সাকিবুর রহমান বাবলা
মানবসভ্যতার ইতিহাসে ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই এক অবিস্মরণীয় মাইলফলক। নাসার অ্যাপোলো-১১ মিশনের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো মানুষ চাঁদের মাটিতে পদার্পণ করে এবং বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও মহাকাশ অনুসন্ধানে নতুন যুগের সূচনা করে। নভোচারী নিল আর্মস্ট্রং ও বাজ অলড্রিন চাঁদের বুকে পদচারণা করেন এবং মাইকেল কলিন্স কমান্ড মডিউলে থেকে কক্ষপথে অবস্থান করেন। এই ঐতিহাসিক সাফল্যকে সম্মান জানাতে এবং মহাকাশ গবেষণার অগ্রগতিকে তুলে ধরতে প্রতি বছর ২০ জুলাই বিশ্বব্যাপী ‘আন্তর্জাতিক চন্দ্র দিবস’ পালিত হয়।
বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে, চাঁদ পৃথিবীর একমাত্র স্থায়ী প্রাকৃতিক উপগ্রহ এবং সৌরজগতের পঞ্চম বৃহত্তম উপগ্রহ। প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীর সঙ্গে এক বিশাল বস্তুর সংঘর্ষে সৃষ্ট ধ্বংসাবশেষ থেকে এর জন্ম। প্রায় ৩,৪৭৪ কিলোমিটার ব্যাসের এই উপগ্রহটির নিজস্ব কোনো আলো নেই; এটি সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে এবং এর মহাকর্ষীয় টানের ফলে পৃথিবীতে জোয়ার-ভাটা সংঘটিত হয়। পৃথিবী থেকে গড়ে প্রায় ৩,৮৪,৪০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চাঁদ প্রায় ২৭.৩ দিনে পৃথিবীকে একবার প্রদক্ষিণ করে, আর এক পূর্ণ চন্দ্রকলার চক্র সম্পন্ন করতে সময় লাগে প্রায় ২৯.৫ দিন।
পবিত্র আল-কোরআনের বর্ণনায় চাঁদ সৃষ্টিকর্তার এক অনন্য সৃষ্টি ও তাঁর ক্ষমতার নিদর্শন। মানবজাতির সময় গণনার সুবিধার্থে চাঁদকে বর্ধনশীল ও ক্ষয়িষ্ণু বিভিন্ন পর্যায়ে পরিচালিত করা হয়েছে, যার ভিত্তিতে চন্দ্রবর্ষ, মাস এবং হজের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের সময় নির্ধারিত হয়। চাঁদ একটি নির্দিষ্ট কক্ষপথ ও সুনির্দিষ্ট নিয়মে আবর্তিত হয়, যার প্রভাবে পৃথিবীতে জোয়ার-ভাটা সৃষ্টি হয় এবং মহাজাগতিক ভারসাম্য বজায় থাকে। কোরআনে চাঁদকে ‘নূর’ বা প্রতিফলিত আলো হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে; এর নিজস্ব আলো নেই, বরং এটি সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে। হাদিসেও নতুন চাঁদ দেখে ইসলামি মাস ও ইবাদতের সময় নির্ধারণের নির্দেশনা রয়েছে, যা সময়ানুবর্তিতা, কৃতজ্ঞতা, জ্ঞানচর্চা ও বিজ্ঞান গবেষণার গুরুত্ব তুলে ধরে।
১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই কমান্ডার নিল আর্মস্ট্রং এবং লুনার মডিউল পাইলট বাজ অলড্রিন ‘ইগল’ নামক যান নিয়ে চাঁদের ‘সি অব ট্রাঙ্কুইলিটি’ অঞ্চলে অবতরণ করেন। প্রথম মানুষ হিসেবে চাঁদের মাটিতে পা রেখে আর্মস্ট্রং বলেছিলেন: “মানুষের জন্য এটি একটি ছোট পদক্ষেপ, কিন্তু মানবজাতির জন্য এক বিরাট লাফ।” ১৬ জুলাই কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে শুরু হওয়া এই মিশনটি চার দিন পর সফলভাবে পৃথিবীতে ফিরে আসে, যা মানুষের সাহস ও উদ্ভাবনী সক্ষমতার অনন্য নজির। আর্থার সি ক্লার্ক- (বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞান কল্পকাহিনী লেখক) এর ভাষায়: “নক্ষত্রদের পথে হাঁটার প্রথম মাইলফলক হলো চাঁদ।”
চাঁদে মানুষের প্রথম পদার্পণের এই ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্বীকৃতি দিতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২০২১ সালের ৯ ডিসেম্বর A/RES/76/76 প্রস্তাবের মাধ্যমে ২০ জুলাইকে ‘আন্তর্জাতিক চন্দ্র দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। মুন ভিলেজ অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে ২০২২ সালে প্রথম এই দিবসটি আনুষ্ঠানিকভাবে পালিত হয়। দিবসটির লক্ষ্য হলো মহাকাশ অনুসন্ধান সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, চন্দ্রপৃষ্ঠের সম্পদের টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং তরুণ প্রজন্মকে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত শিক্ষায় উৎসাহিত করা।
জাতিসংঘের বাহ্যিক মহাকাশ বিষয়ক দপ্তর UNOOSA-এর তত্ত্বাবধানে আন্তর্জাতিক চন্দ্র দিবস উপলক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সেমিনার, মহাকাশ প্রদর্শনী ও আকাশ পর্যবেক্ষণ কর্মসূচি আয়োজন করা হয়। একই সঙ্গে নাসার ‘আর্টেমিস’ মিশনসহ বিভিন্ন দেশের নতুন চন্দ্রাভিযান প্রমাণ করছে যে, চাঁদকে ঘিরে গবেষণা ও অনুসন্ধান এখনো অব্যাহত রয়েছে। এই দিবস কেবল চাঁদে মানুষের প্রথম অবতরণের স্মারক নয়, বরং বিজ্ঞান, অনুসন্ধিৎসা ও বৈশ্বিক সহযোগিতার এক অনুপ্রেরণামূলক আহ্বান। চাঁদে পা রেখেই আর্মস্ট্রং তাঁর বিখ্যাত উক্তিটি করেছিলেন: “That’s one small step for [a] man, one giant leap for mankind.” (এটি একজন মানুষের জন্য ছোট একটি পদক্ষেপ, কিন্তু মানবজাতির জন্য এক বিশাল বড় লাফ।)