মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩

চৈত্রান্তে চড়ক: লোকবিশ্বাস ও সংস্কৃতি

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২৬, ৭:০১ অপরাহ্ণ
চৈত্রান্তে চড়ক: লোকবিশ্বাস ও সংস্কৃতি

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনচর্চাকে যদি একটি বাক্যে ধরতে হয়, তবে “বারো মাসে তেরো পার্বণ” প্রবাদটি অনিবার্যভাবে সামনে আসে। এই প্রবাদ শুধু উৎসবের প্রাচুর্যকে নির্দেশ করে না; এটি একটি জাতির জীবনদর্শন, অনুভূতি ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতাকে তুলে ধরে। বাঙালির প্রতিটি উৎসবের মধ্যেই রয়েছে কোনো না কোনো সামাজিক, অর্থনৈতিক কিংবা আধ্যাত্মিক তাৎপর্য। এই ধারাবাহিকতার সূচনা হয় পয়লা বৈশাখের নবজাগরণের মধ্য দিয়ে, আর সমাপ্তি ঘটে চৈত্র সংক্রান্তির গাম্ভীরে‌্য। এই শেষ প্রান্তেই দাঁড়িয়ে চড়ক পূজা যেন একদিকে বিদায়ের বেদনা, অন্যদিকে পুনর্জন্মের প্রত্যাশা বহন করে।

 

চড়ক পূজা কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়; এটি বাঙালির লোকজ সংস্কৃতির এমন একটি বহুমাত্রিক উপাদান, যেখানে ধর্ম, সমাজ, অর্থনীতি, শরীরী সাধনা এবং মানসিক বিশ্বাস একসূত্রে গাঁথা। এটি মূলত শিবকেন্দ্রিক গাজন উৎসবের অংশ, যা চৈত্র মাসব্যাপী চলে এবং সংক্রান্তির দিনে চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। গাজনের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন ভক্তি ও তপস্যার প্রকাশ ঘটে, অন্যদিকে এটি হয়ে ওঠে মানুষের সম্মিলিত জীবনযাপনের এক প্রতীকী মঞ্চ। চড়ক পূজার উৎপত্তি নিয়ে নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক তথ্য না থাকলেও এর চারপাশে গড়ে উঠেছে নানা লোককথা ও কিংবদন্তি।

 

রাজা সুন্দরানন্দ ঠাকুরের নাম এই প্রসঙ্গে প্রায়ই উচ্চারিত হয়, তবে ইতিহাসবিদদের মতে, এই উৎসবের শিকড় আরও গভীরে-গ্রামীণ ও কৃষিভিত্তিক সমাজের প্রাচীন বিশ্বাসে। প্রকৃতির অনুকূলতা লাভ, রোগ-ব্যাধি থেকে মুক্তি এবং জীবনের পুনর্জন্মের ধারণা-এই তিনটি উপাদান চড়ক পূজার ভিত গড়ে দিয়েছে। এই উৎসবের মধ্যে যে ভৌতিক শক্তি, ভূতপ্রেত কিংবা অলৌকিক বিশ্বাসের উপস্থিতি দেখা যায়, তা আসলে প্রাচীন মানুষের অজানাকে ব্যাখ্যা করার একটি প্রচেষ্টা।

 

যখন বিজ্ঞান ছিল না, তখন মানুষ প্রকৃতির অদৃশ্য শক্তিকেই দেবত্ব দান করেছিল। সেই ধারাবাহিকতায় চড়ক পূজা একধরনের লোকধর্মীয় আচার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। চড়ক পূজার সবচেয়ে আলোচিত দিক নিঃসন্দেহে এর শরীরনির্ভর আচার। আধুনিক সভ্যতার চোখে যা অনেক সময় নিষ্ঠুর বা অমানবিক বলে মনে হয়, তা অংশগ্রহণকারীদের কাছে একধরনের আধ্যাত্মিক সাধনা।

 

