বনবিবির সন্তানেরা এবং বাঘের সঙ্গে এক অলিখিত চুক্তি
মো. মামুন হাসান
সুন্দরবনের গহীনে যখন ভোরের কুয়াশা কাটতে শুরু করে, তখন ছোট ছোট নৌকায় চড়ে একদল মানুষ রওনা দেয় এমন এক যুদ্ধযাত্রায়, যার প্রতিপক্ষ পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর শিকারিদের একজন। এরা মৌয়াল। বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটের হাজার হাজার পরিবারের জীবিকা নির্ভর করে এই মানুষগুলোর সাহসের ওপর, যারা প্রতি বছর এপ্রিল থেকে জুন মাসে সুন্দরবনে ঢোকেন কেবল একটি জিনিসের খোঁজে, বন্য মধু।
এই পেশাটি শুনতে যতটা রোমান্টিক লাগে, বাস্তবতা ততটাই নির্মম। প্রতিটি মৌসুমে গড়ে কয়েকজন মৌয়াল রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের আক্রমণে প্রাণ হারান, আরও অনেকে ফিরে আসেন গুরুতর জখম নিয়ে। সরকারি হিসাবে যে সংখ্যা পাওয়া যায়, বাস্তব সংখ্যা তার চেয়ে বহুগুণ বেশি বলে মনে করেন স্থানীয়রা, কারণ অনেক মৃত্যু কিংবা নিখোঁজের ঘটনা কখনো নথিভুক্তই হয় না। যে বনজীবী পরিবার একবার তার উপার্জনক্ষম সদস্যকে বাঘের পেটে হারায়, তার জন্য অপেক্ষা করে থাকে কেবল দারিদ্র্য আর অনিশ্চয়তার এক দীর্ঘ ছায়া।
এই ভয়াবহ ঝুঁকির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মৌয়ালরা যে সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক আশ্রয় গড়ে তুলেছেন, তার কেন্দ্রে আছেন বনবিবি। হিন্দু মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মৌয়ালদের কাছেই তিনি সমান শ্রদ্ধার পাত্র, এক অসাম্প্রদায়িক লোকদেবী, যিনি বনের রক্ষাকর্ত্রী বলে বিশ্বাস করা হয়। বনে ঢোকার আগে প্রতিটি নৌকায় বনবিবির পূজা অনুষ্ঠিত হয়, মানত করা হয়, প্রার্থনা করা হয় নিরাপদে ফেরার জন্য। এই আচার কোনো নিছক কুসংস্কার নয়, বরং এক মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতি, যা মানুষকে অজানা বিপদের মুখোমুখি হওয়ার সাহস জোগায়।
আরও চমকপ্রদ হলো বাঘের সঙ্গে মৌয়ালদের এক ধরনের অলিখিত সম্পর্কের ধারণা, যাকে স্থানীয় লোকবিশ্বাসে প্রায়ই এক চুক্তির রূপে দেখা হয়। দক্ষিণরায় নামের বাঘ দেবতার কাহিনি এই বিশ্বাসের মূলে। কিংবদন্তি অনুযায়ী বনবিবি ও দক্ষিণরায়ের মধ্যে এক আপসরফা হয়েছিল, যেখানে মানুষ যদি বনের প্রতি সম্মান দেখিয়ে সীমিত পরিমাণে সম্পদ আহরণ করে, তবে বাঘ তাকে আক্রমণ করবে না। মৌয়ালরা তাই মধু সংগ্রহের সময় কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলেন, যেমন প্রয়োজনের অতিরিক্ত মৌচাক না ভাঙা, নির্দিষ্ট আচার পালন করে বনে প্রবেশ করা, কিংবা মুখোশ পরিধান করে বাঘকে বিভ্রান্ত করার কৌশল অবলম্বন করা। এই বিশ্বাস কার্যকর প্রতিরোধমূলক আইন না হলেও এর মধ্যে লুকিয়ে আছে এক গভীর পরিবেশগত প্রজ্ঞা, প্রকৃতি থেকে নিলে সীমা মেনে নেওয়ার শিক্ষা।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই যে জীবনবাজি রেখে মধু সংগ্রহ করে আনা মৌয়ালরা, তাদের প্রাপ্য মূল্য কি তারা পান। বাজারে যে মধু বিক্রি হয় চড়া দামে, সেই মধুর প্রকৃত উৎপাদনকারীর ভাগে জোটে সামান্যই। মধ্যস্বত্বভোগীদের হাত ঘুরে মুনাফার সিংহভাগ চলে যায় অন্য কারো পকেটে। যে মানুষটি বাঘের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জীবনের ঝুঁকি নেন, তার সন্তানের শিক্ষা কিংবা পরিবারের স্বাস্থ্যসেবার ন্যূনতম নিশ্চয়তাও অনেক সময় থাকে না।
রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে মৌয়ালদের জন্য বিমা ব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তা সরঞ্জাম সরবরাহের যে উদ্যোগ নেওয়ার কথা, তা এখনো অনেকাংশে কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ। বন বিভাগের অনুমতিপত্র নেওয়ার প্রক্রিয়া জটিল, আর দুর্ঘটনার শিকার পরিবারের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার পথ আরও দুর্গম। অথচ এই মানুষগুলোই সুন্দরবনের প্রকৃত রক্ষক, কারণ তারা জানেন বন বাঁচলেই তাদের জীবিকা বাঁচবে।
সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনপদের এই মৌয়াল সম্প্রদায়ের গল্প আসলে বাংলাদেশের এক প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র, যারা প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের এক অনন্য দর্শন ধারণ করেও রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায় থেকে যান অবহেলিত। বনবিবির প্রতি তাদের বিশ্বাস আর বাঘের সঙ্গে তাদের সেই নীরব সমঝোতা কেবল লোকজ সংস্কৃতির উপাদান নয়, এটি টিকে থাকার এক আশ্চর্য কৌশল, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পরিমার্জিত হয়ে এসেছে। এই কৌশলকে সম্মান জানিয়ে যদি রাষ্ট্র তাদের পাশে দাঁড়ায়, তবেই সুন্দরবন এবং তার সন্তানেরা উভয়েই রক্ষা পাবে।












