন্দের মানুষের ক্ষেত্রে সেটিই হয়ে যায় স্বাভাবিক; আবার অপছন্দের মানুষের একই কাজ হয়ে যায় অপরাধ।এভাবে আমরা ন্যায় বোধকেও অনেক সময় ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও স্বার্থের সঙ্গে মিলিয়ে দেখি।মানুষের এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ক্ষমতা ও অর্থের ক্ষেত্রে। আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলি, কিন্তু নিজের সুবিধার জন্য নিয়ম ভাঙতে অনেক সময় দ্বিধা করি না। অন্যের অনিয়মে ক্ষুব্ধ হই, কিন্তু নিজের অনিয়মকে ‘ছোট ব্যাপার’ বলে এড়িয়ে যাই। অন্যের ঘুষ নেওয়া অপরাধ, অথচ নিজের পরিচিত কেউ কাজ সহজ করতে কিছু দিলে সেটিকে অনেক সময় ‘উপহার’ হিসেবে দেখার চেষ্টা করি।এখানেই বিবেকের সঙ্গে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়।একজন মানুষ যখন কোনো অন্যায় করে, তখন সে সবসময় জানে না যে সে অন্যায় করছেÑএমন নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রেই সে জানে কাজটি ঠিক নয়। কিন্তু নিজের কাজকে বৈধ প্রমাণ করার জন্য যুক্তি তৈরি করে। ‘সবাই করে’, ‘আমি না করলে অন্য কেউ করবে’, ‘পরিস্থিতির কারণে করতে হয়েছে’Ñএ ধরনের যুক্তি দিয়ে মানুষ নিজের বিবেককে শান্ত করার চেষ্টা করে।কিন্তু অন্যায়কে যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়, ন্যায়সঙ্গত করা যায় না।আজকের সমাজে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই স্ববিরোধিতাকে আরও দৃশ্যমান করেছে। আমরা সেখানে খুব সহজেই নৈতিকতার কথা বলি। অন্যের ভুল নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করি, অন্যায়ের প্রতিবাদ করি, মানবিকতার বাণী লিখি। কিন্তু নিজের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলার প্রবণতা তুলনা মূলকভাবে কম। অন্যের চরিত্র বিশ্লেষণ করা যেন আমাদের সহজ; নিজের চরিত্র বিশ্লেষণ করা কঠিন।অথচ সমাজ পরিবর্তনের প্রথম শর্ত অন্যকে পরিবর্তন করা নয়, নিজেকে পরিবর্তন করা।মানুষের চরিত্রের প্রকৃত পরীক্ষা হয় তখন, যখন তাকে কেউ দেখছে না। সবার সামনে ভালো থাকা খুব কঠিন নয়। প্রশংসা পাওয়ার সময় বিনয়ী হওয়া সহজ। কিন্তু কোনো সুযোগে অন্যের ক্ষতি করা সম্ভব হলেও তা না করা, ক্ষমতা হাতে থাকলেও দুর্বলকে দমন না করা, প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ পেয়েও সংযত থাকাÑএসবই প্রকৃত চরিত্রের পরিচয়।একজন মানুষ কতটা শিক্ষিত, তা তার সনদে বোঝা যায়। কিন্তু সে কতটা মানুষ, তা বোঝা যায় তার আচরণে।আমরা সন্তানদের ভালো ফলাফল করতে শেখাই, বড় চাকরি করতে শেখাই, প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে শেখাই। কিন্তু তাদের কতটা শেখাই যে জয়ী হওয়ার পাশাপাশি সৎ থাকাও জরুরি? কতটা শেখাই যে অন্যকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়া আর অন্যের অধিকার কেড়ে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া এক বিষয় নয়? শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু কর্মসংস্থান নয়; মানুষ তৈরি করাও শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য। তাই পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষার গুরুত্ব নতুন করে ভাবা প্রয়োজন।সমাজে একটি বিপজ্জনক প্রবণতা হলোÑসৎ মানুষকে অনেক সময় বাস্তব জ্ঞানহীন বা বোকা হিসেবে দেখা। যে ব্যক্তি ঘুষ নেয় না, প্রতারণা করে না, অন্যের অধিকার নষ্ট করে না, তাকে অনেকে ‘সুবিধা নিতে জানে না’ বলে মন্তব্য করেন। অন্যদিকে অসৎ ভাবে দ্রুত অর্থ বা ক্ষমতা অর্জনকারীকে অনেক সময় সফল মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এই মূল্যবোধের পরিবর্তন দরকার। সাফল্য যদি শুধু অর্থ, পদ ও ক্ষমতার মাপকাঠিতে বিচার করা হয়, তাহলে সমাজে নৈতিকতার জায়গা সংকুচিত হবেই। প্রকৃত সাফল্য হলো এমনভাবে এগিয়ে যাওয়া, যেখানে নিজের উন্নতির সঙ্গে অন্যের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।