শরীরকে কষ্ট দিয়ে আত্মার পরিশুদ্ধি-এই ধারণা বহু প্রাচীন ধর্মীয় প্রথার সঙ্গে সম্পর্কিত।চড়কগাছে সন্ন্যাসীদের বেঁধে ঘোরানো, শরীরে হুক প্রবেশ করানো, জ্বলন্ত অঙ্গারের ওপর হাঁটা, ধারালো বস্তুর ওপর লাফানো-এসব আচার কেবল দেহের সহনশীলতার পরীক্ষা নয়; এগুলো বিশ্বাসের গভীরতার প্রকাশ। যারা এই আচার পালন করেন, তারা মনে করেন-এই কষ্টই তাদের পাপমোচনের পথ, এই যন্ত্রণা তাদের মুক্তির দিশা। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক দিকও রয়েছে।

 

চরম শারীরিক কষ্ট সহ্য করার মাধ্যমে মানুষ একধরনের আত্মিক তৃপ্তি লাভ করে, যা তাকে নিজের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার অনুভূতি দেয়। এই অভিজ্ঞতা অনেক সময় ধর্মীয় উন্মাদনা বা একধরনের তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থার সৃষ্টি করে, যা তাদের কাছে দেবতার সঙ্গে সংযোগের এক মাধ্যম হয়ে ওঠে। চড়ক পূজার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এর অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র। সন্ন্যাসী হিসেবে পূজার সমস্ত আচার সম্পন্ন করেন, এবং এই প্রক্রিয়ায় তারা একধরনের সামাজিক মর্যাদা অর্জন করেন।

 

এই দিকটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চড়ক পূজা একধরনের সামাজিক প্রতিবাদের ভাষা। এটি এমন একটি মঞ্চ, যেখানে সমাজের প্রান্তিক মানুষ নিজের অস্তিত্বকে প্রতিষ্ঠা করে। ধর্মীয় আচারকে কেন্দ্র করে তারা একটি বিকল্প সামাজিক কাঠামো তৈরি করে, যেখানে শ্রেণিবৈষম্য কিছুটা হলেও লঘু হয়। চড়ক পূজাকে ঘিরে যে মেলা বসে, তা গ্রামীণ অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই মেলা শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়; এটি একটি সামাজিক মিলনমেলা, যেখানে মানুষ আনন্দ, বিনোদন এবং পারস্পরিক যোগাযোগের সুযোগ পায়। স্থানীয় কৃষিপণ্য, হস্তশিল্প, মাটির তৈরি জিনিস, খেলনা, মিষ্টান্ন-সবকিছুই এই মেলায় স্থান পায়।

 

একই সঙ্গে থাকে লোকসংগীত, যাত্রাপালা, গম্ভীরা, বাউল গান-যা এই উৎসবকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। ফলে চড়ক পূজা শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি একটি সামগ্রিক গ্রামীণ জীবনযাত্রার প্রতিফলন। বর্তমান সময়ে চড়ক পূজাকে ঘিরে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একদিকে রয়েছে আধুনিক মানবাধিকার ও বিজ্ঞানমনস্কতা, যা শরীরকে আঘাত করে এমন আচারকে অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করে। অন্যদিকে রয়েছে ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রশ্ন, যা এই আচারগুলোকে বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে দেখছে।

 

অনেক জায়গায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে চড়ক পূজার ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলো নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। হুক দিয়ে ঝোলানো বা শরীরে বাণ বিদ্ধ করার মতো আচার অনেক ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ বা সীমিত করা হয়েছে। তবে তাতে উৎসবের মূল চেতনা হারিয়ে যাচ্ছে কিনা-সেই প্রশ্নও উঠে আসছে। এই দ্বন্দ্ব আসলে একটি বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতিফলন-কিভাবে একটি সমাজ তার অতীতকে ধারণ করে বর্তমানের সঙ্গে সামঞ্জস্য স্থাপন করবে। চড়ক পূজা এই প্রশ্নের একটি জীবন্ত উদাহরণ।চৈত্র সংক্রান্তি মূলত একটি সমাপ্তির প্রতীক-পুরোনো বছরের শেষ।

