বিশ্বকাপ উন্মাদনা, অতি আবেগ ও জাতীয় চেতনার প্রশ্ন
গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ
ফুটবল বিশ্বকাপ বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ক্রীড়া আসর। কিন্তু একটি বিষয় প্রায়ই আমাকে ভাবিয়ে তোলে-বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলে না, তবুও বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে আমাদের দেশে যে মাত্রার উন্মাদনা দেখা যায়, তা অনেক অংশগ্রহণকারী দেশের তুলনাতেও বেশি বলে মনে হয়।
বিশ্বকাপ এলেই দেশের বিভিন্ন স্থানে বিদেশি দলের বিশাল বিশাল পতাকা উড়তে দেখা যায়। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা কিংবা অন্য কোনো দেশের প্রতি সমর্থন থাকতেই পারে, কিন্তু সেই সমর্থন যখন জাতীয় পরিচয় ও মর্যাদার ঊর্ধ্বে চলে যায়, তখন তা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার চেয়ে বিদেশি পতাকা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। কোথাও কোথাও জাতীয় পতাকার উপরে বা সমমর্যাদায় বিদেশি পতাকা প্রদর্শনের ঘটনাও চোখে পড়ে, যা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীকের প্রতি অসম্মান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, বিশ্বকাপ উন্মাদনাকে কেন্দ্র করে অনেক মানুষ প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করেন। হাজার হাজার টাকা খরচ করে বিশাল পতাকা তৈরি, মোটর শোভাযাত্রা, আলোকসজ্জা কিংবা অন্যান্য প্রদর্শনীমূলক আয়োজন এমন একটি দেশে প্রশ্নের জন্ম দেয়, যেখানে এখনও বহু মানুষ মৌলিক চাহিদা পূরণে সংগ্রাম করছেন। খেলাধুলা আনন্দের উৎস হতে পারে, কিন্তু সেই আনন্দ যদি অপচয়ের প্রতীকে পরিণত হয়, তাহলে তা সমাজের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে না।
বিশ্বকাপকে ঘিরে রাতভর উল্লাস, উচ্চ শব্দ, বিশৃঙ্খল আচরণ এবং কিছু ক্ষেত্রে সামাজিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের ঘটনাও আলোচনায় আসে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও জনসমাগমস্থলে এমন কিছু আচরণ দেখা যায়, যা আমাদের সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রশ্ন হলো, একটি বিদেশি দলের জয়-পরাজয়কে কেন্দ্র করে এতটা আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠা কতটা যৌক্তিক?
খেলাধুলা মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও সুস্থ বিনোদনের বার্তা বহন করে। কিন্তু যখন সমর্থন অন্ধ আবেগে রূপ নেয়, তখন তা ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজের জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে, আমরা বাংলাদেশের নাগরিক। অন্য দেশের খেলাকে উপভোগ করা যেতে পারে, কিন্তু নিজের জাতীয় পরিচয়, সংস্কৃতি ও মর্যাদাকে কখনোই খাটো করা উচিত নয়।
বিশ্বকাপের আনন্দ হোক সংযমের, সচেতনতার এবং সুস্থ বিনোদনের। আবেগ থাকুক, কিন্তু সেই আবেগ যেন বিবেক, দায়িত্ববোধ এবং দেশপ্রেমকে ছাপিয়ে না যায়।