মানবিকতা বড় কোনো তত্ত্ব নয়। এটি ছোট ছোট আচরণের মধ্যেই প্রকাশ পায়। রাস্তায় অসহায় মানুষকে সাহায্য করা, কর্মস্থলে অধীনস্থকে সম্মান করা, ভুল করলে ক্ষমা চাওয়া, অন্যের কথা মন দিয়ে শোনা, নিজের প্রাপ্যের বাইরে কিছু না নেওয়াÑএসব ছোট কাজই একটি বড় মানবিক সমাজ তৈরি করতে পারে।কিন্তু আমরা অনেক সময় বড় বড় কথা বলি, ছোট ছোট দায়িত্ব ভুলে যাই। কারও প্রতি অন্যায় আচরণ করার আগে যদি একবার ভাবিÑআমার সঙ্গে এমন আচরণ করা হলে কেমন লাগত, তাহলে অনেক অন্যায় থেমে যেতে পারে। কারও সম্মান নষ্ট করার আগে যদি মনে রাখিÑআমারও সম্মান আছে, তাহলে অনেক অপমানের ঘটনা ঘটত না। অন্যের অধিকার হরণ করার আগে যদি বুঝিÑঅধিকার হারানোর কষ্ট কেমন, তাহলে হয়তো নিজের স্বার্থকে একটু সংযত করা সম্ভব হতো।বিবেক আসলে মানুষের ভেতরের সেই নীরব কণ্ঠ, যা ভালো-মন্দের পার্থক্য মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু সেই কণ্ঠকে আমরা যত বেশি উপেক্ষা করি, তা তত দুর্বল হয়ে যায়। একসময় অন্যায়ও স্বাভাবিক মনে হতে শুরু করে।তাই সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আত্মজিজ্ঞাসার। প্রতিদিন নিজেকে প্রশ্ন করাÑআমি কি সত্যিই সেই মানুষ, যাকে অন্যের সামনে তুলে ধরতে চাই? আমি অন্যের কাছে যে নৈতিকতা প্রত্যাশা করি, নিজে কি তা পালন করি? যে আচরণ অন্যের কাছ থেকে পেলে আমি কষ্ট পাই, সেই আচরণ কি আমি অন্যের সঙ্গে করি না?এই প্রশ্নগুলোর উত্তর অন্য কাউকে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। নিজের কাছেই সৎভাবে উত্তর দেওয়াই যথেষ্ট।মানুষের বুদ্ধিমত্তার প্রকৃত পরিচয় শুধু নতুন কিছু আবিষ্কার করার ক্ষমতায় নয়; নিজের ভুল স্বীকার করার সাহসেও। নিজের স্বার্থের বাইরে অন্যের কথা ভাবতে পারায়। ক্ষমতা থাকলেও সংযত থাকতে পারায়। সুযোগ থাকলেও অন্যায় না করার শক্তিতে।সমাজে আইন থাকবে, প্রতিষ্ঠান থাকবে, শাস্তির ব্যবস্থা থাকবেÑএসব প্রয়োজনীয়। কিন্তু কোনো আইনই মানুষের বিবেকের বিকল্প হতে পারে না। একজন পুলিশ বা প্রশাসনের কর্মকর্তা সবসময় পাশে থাকতে পারেন না। একজন বিচারক প্রতিটি কাজের সাক্ষী হতে পারেন না। কিন্তু একজন মানুষের বিবেক সবসময় তার সঙ্গে থাকে।সেই বিবেককে জাগ্রত রাখাই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। আমরা যদি সত্যিই নিজেদের বুদ্ধিমান মনে করি, তাহলে সেই বুদ্ধিমত্তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হওয়া উচিত আমাদের আচরণে। কথায় নয়, কাজে; প্রদর্শনে নয়, চরিত্রে; অন্যকে বিচার করার মধ্যে নয়, নিজেকে বিচার করার সাহসে।শেষ পর্যন্ত মানুষ অন্যের চোখে যতটা ভালো, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সে নিজের চোখে কতটা সৎ। কারণ অন্য সবাইকে কিছু সময়ের জন্য বোঝানো সম্ভব, কিন্তু নিজের বিবেককে দীর্ঘদিন ফাঁকি দেওয়া যায় না।তাই সময় এসেছে অন্যকে প্রশ্ন করার আগে নিজেকে প্রশ্ন করারÑবিবেক যা বলছে, আমি কি সত্যিই তা শুনছি। লেখক: সংবাদকর্মী

গণতন্ত্রের প্রাণ হোক নাগরিকের প্রশ্ন করার অধিকার

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ৯ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৪৪ অপরাহ্ণ
গণতন্ত্রের প্রাণ হোক নাগরিকের প্রশ্ন করার অধিকার