 

আর এই সমাপ্তির মধ্যেই লুকিয়ে থাকে নতুন শুরুর সম্ভাবনা। চড়ক পূজা সেই সম্ভাবনাকেই প্রতীকীভাবে প্রকাশ করে। শরীরের কষ্ট, আগুনের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাওয়া, বেদনার অভিজ্ঞতা-সবকিছু যেন একধরনের শুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে নতুন বছরের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে চড়ক পূজা একটি পুনর্জন্মের আচার। এটি শুধু ধর্মীয় নয়; এটি মানসিক ও সাংস্কৃতিক পুনর্গঠনের একটি প্রতীক। চড়ক পূজা আজও বেঁচে আছে-সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে।

 

হয়তো অনেক আচার বদলেছে, অনেক কিছু হারিয়ে গেছে, আবার নতুন কিছু যুক্ত হয়েছে। কিন্তু এর মূল সুরটি অটুট-মানুষের বিশ্বাস, কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা, এবং নতুন করে শুরু করার আকাক্সক্ষা। চৈত্রের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে এই উৎসব আমাদের মনে করিয়ে দেয়-সংস্কৃতি কখনও স্থির নয়; এটি প্রবাহমান। আর সেই প্রবাহের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে একটি জাতির ইতিহাস, তার সংগ্রাম, তার আনন্দ এবং তার ভবিষ্যতের স্বপ্ন। চড়ক পূজা তাই শুধু একটি উৎসব নয়; এটি বাঙালির আত্মপরিচয়ের এক গভীর প্রতিফলন-যেখানে অতীত ও বর্তমান মিলেমিশে তৈরি করে এক অনন্য সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা।

লেখক: সংবাদকর্মী

Ads small one

সুমন হত্যা মামলায় রুবেলকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৩:৫২ অপরাহ্ণ
সুমন হত্যা মামলায় রুবেলকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর

পত্রদূত ডেস্ক: ইসলামিক বক্তা মনোয়র হোসেন মোমিনের ব্যক্তিগত প্রাইভেটকার চালক সুমন হুসাইন হত্যা মামলায় গ্রেপ্তারকৃত আসামী হাবিবুর রহমান রুবেলকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুই দিনের রিমা- মঞ্জুর করা হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে সাতক্ষীরার অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক হাকিম বিলাস ম-ল মামলার তদন্তকারি কর্মকর্তা সদর থানার উপপরিদর্শক আলমগীর হোসেনের সাত দিনের রিমা- আবেদন শুনানী শেষে এ আদেশ দেন। গ্রেপ্তারকৃত হাবিবুর রহমান ওরফে রুবেল (২৯) সাতক্ষীরা সদর উপজেলার লাবসা ইউনিয়নের কৈখালি গ্রামের আলী হোসেনের ছেলে।

নিহত সুমন হুসাইনের চাচা ইকবাল হোসেন জানান, গত ১৯ জুলাই রবিবার রাতে আর্জেন্টিনা ও তুরস্কের মধ্যে বিশ^কাপ ফুটবলের চুড়ান্ত প্রতিযোগিতা চলছিল। রাত ১১টার দিকে ভাইপো সুমন হুসাইনকে মুঠোফোনে ডেকে নিয়ে যায় অজ্ঞাতনামা লোকজন। পরদিন সকালে কৈখালি গ্রামের কেসমত দাই এর মাছের ঘের থেকে বিবস্ত্র অবস্থায় সুমনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশ লাশের পাশ থেকে ৩৩ ভোল্টের বৈদ্যুতিক তার, দুটি লোহা কাটা ব্লেড ও সিমবিহীন একটি বাটাম ফোন উদ্ধার করে। এ ঘটনায় তার (ইকবাল) ভাই আব্দুল হামিদ সরদার বাড়ি হয়ে কারো নাম উল্লেখ করে ২০ জুলাই সাতক্ষীরা সদর থানায়( জিআর-৩২৭/২৬ সদর) একটি হত্যা ও লাশ গুমের চেষ্টার মামলা করেন।

