বিশ্ব রোগী নিরাপত্তা দিবস: নিরাপদ চিকিৎসা, নিরাপদ জীবন
সাকিবুর রহমান বাবলা
১৭ সেপ্টেম্বর পালিত হয় বিশ্ব রোগী নিরাপত্তা দিবস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে পালিত এ দিবসের মূল লক্ষ্য হলো স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের সময় রোগীর অনিচ্ছাকৃত ক্ষতি ও ঝুঁকি কমানো, সেবার মান উন্নত করা এবং রোগী, স্বজন, স্বাস্থ্যকর্মী ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে নিরাপদ চিকিৎসা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য ‘অসংক্রামক রোগের জন্য নিরাপদ সেবা’; আর স্লোগান ‘সেইফ কেয়ার ফর লাইফ’।
রোগীর নিরাপত্তা বলতে শুধু চিকিৎসকের ভুল এড়ানো বোঝায় না। হাসপাতাল বা ক্লিনিকে চিকিৎসা নিতে গিয়ে রোগের বাইরেও যে অনিচ্ছাকৃত ক্ষতি হতে পারে, তা প্রতিরোধ করাই এর মূল কথা। ভুল ওষুধ বা ভুল মাত্রা দেওয়া, ভুল রোগী কিংবা ভুল অঙ্গে অস্ত্রোপচার, রোগ নির্ণয়ে ভুল বা বিলম্ব, হাসপাতাল থেকে সংক্রমণ, অনিরাপদ ইনজেকশন, রক্ত সঞ্চালনে ভুল কিংবা বেড ও বাথরুম থেকে পড়ে গিয়ে আঘাত পাওয়া—সবই রোগী নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য স্বাস্থ্যও এসব ঝুঁকিকে রোগী নিরাপত্তার বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের বহুল পরিচিত নীতি—‘সবার আগে ক্ষতি না করা’। তাই রোগীকে নিরাপদ রাখা চিকিৎসারই অবিচ্ছেদ্য অংশ। এজন্য রোগী শনাক্তকরণে পূর্ণ নামের সঙ্গে জন্মতারিখ বা আইডি নম্বরের মতো অন্তত দুটি পরিচয় নিশ্চিত করা, শিফট পরিবর্তনের সময় রোগীর তথ্য স্পষ্টভাবে হস্তান্তর করা এবং জরুরি পরীক্ষার ফল দ্রুত সংশ্লিষ্ট চিকিৎসককে জানানো জরুরি। উচ্চঝুঁকির ওষুধ, যেমন ইনসুলিন বা রক্ত পাতলা করার ওষুধ ব্যবহারে বাড়তি সতর্কতা ও ডাবল-চেক প্রয়োজন। অস্ত্রোপচারের আগে ‘টাইম-আউট’-এর মাধ্যমে সঠিক রোগী, সঠিক অঙ্গ ও সঠিক অস্ত্রোপচার নিশ্চিত করতে হবে।
সংক্রমণ প্রতিরোধেও কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না। রোগীকে স্পর্শের আগে ও পরে যথাযথভাবে হাত পরিষ্কার করা, নিরাপদ ইনজেকশন পদ্ধতি অনুসরণ এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম যথাযথভাবে জীবাণুমুক্ত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের পড়ে যাওয়া ঠেকাতে বেডের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং বাথরুমে অ্যান্টি-স্কিড ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।
তবে রোগীর নিরাপত্তার দায়িত্ব শুধু চিকিৎসক বা হাসপাতালের নয়; রোগী ও স্বজনেরও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। চিকিৎসক কোনো ওষুধ বা পরীক্ষা দিলে তার কারণ জানতে হবে। রোগী কোন কোন ওষুধ সেবন করছেন এবং কোনো ওষুধ বা খাবারে অ্যালার্জি আছে কি না, তা স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। আগের প্রেসক্রিপশন, পরীক্ষার রিপোর্ট ও চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি তারিখ অনুযায়ী সংরক্ষণ করা উচিত। গুরুতর অসুস্থ রোগীর সঙ্গে একজন সচেতন স্বজন থাকলে চিকিৎসকের নির্দেশনা বুঝে নেওয়া ও প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণ সহজ হয়। স্বাস্থ্যকর্মী ইনজেকশন বা অন্য কোনো চিকিৎসা দেওয়ার আগে হাত পরিষ্কার করছেন কি না, তা প্রয়োজন হলে বিনয়ের সঙ্গে জানতে পারাও রোগীর অধিকার।
নিরাপদ চিকিৎসার জন্য দরকার একটি শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা। হাসপাতালগুলোতে ইলেকট্রনিক হেলথ রেকর্ড, ডিজিটাল প্রেসক্রিপশন ও পরীক্ষার রিপোর্ট ব্যবস্থাপনা চালু হলে তথ্যের ভুল ও পুনরাবৃত্তি কমানো সম্ভব। চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়মিত রোগী নিরাপত্তা, আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি ও পেশাগত আচরণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। চিকিৎসায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও প্রমাণভিত্তিক নির্দেশিকা অনুসরণ, রোগী-কেন্দ্রিক সেবা, নিয়মিত ক্লিনিক্যাল অডিট এবং মানসম্মত হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
জনসচেতনতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। টেলিভিশন, রেডিও, সংবাদপত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহজ ভাষায় স্বাস্থ্যবার্তা প্রচার, গ্রামীণ ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কাছে কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে তথ্য পৌঁছে দেওয়া এবং স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রমে প্রাথমিক চিকিৎসা, পরিচ্ছন্নতা, পুষ্টি ও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য দিবসগুলোতে সেমিনার, সচেতনতামূলক কর্মসূচি ও চিকিৎসা ক্যাম্প আয়োজনও জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে পারে।