শেখ সিদ্দিকুর রহমান
প-িত জওহরলাল নেহরুকে ঘিরে একটি প্রচলিত উপাখ্যান রয়েছেÑসংসদ ভবন থেকে বের হওয়ার সময় এক বয়স্কার নারী তাঁর কলার ধরে স্বাধীন দেশের প্রাপ্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। জবাবে নেহরু বলেছিলেন, “পেয়েছেন তো! প্রধানমন্ত্রীর কলার ধরার স্বাধীনতা।” ঘটনাটি ইতিহাসের অকাট্য সত্য না হলেও উপাখ্যানটির ভেতরে লুকিয়ে আছে এক গভীর গণতান্ত্রিক দর্শন। গণতন্ত্র মানে শুধু ভূখ- বা পতাকার স্বাধীনতা কিংবা নির্দিষ্ট সময় পর ভোট দেওয়া নয়; এর মূল কথা হলো নাগরিকের মর্যাদা, অধিকার এবং নির্ভয়ে কথা বলার স্বাধীনতা।
গণতন্ত্রে রাষ্ট্র ক্ষমতার মূল উৎস জনগণ। এখানে সরকার জনগণের ওপর কর্তৃত্ব করতে নয়, বরং সেবা দিতে ক্ষমতা পায়। অথচ বাস্তবে গণতন্ত্রকে কেবল নির্বাচনকেন্দ্রিক করে ফেলা হয়। প্রকৃতপক্ষে প্রকৃত গণতন্ত্রের সূচনা হয় নির্বাচনের পর। একজন কৃষক উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য, শ্রমিক যথাযথ মজুরি, শিক্ষার্থী মানসম্মত শিক্ষা আর সাধারণ নাগরিক নাগরিক সুবিধার বিষয়ে প্রশ্ন তুলবেনÑএটাই গণতন্ত্রের প্রাণ। কোনো সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা মানেই রাষ্ট্রের শত্রু হওয়া নয়, বরং ভিন্নমত রাষ্ট্র ও সমাজকে সমৃদ্ধ করে।
একই সঙ্গে কলার ধরে টান দেওয়া বা আইন নিজের হাতে নেওয়াও গণতন্ত্র নয়। এর প্রকৃত শিক্ষা হলো ক্ষমতাবানকে প্রশ্ন করার সাহস এবং একই সঙ্গে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা। আইনের শাসন তখনই সার্থক হয়, যখন তা ক্ষমতাবান ও সাধারণ নাগরিকের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হয়।
গণতন্ত্রের অন্যতম অপরিহার্য শর্ত স্বাধীন সংবাদমাধ্যম। স্থানীয় পর্যায়ে খালের দখল, সরকারি সেবায় অনিয়ম বা মানুষের দুর্ভোগের কথা যখন সাংবাদিকরা তুলে ধরেন, তখন তাঁরা মূলত সাধারণ মানুষের হয়ে প্রশ্নগুলো রাষ্ট্রের দরজায় পৌঁছে দেন। তাই সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রকারান্তরে নাগরিকেরই অধিকার।
বর্তমানে প্রয়োজন এমন এক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কৃতি:
সেবামুখী প্রশাসন: রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক হবে সেবাদাতা ও সেবাগ্রহীতার, প্রভু ও প্রজার নয়।
জবাবদিহিতা: জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তাকে তাঁর কাজের কৈফিয়ত জনগণের কাছে দিতে হবে।
ভিন্নমতের শ্রদ্ধা: অন্যায়ের প্রতিবাদ বা ভিন্নমতকে অপরাধ হিসেবে না দেখে ভুল সংশোধনের সুযোগ হিসেবে নেওয়া।
দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োগ: ভাতা পাওয়া, সেচের পানি পাওয়া কিংবা নিরাপদ সড়কের মতো দৈনন্দিন মৌলিক অধিকার পাওয়ার মধ্য দিয়েই প্রতিষ্ঠিত হবে প্রকৃত গণতন্ত্র।
ক্ষমতার কেন্দ্র যত ওপরেই থাকুক, সাধারণ নাগরিকের কণ্ঠস্বর যেন চাপা না পড়ে। রাষ্ট্র ও নাগরিক পরস্পরের অধিকার, মর্যাদা ও দায়িত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলেই গণতন্ত্র ব্যালট পেপার ছাড়িয়ে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবে।

বিশ্ব সিংহ দিবস: অরণ্যের রাজাকে রক্ষায় বৈশ্বিক অঙ্গীকার

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ৯ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৪৩ অপরাহ্ণ
বিশ্ব সিংহ দিবস: অরণ্যের রাজাকে রক্ষায় বৈশ্বিক অঙ্গীকার

সাকিবুর রহমান বাবলা