 

১৯ জুলাই রাতে ফোন কলের সূত্র ধরে ১৮ সেপ্টেম্বর নিজ বাড়ি থেকে রুবেলকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরদিন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সদর থানার উপপরিদর্শক আলমগীর হোসেন রুবলেকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে সাত দিনের রিমা- আবেদন করেন।
আসামীপক্ষে রিমা- শুনানীতে অংশ নেন সাতক্ষীরা জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাড. আব্দুল মজিদ (২)। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানীতে অংশ নেন আদালতের পুলিশ উপপরিদর্শক (সিএসআই ) মাজেদুর রহমান।

সাতক্ষীরা সদর থানার উপপরিদর্শক ও মামলার তদন্তকারি কর্মকর্তা মোঃ আলমগীর হোসেন আসামী রুবেলের দুই দিনের রিমা- মঞ্জুর হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, আদালতের নির্দেশ পাওয়ার পর তাকে কখন পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হবে তা বলা যাবে।

ভালোবাসা, বয়স, নিরাপত্তা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৩:৪৪ অপরাহ্ণ
ভালোবাসা, বয়স, নিরাপত্তা

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

ভালোবাসার কোনো ক্যালেন্ডার নেই। নেই নির্দিষ্ট কোনো বয়সও। কখনো সমবয়সী দুজন মানুষের মধ্যে গড়ে ওঠে গভীর সম্পর্ক, কখনো বয়সের ব্যবধান পেরিয়েও দুটি মানুষ খুঁজে নেয় একে অপরের সঙ্গ। সেখানে বয়সের অঙ্কের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে বোঝাপড়া, শ্রদ্ধা, বিশ্বাস ও মানসিক পরিপক্বতা। তবে ভালোবাসার স্বাধীনতার পাশাপাশি আছে দায়িত্বেরও একটি অদৃশ্য সীমারেখা। সেই সীমারেখার নামÑনিরাপত্তা, সম্মতি ও মর্যাদা। জীবনের পথে মানুষ কখন যে কারও প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে, তার কোনো নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা নেই। পরিচয়ের পরতে পরতে জন্ম নেয় মায়া, মায়া থেকে টান, আর সেই টান কখনো কখনো পরিণত হয় ভালোবাসায়। বয়স সেখানে একটি সংখ্যা মাত্রÑএমন কথা অনেকেই বলেন। কথাটি সব ক্ষেত্রে সত্য না হলেও প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের পারস্পরিক, স্বাধীন ও সম্মত সম্পর্কের ক্ষেত্রে বয়সের ব্যবধান একাই কোনো সম্পর্কের মান নির্ধারণ করে না।

 

একজন বয়সে বড় মানুষ হয়তো জীবনের অনেক অভিজ্ঞতা সঙ্গে নিয়ে সম্পর্কের কাছে আসেন। অন্যজন হয়তো তুলনামূলক তরুণ, কিন্তু তার অনুভূতি, চিন্তা ও জীবনবোধ গভীর হতে পারে। আবার সমবয়সী দুজন মানুষও মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন জায়গায় অবস্থান করতে পারেন। তাই সম্পর্কের ক্ষেত্রে শুধু জন্মতারিখের হিসাব নয়, বরং মানুষ দুজন কীভাবে একে অপরকে বোঝেন, সম্মান করেন এবং স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেনÑসেটিই গুরুত্বপূর্ণ। প্রেম তখনই সুন্দর, যখন সেখানে অধিকারবোধের চেয়ে সম্মান বড় হয়। ভালোবাসা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন একজন আরেকজনকে নিজের মতো করে বাঁচার সুযোগ দেন। সম্পর্কের সৌন্দর্য কেবল পাশাপাশি হাঁটার মধ্যে নয়; কখনো কখনো প্রিয় মানুষটির নিজস্ব পথ, নিজস্ব মত ও নিজস্ব সিদ্ধান্তকেও সম্মান করার মধ্যেই ভালোবাসার সবচেয়ে বড় প্রকাশ ঘটে। তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখা স্পষ্ট করা জরুরি। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের পারস্পরিক ভালোবাসা আর শিশু বা অপ্রাপ্তবয়স্ককে জড়িয়ে কোনো রোমান্টিক বা যৌন সম্পর্ক-এক বিষয় নয়।