রোগী নিরাপত্তায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক ভূমিকা পালন করছে। গ্লোবাল পেশেন্ট সেফটি অ্যাকশন প্ল্যান ২০২১-২০৩০-এর লক্ষ্য হলো এড়ানো সম্ভব এমন ক্ষতি কমিয়ে এমন স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে প্রত্যেকে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ সেবা পাবেন। ২০২৪ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রথম ‘পেশেন্ট সেফটি রাইটস চার্টার’ প্রকাশ করে। এতে নিরাপদ সেবা, দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী, নিরাপদ ওষুধ, তথ্য পাওয়ার অধিকার, চিকিৎসা-নথিতে প্রবেশাধিকার এবং রোগী ও পরিবারের অংশগ্রহণসহ মৌলিক অধিকার তুলে ধরা হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ‘মেডিকেশন উইদাউট হার্ম’, সংক্রমণ প্রতিরোধ, সার্জিক্যাল সেফটি চেকলিস্ট এবং ঘটনা রিপোর্টিং ও লার্নিংয়ের মতো উদ্যোগের মাধ্যমে নিরাপদ চিকিৎসা জোরদার করছে। ভুল হলে তা গোপন না করে কারণ খুঁজে ভবিষ্যতে একই ভুল প্রতিরোধের সংস্কৃতি গড়ে তোলাই এর লক্ষ্য। পাশাপাশি পেশেন্টস ফর পেশেন্ট সেফটি উদ্যোগ রোগী ও পরিবারের অভিজ্ঞতাকে নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা গঠনের অংশীদার হিসেবে গুরুত্ব দেয়।
বৈশ্বিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রধানত সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং স্বাস্থ্যগত জরুরি অবস্থা ও মহামারী মোকাবিলা-এই দুটি লক্ষ্যের ওপর গুরুত্ব দেয়। সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জনে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা, স্বাস্থ্যখাতে পর্যাপ্ত অর্থায়ন, নাগরিকের নিজস্ব চিকিৎসা ব্যয় কমানো, অপরিহার্য ওষুধ ও টিকার সহজলভ্যতা এবং দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে মহামারী ও স্বাস্থ্যগত জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ ও নজরদারি ব্যবস্থা, জরুরি তহবিল ও অবকাঠামো প্রস্তুত রাখা, আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিধি সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অনুসরণ করে আন্তর্জাতিক তথ্য আদান-প্রদান এবং টেলিমেডিসিনসহ ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশেও রোগী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন। কোয়ালিটি ইমপ্রুভমেন্ট, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, ওষুধের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যকর্মীদের জবাবদিহিতা, ডিজিটাল মনিটরিং, হাসপাতালের প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সরঞ্জাম নিশ্চিতকরণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত প্রতিক্রিয়ার ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা জরুরি। ঔষধ প্রশাসনের ফার্মাকোভিজিল্যান্স ও প্রতিকূল ওষুধ প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণও নিরাপদ ওষুধ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। হাসপাতালের জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সমন্বিত সাড়া দেওয়ার জন্য ‘কোড ব্লু’সহ কার্যকর জরুরি অ্যালার্ম ও প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে।
পাশাপাশি চিকিৎসাজনিত অবহেলা বা ভুলের ক্ষেত্রে ন্যায়সংগত প্রতিকার এবং জরুরি চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় আইন ও নীতিমালা কার্যকর করা দরকার।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, রোগী নিরাপত্তা কোনো একদিনের কর্মসূচি নয়; এটি প্রতিদিনের দায়িত্ব। সরকারকে নীতি ও অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে, হাসপাতালকে নিরাপদ ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে, চিকিৎসক-নার্সকে দায়িত্বশীল হতে হবে এবং রোগী-স্বজনকে সচেতন অংশীদার হতে হবে। অসংক্রামক রোগের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসায় নিরাপত্তার গুরুত্ব আরও বেশি। তাই বিশ্ব রোগী নিরাপত্তা দিবসের ২০২৬ সালের আহ্বান হোক সবার জন্য এক সুস্পষ্ট অঙ্গীকার-নিরাপদ চিকিৎসা, নিরাপদ জীবন।








