বজ্রপাতে মৃত্যুর মিছিল থামে না: আশাশুনির আকাশে শঙ্কা, উদ্যোগে ঘাটতি
সচ্চিদানন্দ দে সদয়, আশাশুনি: আশাশুনির আকাশে কালো মেঘ জমলেই এখন এক ধরনের অদৃশ্য আতঙ্ক নেমে আসে। মাঠে কাজ করা কৃষক, খালে মাছ ধরা জেলে, কিংবা স্কুল ফেরত শিশু-সবার চোখে-মুখে এক অজানা শঙ্কা। বিদ্যুতের ঝলকানি আর বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে চারপাশ। এই বজ্রধ্বনি যেন শুধু প্রকৃতির শব্দ নয়, অনেক পরিবারের জন্য তা হয়ে উঠছে মৃত্যুর পূর্বাভাস।
বাংলাদেশে বজ্রপাত এখন এক নীরব ঘাতক। প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩০০ মানুষ প্রাণ হারায় এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে। চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই অর্ধশতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এই মৃত্যুর বড় অংশই গ্রামাঞ্চলে-যেখানে মানুষ খোলা আকাশের নিচে জীবিকা নির্বাহ করে। সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলাও এর বাইরে নয়; বরং উপকূলীয় ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এখানে ঝুঁকি আরও বেশি।
আশাশুনির বুধহাটা, শ্রীউলা বা প্রতাপনগরের বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত-এই অঞ্চলগুলোর মানুষ মূলত কৃষিনির্ভর। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে যখন ধান কাটার মৌসুম, তখনই বজ্রপাতের প্রকোপ বাড়ে। কৃষকরা জানান, “মেঘ দেখলেই এখন কাজ বন্ধ করে বাড়ি ফিরতে হয়। কিন্তু সবসময় তা সম্ভব হয় না।” বেসরকারি এক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বজ্রপাতে নিহতদের প্রায় ৭০ শতাংশই কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। অর্থাৎ জীবিকার প্রয়োজনে যারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি নেন, তারাই সবচেয়ে বেশি প্রাণ হারান।
এই আশঙ্কারই বাস্তব রূপ দেখা গেল গত ২৯ এপ্রিল রাতে। উপজেলার আনুলিয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ একসরা গ্রামে বজ্রপাতে মারা যান ২৮ বছর বয়সী মৎস্য ঘের ব্যবসায়ী মো. সুমন হোসেন। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, সেদিন রাতেও তিনি নিজের মৎস্য ঘেরে ছিলেন। হঠাৎ বজ্রসহ বৃষ্টি শুরু হলে ঘেরের পাশের একটি ছোট ঘরে আশ্রয় নেন। কিন্তু মুহূর্তেই ভয়াবহ বজ্রপাত আঘাত হানে।
নিহতের বাবা আব্দুল মান্নান মোল্লা বলেন, “ছেলেটা আমার সংসারের একমাত্র ভরসা ছিল। সারাদিন ঘেরে কাজ করত, রাতে পাহারা দিত। বজ্রপাত এভাবে কেড়ে নেবে, কখনো ভাবিনি।” স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তার জানান, “বজ্রপাতের সময় আমরা ঘরেই ছিলাম। হঠাৎ বিকট শব্দ হলো। পরে শুনি সুমন মারা গেছে। প্রতি বছরই এমন ঘটনা ঘটছে, কিন্তু প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেই।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেই বজ্রপাতের তীব্রতা ও ঘনত্ব বাড়ছে। আগে যেখানে বর্ষাকালকে বজ্রপাতের মৌসুম ধরা হতো, এখন তা বছরের বিভিন্ন সময়েই ঘটছে। তবে মার্চ, এপ্রিল ও মে-এই তিন মাসে দেশের প্রায় ৩৮ শতাংশ বজ্রসহ ঝড় হয়, যা আশাশুনির মতো উপকূলীয় অঞ্চলে পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। উপকূলীয় এলাকায় জলীয় বাষ্পের আধিক্য এবং বায়ুর সংঘর্ষ বজ্রপাতের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। ফলে সাতক্ষীরা, যশোর, খুলনা অঞ্চলেও বজ্রপাতের হার বাড়ছে।
বজ্রপাতকে সরকার ২০১৬ সালে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর থেকে বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। আশাশুনিসহ বিভিন্ন এলাকায় বজ্র নিরোধক দ- স্থাপন, মাল্টিপারপাস শেড নির্মাণ, এমনকি তালগাছ রোপণের মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। আশাশুনির অনেক এলাকায় এখনো বজ্র নিরোধক দ- চোখে পড়ে না। তালগাছ রোপণের প্রকল্পও স্থায়ী ফল দেয়নি-অনেক গাছই হারিয়ে গেছে অবহেলায়।
আনুলিয়া ইউনিয়নের এক জনপ্রতিনিধি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “প্রকল্প কাগজে-কলমে থাকে, বাস্তবে তার সুফল মানুষ পায় না। বজ্রপাতের মতো ঝুঁকিতে কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।” দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর থেকে সচেতনতা বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হলেও, আশাশুনির গ্রামগুলোতে এর বাস্তব প্রয়োগ খুব কম। স্থানীয় শিক্ষক মাষ্টার লিয়াকত আলী বলেন, “স্কুলে বা গ্রামে নিয়মিত সচেতনতা কার্যক্রম নেই।
অনেকেই জানেন না, বজ্রপাতের সময় কোথায় আশ্রয় নেওয়া নিরাপদ।” অনেকেই এখনো গাছের নিচে দাঁড়ান বা খোলা মাঠে অবস্থান করেন, যা ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু প্রকল্প নিলেই হবে না, তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। আশাশুনির মতো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায়-পর্যাপ্ত বজ্র নিরোধক দ- স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ, মাঠের পাশে আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, স্কুল-কলেজে সচেতনতা শিক্ষা, কৃষকদের জন্য মোবাইল সতর্কবার্তা ব্যবস্থা তালগাছসহ উপযোগী বৃক্ষরোপণ-এসব কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন জরুরি। আশাশুনির মানুষ এখনো সেই অপেক্ষায়-যেদিন আকাশে মেঘ জমলেও আতঙ্ক নয়, বরং নিরাপত্তার নিশ্চয়তা অনুভব করবে তারা।