 

শিশুর ক্ষেত্রে বয়স কোনো সাধারণ সংখ্যা নয়; সেটি তার বিকাশ, নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষার একটি মৌলিক বিষয়। একটি শিশু আবেগ বুঝতে পারে, কাউকে পছন্দ করতে পারে, কারও প্রতি গভীর টানও অনুভব করতে পারে। কিন্তু সেই অনুভূতিকে প্রাপ্তবয়স্ক সম্পর্কের সমতুল্য ধরে নেওয়া নিরাপদ বা দায়িত্বশীল নয়। কারণ শিশুর মানসিক, সামাজিক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা এখনও বিকাশমান। তাই শিশুর ক্ষেত্রে প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়Ñ‘সে কাকে ভালোবাসে?’ প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিতÑ‘সে কতটা নিরাপদ?’ একজন শিশুর নিরাপত্তা, মর্যাদা, স্বাভাবিক বিকাশ এবং মানসিক সুস্থতা রক্ষার দায়িত্ব পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের। কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি তার বয়স, ক্ষমতা, প্রভাব, অর্থনৈতিক নির্ভরতা কিংবা সামাজিক অবস্থান ব্যবহার করে কোনো শিশুর ওপর আবেগগত বা অন্য কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তার করলে সেটিকে ভালোবাসার রোমান্টিক ভাষায় আড়াল করা যায় না। শিশুর সরলতা, বিশ্বাস বা নির্ভরশীলতাকে কখনোই সম্পর্কের বৈধতা হিসেবে দেখা উচিত নয়।

 

এখানে নৈতিকতার পাশাপাশি আইন ও সুরক্ষার প্রশ্নও রয়েছে। শিশুর ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্কদের দায়িত্ব আরও বেশি। তার ‘না’কে সম্মান করতে হবে, তার অস্বস্তিকে গুরুত্ব দিতে হবে এবং এমন যেকোনো পরিস্থিতি থেকে তাকে রক্ষা করতে হবে, যেখানে সে ভয়, চাপ, প্রলোভন, গোপনীয়তা বা ক্ষমতার অসমতার মধ্যে পড়ে যেতে পারে। কারণ শিশুর পৃথিবী এখনও তৈরি হচ্ছে। তার হাতে ভবিষ্যতের রঙতুলি। সেই ভবিষ্যৎকে কোনো সম্পর্কের আবেগ, প্রভাব বা ব্যক্তিগত আকাক্সক্ষার কাছে বিসর্জন দেওয়া যায় না। অন্যদিকে, প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সম্পর্কেও বয়সের ব্যবধান থাকলে কিছু বিষয় গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। দুজনের সম্মতি কি স্বাধীন? সম্পর্কের মধ্যে কি ক্ষমতার ভারসাম্য আছে? একজন কি অন্যজনের ওপর অর্থনৈতিক, সামাজিক বা মানসিকভাবে অতিরিক্ত নির্ভরশীল? সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে দুজনের সমান স্বাধীনতা আছে কি নাÑএসব প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বয়সের ব্যবধান নিজে সমস্যা নয়; কিন্তু বয়সের সঙ্গে যদি ক্ষমতার অসমতা যুক্ত হয়, তখন সম্পর্কের প্রকৃতি বদলে যেতে পারে।

 

