পর্যটন শিল্পের স্বপ্নের মেগা প্ল্যান ও আমাদের করণীয়
মো: মামুন হাসান
একটি দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে মজবুত করতে পর্যটন শিল্প কতটা শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে তা বিশ্বের বহু দেশ প্রমাণ করেছে। বাংলাদেশও এখন সেই পথে হাঁটার জোরদার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অতি সম্প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে পর্যটন খাতকে ঘিরে যে মহাপরিকল্পনা ও নতুন লক্ষ্যমাত্রার কথা জানানো হয়েছে তা দেশের অর্থনীতিতে এক নতুন আশার আলো সঞ্চার করেছে।
২০৪০ সালের মধ্যে ৫ কোটি ৫৭ লাখ পর্যটক আকর্ষণ এবং ২ কোটি ১৯ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে লক্ষ্য ট্যুরিজম মেগা প্ল্যান ২০২৬-২০৪০ এ রাখা হয়েছে তা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং সাহসী পদক্ষেপ। বর্তমানে আমাদের আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা তুলনামূলক কম যেখানে ২০২৪ সালে বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটক এসেছেন প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার। এই বাস্তবতাকে বদলে দিতে সরকার আগামীতে জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান ৬ থেকে ৭ শতাংশে উন্নীত করতে চায়।
এই লক্ষ্য অর্জনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের জন্য ১ হাজার ৮৮৪ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে যা এই খাতের প্রতি সরকারের দূরদর্শী ভাবনারই প্রকাশ। বিশ্বজুড়ে যেখানে ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা ২ শতাংশ বেড়ে ৩০ কোটি ৭০ লাখে পৌঁছেছে সেখানে আমাদের এই বিশাল বৈশ্বিক বাজারের অংশীদার হতে হবে। অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় উঠে এসেছে একটি সমন্বিত বিনিয়োগ রোডম্যাপের কথা যেখানে পরিবেশবান্ধব ইকো ট্যুরিজম এবং গ্রামীণ পর্যটনের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
বর্তমান বিশ্বে পর্যটকদের মাঝে কোয়ায়েট ট্রাভেল বা কোলাহলমুক্ত ভ্রমণ এবং স্থানীয় সংস্কৃতি ও জীবনধারাভিত্তিক অভিজ্ঞতা অর্জনের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। সুন্দরবন, কক্সবাজার কিংবা সিলেটের চা বাগান অঞ্চলের মতো আমাদের যে প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে সেগুলোকে পরিবেশবান্ধব উপায়ে উপস্থাপন করতে পারলে বিশ্ব দরবারে আমরা এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছাতে পারব। তবে শুধু পরিকল্পনা ও বাজেট বরাদ্দই যথেষ্ট নয় বরং এই মহাপরিকল্পনাকে বাস্তব রূপ দিতে আমাদের আরও কিছু কার্যকরী ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
প্রথমত আমাদের আন্তর্জাতিক প্রচারণায় আমূল পরিবর্তন আনা দরকার। বর্তমান যুগ ডিজিটাল মার্কেটিং এর যুগ হওয়ায় বিশ্বখ্যাত ট্রাভেল ইনফ্লুয়েন্সারদের বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানিয়ে আমাদের সুন্দরবন বা ষাট গম্বুজ মসজিদের মতো ইউনেস্কো স্বীকৃত ঐতিহ্যগুলোকে বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে তুলে ধরতে হবে।
বিবিসি ট্রাভেল বা আন্তর্জাতিক ভ্রমণবিষয়ক বিভিন্ন প্রতিবেদনে আলজেরিয়া, চিলি বা ভুটানকে ২০২৬ সালের সম্ভাবনাময় ভ্রমণ গন্তব্য হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে এবং সেই তালিকায় বাংলাদেশের নাম অন্তর্ভুক্ত করার জন্য কূটনৈতিক স্তরে জোর লবিং প্রয়োজন। শ্রীলঙ্কার সঙ্গে চা ও বৌদ্ধ ঐতিহ্যভিত্তিক যৌথ পর্যটন উদ্যোগের যে পরিকল্পনা চলছে তা আরও সম্প্রসারিত করে ভারত বা নেপালের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে যৌথ ট্যুরিজম সার্কিট তৈরি করা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত বিদেশি পর্যটকদের জন্য বাংলাদেশে আসার প্রক্রিয়াটিকে পানির মতো সহজ করতে হবে। ভিসা অন অ্যারাইভাল বা আগমনী ভিসা সুবিধার আওতা আরও বাড়াতে হবে এবং সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি অনলাইন ও ডিজিটাল করতে হবে যেন একজন বিদেশি পর্যটক বিমানবন্দরে নেমেই কোনো রকম হয়রানি ছাড়া দ্রুততম সময়ে দেশে প্রবেশ করতে পারেন। বিমানবন্দরে যাত্রীসেবা আধুনিকীকরণ ও ডিজিটাল সেবার সম্প্রসারণের যে কথা বাজেটে বলা হয়েছে তার দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরি।
এর পাশাপাশি আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পর্যটন খাতে দক্ষ জনবল তৈরি করা। আমাদের দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিষয়ের ওপর জোর দিতে হবে এবং গাইডদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে যাতে তারা বিদেশি পর্যটকদের আমাদের সমৃদ্ধ ইতিহাস সঠিকভাবে বোঝাতে পারেন।
সবশেষে পর্যটকদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করা এই শিল্পের প্রাণ। ট্যুরিস্ট পুলিশের পরিধি ও কার্যকারিতা আরও বাড়াতে হবে বিশেষ করে নারী ও বিদেশি পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে রাত দিন চব্বিশ ঘণ্টা। কক্সবাজার, যশোর, সৈয়দপুর বা রাজশাহীর মতো বিমানবন্দরগুলোকে আন্তর্জাতিক গেটওয়ে হিসেবে উন্নয়ন করার যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে সেগুলোর চারপাশের যোগাযোগ ব্যবস্থা ও হোটেল রিসোর্টের মানও আন্তর্জাতিক স্তরে উন্নীত করতে হবে।
সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও করের বোঝা কমাতে হবে। পর্যটন শিল্প কেবল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের হাতিয়ার নয় এটি দেশের লাখ লাখ বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের এক বিশাল ক্ষেত্র। সঠিক সমন্বয় এবং বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারলে প্রস্তাবিত এই মেগা প্ল্যান বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে এবং বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান ও আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হবে।
লেখক: মো: মামুন হাসান, ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান,ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।