প্রতি বছর ১০ আগস্ট বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব সিংহ দিবস। এই দিনটি কেবল একটি বন্যপ্রাণীকে স্মরণ করার উপলক্ষ নয়; বরং পৃথিবীর অন্যতম প্রতীকী প্রাণী, সাহস, শক্তি ও নেতৃত্বের প্রতীক সিংহকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষার জন্য মানবজাতির এক সম্মিলিত অঙ্গীকারের দিন। হাজার বছর ধরে সিংহ মানবসভ্যতার ইতিহাস, সংস্কৃতি, সাহিত্য, ধর্মীয় প্রতীক, শিল্পকলা এবং লোককাহিনীর অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু আজ সেই ‘অরণ্যের রাজা’ নিজেই অস্তিত্ব সংকটে।
বিশ্ব সিংহ দিবসের সূচনা হয় ২০১৩ সালে। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণবাদী ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্র নির্মাতা দম্পতি ডেরেক জুবার্ট ও বেভারলি জুবার্ট এই দিবসের প্রবর্তন করেন। তারা দীর্ঘদিন ধরে আফ্রিকার সিংহ ও অন্যান্য বড় বিড়ালজাতীয় প্রাণীর জীবন নিয়ে গবেষণা ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন। সিংহের দ্রুত হ্রাসমান সংখ্যা দেখে তারা ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক-এর সহযোগিতায় বিগ ক্যাট ইনিশিয়েটিভ গড়ে তোলেন এবং সেখান থেকেই বিশ্ব সিংহ দিবসের যাত্রা শুরু হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো সিংহ সংরক্ষণ, তাদের আবাসস্থল রক্ষা, চোরা শিকার প্রতিরোধ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি।
একসময় আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে সিংহ বিচরণ করত। বর্তমানে তাদের বিস্তৃতি অনেক সংকুচিত হয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ সিংহকে ঝুঁকিপূর্ণ প্রজাতি হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী বর্তমানে পৃথিবীতে বন্য পরিবেশে মাত্র ২৩ হাজার থেকে ৩৯ হাজার সিংহ অবশিষ্ট রয়েছে। গত শতাব্দীতে সিংহের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে ২০৫০ সালের মধ্যে আফ্রিকার বন্য সিংহ প্রকৃতি থেকে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।
সিংহ শুধু একটি প্রাণী নয়; এটি একটি সম্পূর্ণ বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্যের রক্ষক। খাদ্যশৃঙ্খলের শীর্ষ স্তরের শিকারি হিসেবে সিংহ তৃণভোজী প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে এবং পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সিংহের উপস্থিতি একটি সুস্থ ও কার্যকর বাস্তুতন্ত্রের নির্দেশক। তাই সিংহ হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি প্রজাতির বিলুপ্তি নয়, বরং সমগ্র পরিবেশব্যবস্থার জন্য গভীর সংকট।
বর্তমান সময়ে সিংহের প্রধান হুমকিগুলোর মধ্যে রয়েছে আবাসস্থল ধ্বংস, বন উজাড়, কৃষি ও মানববসতির সম্প্রসারণ, জলবায়ু পরিবর্তন, অবৈধ শিকার এবং মানুষ-প্রাণীর সংঘাত। আফ্রিকার বহু অঞ্চলে মানুষের বসতি ও কৃষিজমি সম্প্রসারণের ফলে সিংহ তাদের ঐতিহ্যবাহী বিচরণক্ষেত্র হারাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে গবাদিপশুর ওপর আক্রমণের প্রতিশোধ হিসেবে সিংহকে হত্যা করা হয়। এছাড়া চামড়া, হাড়, দাঁত ও অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অবৈধ বাণিজ্যও তাদের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
বৈজ্ঞানিক গবেষণার অগ্রগতির ফলে বর্তমানে সিংহকে প্রধানত দুটি উপপ্রজাতিতে ভাগ করা হয়েছে। প্রথমটি প্যান্থেরা লিও লিও, যার মধ্যে পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকার সিংহ এবং ভারতের গুজরাটের গির অরণ্যের বিখ্যাত এশীয় সিংহ অন্তর্ভুক্ত। দ্বিতীয়টি প্যান্থেরা লিও মেলানোচাইটা, যা দক্ষিণ ও পূর্ব আফ্রিকার সিংহদের প্রতিনিধিত্ব করে। অতীতে বার্বারি সিংহ ও কেপ সিংহের মতো বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক উপপ্রজাতি পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
তবে সব খবরই হতাশার নয়। ভারতের গুজরাটের গির জাতীয় উদ্যান এশীয় সিংহ সংরক্ষণের একটি বিশ্বস্বীকৃত সফল উদাহরণ। একসময় বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাওয়া এশীয় সিংহের সংখ্যা ধারাবাহিক সংরক্ষণ প্রচেষ্টার ফলে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বর্তমানে তা প্রায় এক হাজারের কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে বিভিন্ন সাম্প্রতিক জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে একটি মাত্র অঞ্চলে তাদের কেন্দ্রীভূত উপস্থিতি রোগব্যাধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্য কোনো বড় বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে বিকল্প আবাসস্থল গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
সিংহ সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আইন ও চুক্তি কার্যকর রয়েছে। সাইটিস চুক্তির আওতায় এশীয় সিংহের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং আফ্রিকান সিংহের বাণিজ্য কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। এছাড়া কনভেনশন অন মাইগ্রেটরি স্পিসিস আফ্রিকার দেশগুলোকে সীমান্ত অতিক্রমকারী সংরক্ষণ কার্যক্রমে সহযোগিতা করতে উৎসাহিত করে।
বাংলাদেশে প্রাকৃতিকভাবে কোনো বন্য সিংহ না থাকলেও সিংহ সংরক্ষণের বৈশ্বিক প্রচেষ্টার সঙ্গে দেশের সম্পর্ক রয়েছে। আন্তর্জাতিক পাচারচক্র প্রায়ই বিভিন্ন দেশকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করে। ফলে বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুযায়ী সিংহ বা অন্যান্য সংরক্ষিত বন্যপ্রাণী হত্যা, পাচার, ক্রয়-বিক্রয় কিংবা তাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পরিবহন গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক চুক্তির সদস্য হওয়ায় সীমান্ত ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষও এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।
সিংহ নিয়ে মানুষের আগ্রহ কতটা গভীর, তার একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ পাওয়া যায় তথাকথিত ঞৎরষষরড়হ খরড়হং জবংবধৎপয-এ। সেখানে হিসাব করে দেখানো হয়েছে, যদি এক ট্রিলিয়ন পূর্ণবয়স্ক পুরুষ সিংহকে একত্র করা হয়, তবে তাদের মোট ভর হবে প্রায় ১.৮৭৫ দ্ধ ১০¹⁴ কিলোগ্রামÑ যা বিখ্যাত ধূমকেতু ৬৭পি-এর ভরের প্রায় ২০গুণ। যদিও এটি একটি তাত্ত্বিক ও কৌতূহলোদ্দীপক বৈজ্ঞানিক আলোচনা, তবুও এটি সিংহের প্রতি মানুষের দীর্ঘদিনের বিস্ময় ও আকর্ষণের প্রতিফলন।
বিশ্ব সিংহ দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীর মতো সিংহেরও এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। সিংহ রক্ষা মানে বন রক্ষা, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ পৃথিবী নিশ্চিত করা। আজকের এই দিনে আমাদের প্রত্যেকের অঙ্গীকার হওয়া উচিত—চোরা শিকার ও অবৈধ বন্যপ্রাণী বাণিজ্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া, পরিবেশবান্ধব নীতি সমর্থন করা এবং বিশ্বব্যাপী সংরক্ষণ কার্যক্রমকে শক্তিশালী করা। কারণ সিংহ শুধু অরণ্যের রাজা নয়; সে প্রকৃতির শক্তি, সৌন্দর্য ও ভারসাম্যের এক অনন্য প্রতীক। অরণ্যের এই গর্জন যদি একদিন স্তব্ধ হয়ে যায়, তবে তা হবে মানবসভ্যতার জন্যও এক অপূরণীয় ক্ষতি।