ভালোবাসা কখনো কারও স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার নাম নয়। ভালোবাসা মানে কাউকে নিজের ছায়ায় আটকে রাখা নয়। ভালোবাসা মানে এমন এক সম্পর্ক, যেখানে দুজন মানুষ পাশাপাশি থেকেও নিজেদের স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণœ রাখতে পারেন। সমবয়সী সম্পর্কেরও যেমন সমস্যা থাকতে পারে, তেমনি বয়সের ব্যবধান থাকা সম্পর্কেও থাকতে পারে সৌন্দর্য, স্থিরতা ও গভীরতা। আবার বিপরীতটিও সত্য। তাই সম্পর্কের বিচার শুধু বয়স দিয়ে করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি শুধু আবেগ দিয়েও করা যায় না। প্রয়োজন বিবেক, দায়িত্ববোধ ও পারস্পরিক সম্মান।

 

সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষটির নিরাপত্তাই সভ্যতার বড় পরীক্ষা। আর সেই দুর্বলতার জায়গাটি যদি হয় একটি শিশু, তাহলে সেখানে কোনো অস্পষ্টতা, কোনো রোমান্টিক ব্যাখ্যা কিংবা কোনো সামাজিক আপসের সুযোগ নেই। ভালোবাসা মানুষের জীবনের সবচেয়ে কোমল অনুভূতিগুলোর একটি। তাই তাকে কলুষিত না করাই দায়িত্ব। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের স্বাধীন ও সম্মত ভালোবাসা তার মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকুক। আর শিশুর পৃথিবী থাকুক সম্পূর্ণ নিরাপদÑভালোবাসা, স্নেহ, শিক্ষা ও স্বপ্নে ভরা। কারণ ভালোবাসার সৌন্দর্য শুধু কাছে টানায় নয়, প্রয়োজন হলে সীমারেখা রক্ষা করাতেও। ভালোবাসার গভীরতা থাকতে পারে; কিন্তু শিশুর নিরাপত্তার সীমারেখা কখনোই অতিক্রম করা যায় না।

লেখক: সংবাদকর্মী

মিনা শিশুদের জন্য জনপ্রিয় টিভি কার্টুন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:১৪ পূর্বাহ্ণ
মিনা শিশুদের জন্য জনপ্রিয় টিভি কার্টুন

প্রকাশ ঘোষ বিধান

মিনা হলো দক্ষিণ এশিয়ার শিশুদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি শিক্ষামূলক অ্যানিমেশন কার্টুন। ইউনিসেফ এর উদ্যোগে শিশুদের অধিকার রক্ষা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং লিঙ্গ বৈষম্য দূরীকরণের বার্তা ছড়িয়ে দিতে এই কার্টুনটি তৈরি করা হয়। ১৯৯০-এর দশক থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত এটি বাংলাভাষী শিশুদের হৃদয়ে একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে।

মিনা কার্টুনটি শুধুমাত্র বিনোদনের জন্য নয়, বরং এর প্রতিটি পর্বের পেছনে একটি গভীর সামাজিক বার্তা থাকে। মিনাকে স্কুলে পাঠানোর জন্য তার বাবার সম্মতি আদায়ের গল্প। ডায়রিয়া প্রতিরোধে খাবার স্যালাইন তৈরি, বিশুদ্ধ পানির ব্যবহার এবং হাত ধোয়ার গুরুত্ব। ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে খাবার বা শিক্ষার ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করা। বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ এবং শিশু পাচার রোধে সচেতনতা তৈরি করা।

কার্টুনের প্রধান চরিত্র মিনা। সে একজন ৯ বছর বয়সী সাহসী, বুদ্ধিমান ও অনুসন্ধিৎসু মেয়ে, যে তার গ্রামের নানা সামাজিক সমস্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়। মিনার ছোট ভাই রাজু। সে মিনার সাথে বিভিন্ন অভিযানে অংশ নেয়। মিনার পোষা তোতাপাখি মিঠু। মিঠু অত্যন্ত চতুর এবং মিনার বিশ্বস্ত সঙ্গী, যে অনেক বিপদে মিনাকে বুদ্ধি দিয়ে সাহায্য করে। মিনার পোষা গরু লালি।
প্রতি বছর ২৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে মীনা দিবস পালন করা হয়। ইউনিসেফের সহায়তায় ১৯৯৮ সাল থেকে এই দিবসটি উদযাপিত হয়ে আসছে। যার মূল উদ্দেশ্য হলো; শিশুদের বিশেষ করে কন্যাসন্তানদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য সচেতনতা, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ এবং সমঅধিকার রক্ষা করা।

দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন ভাষায় নির্মিত একটি জনপ্রিয় টিভি কার্টুন মীনা। ১৯৯৩ সালে প্রথম বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত হয়। দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোতে বিভিন্ন সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি এবং শিশুদের জন্য শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানের একটি অংশ হিসেবে ইউনিসেফের সহায়তায় এই কার্টুন ধারাবাহিকটি নির্মিত হয়। কার্টুন ধারাবাহিকের মূল চরিত্র বাংলা ভাষায় নির্মিত কার্টুনগুলোর মধ্যে একটি অন্যতম জনপ্রিয় চরিত্র। মীনা কার্টুন শুধু বাংলায় তৈরি হয়নি। বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি, নেপালি-সহ ২৯টি ভাষায় মীনা তৈরি হয়েছে। মীনা কার্টুনের মীনা চরিত্রের রূপদানকারী বিখ্যাত ভারতীয় কার্টুনিস্ট রাম মোহন এবং ইউনিসেফের নিল ম্যাককি ছিলেন কার্টুন সিরিজটির স্্রষ্টা।

মীনা দিবস হলো শিশুদের সুন্দর ভবিষ্যৎ ও অধিকার নিশ্চিত করার একটি সচেতনতামূলক উৎসব। বিদ্যালয়গুলোতে শিশুদের জন্য মীনা কার্টুন প্রদর্শনী, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর আয়োজিত বিভিন্ন ইভেন্ট। শিশুদের অধিকার নিয়ে সচেতনতামূলক নাটক ও র‌্যালির আয়োজন করা হয়। গল্প বলা বা কুইজ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে শিশুদের পুরস্কৃত করে উৎসাহিত করা হয়।

মীনা কার্টুনের প্রধান চরিত্র মীনা শিক্ষার জন্য নানা প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে। দক্ষিণ এশিয়ায় ছেলে ও মেয়ে শিশুর মধ্যে যে বৈষম্য করা হতো, তা দূর করতে মীনা একটি প্রতীকী চরিত্র। এই দিনে বিভিন্ন আয়োজনের মাধ্যমে শিশুদের শেখানো হয় যে ছেলে ও মেয়ে উভয়ই সমান সুযোগ পাওয়ার অধিকারী। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা, খাওয়ার আগে হাত ধোয়া, নিরাপদ পানি ব্যবহার এবং সঠিক পুষ্টি গ্রহণের মতো প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধিগুলো মীনা দিবসে শিশুদের খেলার ছলে ও আনন্দের মাধ্যমে শেখানো হয়। বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ, শিশুশ্রম বন্ধ এবং শিশুদের যেকোনো ধরনের নির্যাতন থেকে রক্ষা করার সচেতনতা তৈরিতে এই দিবসটি বড় ভূমিকা রাখে।

দক্ষিণ এশিয়ায় ছেলে ও মেয়ে শিশুর মধ্যে যে বৈষম্য করা হতো, তা দূর করতে মীনা একটি প্রতীকী চরিত্র। মীনা কার্টুন চরিত্রটি শিশুদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়, যার মাধ্যমে শিক্ষণীয় বার্তাগুলো সহজে তাদের মধ্যে পৌঁছে যায়। এই দিনে বিভিন্ন আয়োজনের মাধ্যমে শিশুদের শেখানো হয় যে ছেলে ও মেয়ে উভয়ই সমান সুযোগ পাওয়ার অধিকারী।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট